ভিটামিন বি-১৭ কি ক্যান্সারের কোষ ধ্বংস করে?

22:07 PM অন্যান্য

জাহেদ আরমান

বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ব্লগ, অনলাইন এবং অফলাইন প্রচারণায় প্রায়ই শোনা যায়, ভিটামিন বি-১৭ হচ্ছে ক্যান্সার রোগের মহাষৌধ। ঔষুধ কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত মুনাফার লোভে জনসাধারণকে এ সম্পর্কিত তথ্য দিতে চায় না। ফলে ক্যান্সারের রোগীদেরকে ব্যয়বহুল চিকিৎসার দিকে ঝুঁকতে হয়। দেখা যাক, এই ধরণের প্রচারণার সত্যতা কতটুকু।

ভিটামিন বি-১৭ অ্যামিগডালিন বা লেট্রাইল নামেও প্রচলিত। ক্যান্সারের চিকিৎসায় এর উপকারিতা বর্ণনা করে অনলাইনে অনেক ওয়েবসাইট, ব্লগসাইট, এবং ফেইসবুক গ্রুপ পাওয়া যায়। এসব সাইটে ক্যান্সারকে রোগ উল্লেখ না করে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর একটি ব্যবসা হিসেবে দেখা হয়। এরকমই একটি সংবাদ ভাইরাল হয় ২০১৬ সালে। নিউজ রেসকিউ ডটকম নামের সংবাদমাধ্যমে “এ সিক্রেট হ্যাজ বিন আনকাভারড: ক্যান্সার ইজ নট এ ডিজিজ বাট এ বিজনেস” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়:

আগে সমুদ্রযাত্রায় নাবিকেরা স্কার্ভি রোগে মারা যেতো। কিন্তু পরে জানা গেলো স্কার্ভি আসলে কোনো রোগই নয়। এটি হয় ভিটামিন সি এর অভাবে। ক্যান্সারও তেমন একটি রোগ। বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি এবং মানবতার শত্রুরা এই রোগ সৃষ্টি করেছে তাদের ক্যান্সার ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্য। আসলে ক্যান্সার থেকে মুক্তি পাওয়া খুবই সহজ। কারণ ক্যান্সার হয় ভিটামিন বি-১৭ এর অভাবে। তাই নিয়মিত ভিটামিন বি-১৭ যুক্ত খাবার খেলে এ থেকে সহজেই মুক্ত থাকা যায়।

ইউটিউবে এ সম্পর্কিত অনেক ভিডিও আপলোড করা হয়েছে। এমনকি অনেক রোগী ভিটামিন বি-১৭ খেয়ে ক্যান্সার থেকে নিরাময় লাভ করেছেন এমন সাক্ষাতকারও আছে। স্যান্ডি রগ এরকমই একজন ক্যান্সারের রোগী যিনি ভিটামিন বি-১৭ ট্যাবলেট (৫০০ মিলিগ্রাম) দিনে ‍দুইবার সেবন করে ক্যান্সার থেকে নিরাময় লাভ করেছেন।

১৯২০ এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোর ডাক্তার আর্নেস্ট ক্রেব সিনিয়র তাঁর ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে অবৈধ হুুইস্কির স্বাদ ভালো করার পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এসময় তিনি দেখেন এপ্রিকট ফলের (খুবানি) বীজ ইঁদুর জাতীয় প্রাণীদের টিউমার ধ্বংসে ভূমিকা রাখে। এই ফলের বীজে অ্যামিগডালিন রয়েছে। অবশ্য ক্রেব উদ্বিগ্ন ছিলেন যখন ১৯৩৬ সালে জানা গেলো অ্যামিগডালিন ব্যবহারে ঝুঁকি আছে এবং এর ফলাফল আগে থেকে আন্দাজ করা যায় না। পরবর্তীতে তাঁর সন্তানেরা (আর্নেস্ট ক্রেব জুনিয়র) লেট্রাইল নাম দিয়ে ক্যান্সার চিকিৎসায় এর প্রমোশনের ব্যবস্থা করেন।

ভিটামিন বি-১৭ সত্যিই ক্যান্সারের কোষ ধ্বংস করে কিনা সেই ফ্যাক্ট যাচাই করা যাক।

১৯৭০ এর দশকে ন্যাশনাল ক্যান্সার ইন্সটিটিউট ক্যান্সারের চিকিৎসায় লেট্রাইলের ব্যবহার নিয়ে একটি সমীক্ষা করেন। তারা ক্যান্সার চিকিৎসায় লেট্রােইল ব্যবহার করেছে এমন তিন লাখ ৮৫ হাজার চিকিৎসক এবং ৭০ হাজার এই পেশায় জড়িতদের কাছ থেকে তথ্য চেয়ে মেইল করেন। তারা ৭০ হাজার কেইস চিহ্নিত করেছিল যেখানে ক্যান্সারের চিকিৎসায় লেট্রাইলের ব্যবহার হয়েছিলো। সেখান থেকে তারা ৯৩ টি কেইস সমীক্ষার জন্য ব্যবহার করেছিল। তাদের সমীক্ষায় ভিটামিন বি-১৭ যে ক্যান্সারের কোষ ধ্বংস করে এমন কোনো উপসংহারে তারা আসতে পারেনি।

১৯৮২ সালে নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়, ভিটামিন বি-১৭ ক্যান্সারকে বাড়তে দেয় না, উন্নতি সাধন করে কিংবা আরোগ্য লাভে সহায়তা করে এমন কোনো উপকারিতা পাওয়া যায় নি। গবেষক দল ক্যান্সার চিকিৎসায় অ্যামিগডালিন এর ক্ষতিকর দিক নিয়েও আলোচনা করেছেন। তাদের মতে, ক্যান্সার চিকিৎসায় অ্যামিগডালিন থেরাপি নেওয়ার ফলে রক্তে সায়ানাইডের মাত্রা আশংকাজনকহারে বেড়ে যেতে পারে। এজন্য রোগীকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়। ওই সমীক্ষায় তারা আরও বলেন, অ্যামিগডালিন (লেট্রাইল) একটি বিষাক্ত ড্রাগ এবং ক্যান্সার চিকিৎসায় এর কোনো কার্যকারিতা পাওয়া যায়নি।

২০১৪ সালে ডাক্তার মেরকোলা পাঁচটি গবেষণার কথা উল্লেখ করেন যেগুলোতে ক্যান্সার চিকিৎসায় ভিটামিন বি-১৭ এর উপকারি দিক তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু ওই পাঁচটি গবেষণায় পদ্ধতিগত ত্রুটি রয়েছে। যেমন গবেষণাগুলোর কোনটিতেই “ক্লিনিক্যাল ডাটা” ব্যবহার করা হয়নি। আর এসব গবেষণাতে মানুষের পরিবর্তে ইঁদুর জাতীয় প্রাণীদের নমুনা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিলো।

২০১৫ সালে কক্রেইন অ্যামিগডালিনম, লেট্রাইল, এবং ক্যান্সার বিষয়ক ২০০ সাইটেশন নিরীক্ষা করে উপসংহার টানেন যে, অ্যামিগডালিন এবং লেট্রাইল যে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করে তার বিশ্বাসযোগ্য কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি। কক্রেইন হচ্ছে বিশ্বব্যাপী স্বাধীন গবেষক, চিকিৎসক, রোগী এবং চিকিৎসার সাথে সম্পর্কিত লোকজনের একটি নেটওয়ার্ক। স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিশ্বস্ত এবং গুণগত মানসম্পন্ন তথ্য সরবরাহের জন্য সংস্থাটি বিখ্যাত।

ক্যান্সার চিকিৎসায় ভিটামিন বি-১৭ এর ব্যবহার নিয়ে যে মিথ তা এখনো চালু রেখেছে “ওয়ার্ল্ড উইদাউট ক্যান্সার: দ্যা স্টোরি অব ভিটামিন বি-১৭” নামক বইটি। এর লেখক এডওয়ার্ড গ্রিফিথ একজন উদারবাদী অ্যাক্টিভিস্ট এবং তার চিকিৎসা বিজ্ঞানের কোনো ডিগ্রি কিংবা কাজের অভিজ্ঞতা নেই। বইটিতে ডাক্তার আর্নেস্ট ক্রেব জুনিয়রকে খুবই ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যে কিনা ক্যান্সার চিকিৎসায় ভিটামিন বি-১৭ এর প্রমোশনের ব্যবস্থা করেছিলেন।

অতএব দেখা যাচ্ছে ভিটামিন বি-১৭ ক্যান্সারের কোষ ধ্বংস করে বলে যে ন্যারেটিভ প্রচলিত আছে তা মিথ্যা।

 

Related Post