এ বছর বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি আসলে কত শতাংশ হবে?

13:05 PM সংস্থা/প্রতিষ্ঠান

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) গতকাল রোববার (১৪ মে) আনুষ্ঠানিকভাবে চলতি অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির সাময়িক হিসাব প্রকাশ করেছে। এতে দাবি করা হয়েছে, বছর শেষে প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ।

কিন্তু বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সরকারের এই হিসাবকে মানছেন না। তারা বলছেন, এই হিসাবের কোনো ভিত্তি-ই নেই! আমরা এখানে বিভিন্ন সূত্র থেকে সরকার, বিশেষজ্ঞ ও বিশ্বব্যাংকের দাবিগুলো মিলিয়ে দেখবো।

সোমবার (১৫ মে) দৈনিক প্রথম আলোর প্রিন্ট সংস্করণে একটি সংবাদের শিরোনাম- "মাথাপিছু আয় এখন ১৬০২ মার্কিন ডলার"। প্রতিবেদনটির শুরুতে বলা হয়েছে-

http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/1180836/

"চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ হবে। এটি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাব। প্রবৃদ্ধির এই হার গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। পরপর দুই অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ওপরেই রইল। গত অর্থবছরেও ৭ দশমিক ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল।"

প্রথম আলো রিপোর্টে আরও জানানো হয়, "বিবিএসের হিসাবে, চলতি অর্থবছরে মাথাপিছু বার্ষিক আয় ১ হাজার ৬০২ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ ১ লাখ ২৫ হাজার ৯৯৯ টাকা। এর আগে অবশ্য সকালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বৈঠকে অংশ নেওয়া মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয়ের হিসাব জানান পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।"

"গতকাল বিকেলে পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেছেন, ‘সবাই বলেছে, প্রবৃদ্ধিতে আমরা ৬ অঙ্কের শিকলে আটকে গেছি। কিন্তু সবার প্রচেষ্টায় পরপর দুই বছর ৭ অঙ্কের বেশি প্রবৃদ্ধি হলো। এটি অসাধারণ সফলতা। এ বছর ভারত ছাড়া আর কোনো দেশ ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারেনি।"

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস:

প্রথম আলো উপরিউক্ত রিপোর্টের এক জায়গায় বলা হয়েছে-

"চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, সাময়িক হিসাবে তা ছাড়িয়ে গেল। তবে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) যথাক্রমে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ ও ৬ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।"

অর্থাৎ, সরকারের দাবির চেয়ে এডিবি এবং বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসে বেশ বড় পার্থক্য রয়েছে।

প্রথম আলোর সোমবারের প্রিন্ট সংস্করণে আরেকটি রিপোর্ট ছিল "প্রবাসী আয় ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া দুঃসংবাদ" শিরোনামে। ১৪ মে ঢাকায় ‘Bangladesh Development Update: Breaking Barriers’ শিরোনামে বিশ্বব্যাংকের একটি রিপোর্ট প্রকাশ উপলক্ষ্যে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা তথ্যের ভিত্তিতে প্রথম আলোর প্রতিবেদনটি তৈরি।

http://www.prothom-alo.com/economy/article/1180776/

তাতে বলা হয়েছে--

"সংস্থাটির মতে, অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছর শেষে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার হবে ৬.৮ শতাংশ।"

ডেইলি স্টার'ও তাদের সোমবারের রিপোর্টে বিশ্বব্যাংকের ভবিষ্যদ্বাণী তুলে ধরেছে। লিংক:

http://www.thedailystar.net/business/bangladesh-gross-domestic-product-gdp-growth-record-724pc-capital-income-usd1602-1405051


এডিবির পূর্বাভাস:

এদিকে এডিবির মতে চলতি বছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ। গত ৬ এপ্রিল প্রকাশিত এডিবির বার্ষিক প্রতিবেদন ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক ২০১৭’-এ পূর্বাভাস দেয়া হয়। (সূত্র: বিডিনিউজ)

লিংক: http://bangla.bdnews24.com/economy/article1315252.bdnews


বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদের বিশ্লেষণ:

প্রথম আলো তাদের "মাথাপিছু আয় এখন ১৬০২ মার্কিন ডলার" শিরোনামের রিপোর্টে একজন বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদের পর্যবেক্ষণ যুক্ত করেছে: "তবে প্রবৃদ্ধির হিসাবটি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আবার রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও কমে গেছে। এসব সূচকে যে হিসাব পাওয়া যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে দেখানো হচ্ছে। কোনো ভিত্তি নেই। "

বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে বিবিএসের পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে প্রথম আলো: "মূলত সরকারি বিনিয়োগের ওপরই ভরসা করে এই প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। বিবিএসের হিসাবে, মোট বিনিয়োগের পরিমাণ জিডিপির ৩০ দশমিক ২৭ শতাংশের সমান। চলতি মূল্যে এর পরিমাণ ৫ লাখ ৯২ হাজার ৭৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি বিনিয়োগের অনুপাত জিডিপির ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ২৬ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগের অনুপাত ২৩ দশমিক ০১ শতাংশ হয়েছে, যা গতবার ছিল ২২ দশমিক ৯৯ শতাংশ। টাকার অঙ্কে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকার মতো।"

এরপর প্রথম আলোর রিপোর্টে বিশেষজ্ঞের বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়, "বিনিয়োগের হিসাবটি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ক্রমবর্ধমান মূলধন-উৎপাদন অনুপাত (আইসিওআর) বাংলাদেশে এখনো সাড়ে ৪ শতাংশের নিচে নয়। তাহলে ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগ হওয়া উচিত জিডিপির সাড়ে ৩২ শতাংশের বেশি। বাস্তবে তা হয়নি। বেসরকারি বিনিয়োগেও মন্দা অবস্থা চলছে।"

(কদরুদ্দীন শিশির)

Related Post