তারেক রহমান কি লন্ডনে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন?

08:07 AM বিএনপি

কদরুদ্দিন শিশির

ফেসবুকে গত এক সপ্তাহ ধরে একটি ভিডিও ঘুরপাক খাচ্ছে। F 97 নামে একটি আইডি থেকে গত ১৮ জুলাই ভিডিওটি শেয়ার করে ক্যাপশন দেয়া হয়- “এই মাত্র পাওয়া খবর....লন্ডনে তারেক জিয়াকে গুলি.. খালেদা জিয়া পুলিশের হাতে আটক .খবরটি দেখুন.শেয়ার করুন বার বার বন্ধুরা..”

১. তারেক জিয়া গুলিবিদ্ধ (গুলিবিদ্ধ মনে হতে পারে মাথায় ব্যান্ডেজ করা এমন দৃশ্য ভিডিওতে আছে)
২. খালেদা জিয়া লন্ডনে গ্রেফতার (এরকম কোনো দৃশ্য ভিডিওতে নেই)

ভিডিওটি ২৬ জুলাই পর্যন্ত ৫ লক্ষ বার ‘ভিউ’ এবং ১৫ হাজার বার ‘শেয়ার’ হয়েছে। ‘লাইক’ সাত হাজারের কাছাকাছি। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, মাথায় ব্যান্ডেজ করা তারেক রহমান একটি হুইল চেয়ারে বসে আছেন। আর দলীয় নেতাকর্মীরা তাকে ঘিরে নিয়ে যাচ্ছেন কোথাও। নেতাকর্মীদের কেউ কেউ ইংলিশে কথা বলছেন। হুইল চেয়ারে বসা তারেক রহমানের সামনে ভিড় না করতে অনুরোধ করছেন। আশপাশে সাদা চামড়ার কয়েকজন মানুষও আছেন।

পুরো আবহ দেখে ধারণা করা যায়, এটি বাংলাদেশের বাইরের কোনো ফুটেজ। আর যেহেতু তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করছেন বেশ কয়েক বছর ধরে, ফলে এটি সেখানকার ফুটেজ বলে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া যায়। কিন্তু ভিডিওতে কয়েকজন লোকের টুকটাক কথাবার্তা ছাড়া অন্য কোনো তথ্য নেই, যা দিয়ে ধারণা করা যাবে এটি আসলে কোথাকার, কখনকার এবং কী ধরনের ঘটনার ফুটেজ। কেনইবা তারেক রহমানের মাথায় ব্যান্ডেজ!

ভিডিওর ফুটেজ দেখে যেহেতু ঘটনা কী- সে বিষয়ে তেমন কিছু নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই, তাই এটির ক্যাপশনের ওপরই বেশি নির্ভর করতে হবে পাঠক/দর্শককে। কিন্তু ক্যাপশনে যে দুটি তথ্যের সংবাদমূল্য এতটাই বেশি যে, শুধু একটি সূত্রবিহীন ভিডিওর ওপর নির্ভর করে তাৎক্ষণিকভাবে তা বিশ্বাস করা এবং ছড়ানো বোকামি চরম পর্যায়ে পড়ে।

উপরের এই বিশ্লেষণটুকু প্রযোজ্য ছিল ১৮ জুলাই ভিডিওটি ফেসবুকে পোস্ট করার তাৎক্ষণিক মূহুর্তের জন্য। এরপর যখন সময় গড়িয়েছে, এবং বাংলাদেশের বা ব্রিটেনের মূলধারার সংবাদমাধ্যম এরকম কোনো তথ্য সংবাদ আকারে পরিবেশন করেনি, তখন এই ভিডিওটি সাধারণ দর্শকের কাছেও গুরুত্ব হারিয়েছে ‘ফেইক ভিডিও’ হিসেবে।

কিন্তু ভিডিও পোস্ট করার ৭দিন পর ২৫ জুলাই যদি ‘সংবাদমাধ্যম’ পরিচয়ধারী অনলাইন পোর্টাল-- যার সম্পাদনার দায়িত্বে আছেন নামকরা একজন সাংবাদিক-- এই ভিডিওর কন্টেন্টকে ‘আমলে নিয়ে’ কোনো সংবাদ প্রতিবেদন তৈরি করে তাহলে তা ‘ফেইক নিউজ’কে প্রমোট করা নামান্তর।

২৫ জুলাইন পূর্বপশ্চিমবিডি নামের অনলাইন একটি পত্রিকা “লন্ডনে তারেক জিয়ার মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা ভিডিও নিয়ে তোলপাড়” শিরোনামে ভিডিওটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। 

প্রতিবেদনটিতে ভিডিওটির সত্যাসত্য যাচাইয়ের কোনো দায় নেয়নি পূর্বপশ্চিমবিডি। ফেসবুকে পোস্টকারীর ভাষ্য অনুযায়ী ভিডিওটির একটা সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এবং তার সাথে তারেক রহমানের দল বিএনপির পক্ষ থেকে এটি ‘ভুয়া’ বলে করা দাবি তুলে ধরা হয়েছে মাত্র।

এখানে লক্ষ্যণীয় হচ্ছে. বাংলাদেশে যারা গত ১০ বছর ধরে সাংবাদিকতায় আছেন তাদের কাছে ভিডিওটির ফুটেজ খুবই পরিচিত মনে হওয়াটা স্বাভাবিক। কারণ ফুটেজে তারেক রহমানকে যেমন দেখা যাচ্ছে তেমন অবস্থার ছবি ২০০৮ সাল পরবর্তী বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ছাপা হয়েছে। কারণ, ভিডিওর ফুটেজ ২০০৮ সালের, যখন তারেক রহমান চিকিৎসার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনুমতিতে লন্ডনে গিয়ে পৌঁছেছিলেন।

অনলাইনেও এই ভিডিওর ফুটেজ অন্যান্য বিভিন্ন সূত্রে খুবই সহজলভ্য। Tanvir Ahmed নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে ২০০৮ সালে Tareq Zia Arrives in London শিরোনামে একই ভিডিও আপলোড করা হয়।  

 

ziacyberforce.com নামে বিএনপিপন্থী একটি ওয়েবসাইটে এই ভিডিওর স্ক্রীনশট নেয়া একাধিক ছবি ব্যবহার করে ২০১৫ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছবিগুলো ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর লন্ডনে তোলা।

অর্থাৎ, F 97 নামের ফেসবুক আইডি থেকে যেসব তথ্য দিয়ে ভিডিওটি ছড়ানো হয়েছে তা পুরোপুরি ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর।

সামাজিক মাধ্যমে সাধারণ ব্যবহারকারীরা অনেকে না বুঝে এমন বিভ্রান্তিকর ভিডিও ছড়ানো অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু একজন স্বনামধন্য সাংবাদিকের সম্পাদনায় সাংবাদিক মহলে পরিচিত একটি ভিডিওকে ‘আমলে নিয়ে’ সংবাদ পরিবেশন করা খুবই অস্বাভাবিক এবং সাংবাদিকতার জন্য অশনিসংকেত। পূর্বপশ্চিমের উচিত ছিল ভিডিওটি এবং ক্যাপশনে দাবি করা তথ্য সঠিক কিনা তা নিজেরা যাচাই করে মূল ভিডিওটি পাঠকের সামনে তুলে ধরা। কিন্তু তা না করে অনলাইন পোর্টালটি এমনভাবে প্রতিবেদন করেছে যাতে বিভ্রান্তি আরো বাড়ে!

Related Post