ভূয়া সংবাদ কীভাবে যাচাই করবেন?

05:07 AM মিডিয়া স্কুল

জাহেদ আরমান

সামাজিক গণমাধ্যমের যুগে ভূয়া সংবাদ চারদিক থেকে আমাদের ঘিরে রেখেছে। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমের দেয়ালে আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করছে প্রতিনিয়ত। এসব সংবাদের সত্যতা যাচাই না করেই আমরা লাইক কিংবা শেয়ার করি। নিজের অজান্তেই আমরা কারও মিথ্যা প্রচারণার ভাগিদার হই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভূয়া সংবাদকে জনগণের শত্রু হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সময় এসেছে ভূয়া সংবাদের বিরুদ্ধে সতর্ক হওয়ার। বাংলাদেশের প্রথম ফ্যাক্ট অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান বিডি ফ্যাক্ট চেক-এর পক্ষ থেকে পাঠকদের জন্য ভূয়া সংবাদ চিহ্নিত করার কয়েকটি উপায় বাতলে দেয়া হলো:

১. ওয়েব ঠিকানা যাচাই করুন। অনেক সময় ভূয়া সংবাদ সৃষ্টিকারীরা আসল নিউজ সাইটের মতো করে ডোমেইন-এর একটা-দুইটা ক্যারেক্টার পরিবর্তন করে দিয়ে অথবা লগোর সামান্য পরিবর্তন নিয়ে এসে ভূয়া সংবাদ ছড়ায়। উদাহরণস্বরূপ, বাংলা দৈনিক প্রথম আলোর ওয়েব ঠিকানা হচ্ছে http://www.prothom-alo.com/
। এখন কেউ যদি এই ঠিকানায় সামান্য পরিবর্তন এনে ডোমেইন রেজিস্ট্রেশন করে তাহলে পাঠক সেটাকে প্রথম আলোর সংবাদ বলেই মনে করবে। তাই ওয়েব ঠিকানা যাচাই করুন সবার আগে। উদাহরণস্বরূপ নিচের ওয়েবসােইটটি abc news কে নকল করে করা হয়েছে। আর এতে ডোমেইন নামের শেষের অংশে co যুক্ত করা হয়েছে।

২. ওয়েবসাইটের নাম এবং লগো যাচাই করুন। ভূয়া সংবাদ সৃষ্টিকারীরা পাঠককে বোকা বানানোর জন্য আসল ওয়েবসাইটের আদলে নকল ওয়েবসাইব তৈরি করে। আর নকল ওয়েবসাইটের লগোর সামান্য পরিবর্তন নিয়ে এসে তা পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা হয়। তাই এ বিষয়ে সতর্ক থাকুন।

৩. ভিজ্যুয়াল ক্লো আছে কিনা যাচাই করুন। ভূয়া সংবাদে অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন, ফ্লাশিং ব্যানার, পপ-আপ ইত্যাদি থাকে। প্রফেশনাল সংবাদ সাইটে এগুলো কম থাকে। তাই ভূয়া সংবাদ বাছাইয়ে এগুলোর প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখুন।

৪. সংবাদে নিচের বিষয়গুলো ঠিক আছে কিনা যাচাই করুন।
(ক) সংবাদে তারিখ আছে কিনা আছে কিনা তা যাচাই করুন। অধিকাংশ ভূয়া সংবাদে তারিখ উল্লেখ থাকে না। আবার অনেক সময় আগের কোনো বক্তব্যকে কিংবা সংবাদকে এখনকার সংবাদ বলে চালিয়ে দেয়া হয়। তাই তারিখের ব্যাপারে সতর্ক হোন।

(খ) সংবাদের সোর্স সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। ভূয়া সংবাদে জানা যায়, জেলা শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, একটি সূত্র জানায়, দেখা গেছে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, একটি সূত্র উল্লেখ করেছে -এইরকম সোর্স থাকে। প্রফেশনাল সাংবাদিকতায় এমনটি থাকে না। যদি কোনো সোর্স নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক থাকে তাহলে কেন সে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তার কারণ বর্ণনা করা থাকে। ভূয়া সংবাদে এইরকম বেনামী সোর্স বেশি থাকে।
(গ) ভূয়া সংবাদে তথ্যের গরমিল থাকে। এই গরমিলগুলো খুঁজে বের করলে ভূয়া সংবাদ চিহ্নিত করাটা অনেক সহজ হয়ে যায়।

(ঘ) সোর্সের উদ্ধৃতি ঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে কিনা তা দেখতে হবে। সংবাদে যদি কোন উৎসের বক্তব্য উত্তম পুরুষে থাকে তাহলে উদ্ধৃতির দুইপাশে উদ্ধৃতি চিহ্ন ("") ব্যবহার করা হয়। আর উত্তম পুরুষে না বললে উদ্ধৃতি চিহ্ন থাকে না। উদ্ধৃতিতে কোনো অসামঞ্জস্য আছে কিনা তাও খেয়াল করুন।

(ঙ) মূল বক্তব্য কী তা বের করুন। সংবাদে উভয় পক্ষকে উদ্ধৃত করা হয়েছে কিনা তা পরখ করে দেখুন। যদি একপেশে তথ্য পরিবেশণ করা হয়ে থাকে তাহলে রিপোর্টের সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করুন। সংবাদে যেসব তথ্যের উল্লেখ রয়েছে তা সঙ্গতিপূর্ণ কিনা তা যাচাই করুন।

৫. প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে জানুন। অধিকাংশ ওয়েবসাইটে তাদের নিজেদের সম্পর্কে বর্ণনা থাকে। সেখানে ক্লিক করে তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন। ওয়েবসাইটটি তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছে কিনা তা দেখুন। আর লিখে থাকলে তা কোন ধরণের প্রতিষ্ঠান তা যাচাই করুন। উদাহরণস্বরূপ প্রথম আলো এবং ডেইলী স্টার হচ্ছে সংবাদ প্রতিষ্ঠান। সংবাদ প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যকে সঠিক বলে ধরে নেয়া বোকামি।

৬. লেখক ও তার মতাদর্শ কী তা যাচাই করুন। অধিকাংশ ভূয়া সংবাদে লেখকের পরিচিতি থাকে না। যদি থাকে তাহলে তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করুন। ভূয়া সংবাদ সৃষ্টিকারীর মতাদর্শ সম্পর্কে জানার চেষ্টা করুন। সাধারণত লেখকের তার নিজস্ব মতাদর্শের প্রতি পক্ষপাত থাকে। এটা চিাহ্নত করা গেলে সংবাদের সত্যতা সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা যায়।

৭. সংবাদের সাথে ছবি থাকলে ছবিটি গুগলে ইমেজ সার্চ করুন। তাহলে ছবির সত্যতা সম্পর্কে জানা যাবে।

৮. বানান, ব্যাকরণ, যতিচিহ্ন এবং শব্দের প্রয়োগ খেয়াল করুন। সাধারণত ভূয়া সংবাদ প্রফেশনাল সম্পাদকের টেবিল হয়ে আসে না। তাই এখানে বানান, ব্যাকরণ, যতিচিহ্ন ও শব্দের প্রয়োগে অনেক অসাঞ্জস্যতা থাকে সেগুলো খুঁজে বের করুন।

৯. কখন এবং কোথায় সাইটটি রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে তা যাচাই করুন। সংশ্লিষ্ট সাইটটির রেজিস্ট্রেশন সম্পর্কে জানতে whois.icann.org অথবা who.is এই ওয়েবসাইটে ক্লিক করুন। এখান থেকে কখন এবং কোথায় সাইটটি রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে সে সম্পর্কে জানতে পারবেন। যদি সাইটটির রেজিস্ট্রেশনকারী ব্যক্তি, সময় ও স্থানের মধ্যে বৈপরীত্য খুঁজে পান তাহলে একে সন্দেহের তালিকায় রাখতে পারেন। নিচের স্ক্রীণ শটটিতে ইংরেজি দৈনিক ডেইলী স্টারের ঠিকানা, সংস্থার নাম, ফোন নম্বর, ইমেইল যোযোগের ঠিকানা সবই দেয়া আছে। তাই এটি সঙ্গতিপূর্ণ।

১০. কোনো ফ্যাক্ট চেক সংস্থাকে সংবাদটির সত্যতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করুন। বাংলাদেশের প্রথম এবং একমাত্র ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান বিডি ফ্যাক্ট চেক-এর একটি জনপ্রিয় ফিচার হচ্ছে "ফ্যাক্ট চেক অনুরোধ"। কোনো সংবাদ কিংবা বক্তব্যের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য এই অপশনে গিয়ে ‍ফ্যাক্ট চেক অনুরোধ করুন। বিডি ফ্যাক্ট চেক পাঠকদের জন্য বিনা খরচে সেই বক্তব্য কিংবা সংবাদের সত্যতা যাচাই করে দিবে।

Related Post