সুপ্রিম কোর্টের “জাস্টিশিয়া” মূর্তি নাকি ভাস্কর্য

19:04 PM অন্যান্য দল

গত ১১ এপ্রিল গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কওমি মাদ্রাসার বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক সাক্ষাতে বলেন, ‘আমাদের হাইকোর্টের সামনে গ্রিক থেমেসিসের এক মূর্তি লাগানো হয়েছে। সত্য কথা বলতে কি, আমি নিজেও এটা পছন্দ করিনি। কারণ, গ্রিক থেমেসিসের মূর্তি আমাদের এখানে কেন আসবে। এটা তো আমাদের দেশে আসার কথা না। আর গ্রিকদের পোশাক ছিল একরকম, সেখানে মূর্তি বানিয়ে তাকে আবার শাড়িও পরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটাও একটা হাস্যকর ব্যাপার করা হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের লিংক:


https://www.youtube.com/watch?v=LuRsHAqvAa4

এর আগে হেফাজতে ইসলামও একে মূর্তি হিসেবে উল্লেখ করে এটি সরানোর দাবি করেছিল। এই বছরের ১৬ জানুয়ারি এক প্রেস রিলিজে তারা বলেছিলো:
“দেশের মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার সর্বোচ্চ স্থান সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে কথিত ন্যায়ের প্রতীক নগ্ন-অশ্লীল দেবী থেমিসের মূর্তি স্থাপন হচ্ছে চরম ধৃষ্টতা এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের অবমাননা। স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদের নিজস্ব ইতিহাস, কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও আত্মমর্যাদাবোধেরও সম্পূর্ণ বিপরীত ও সাংঘর্ষিক। গ্রিক দেবীর মূর্তি নয়, মুসলমানদের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রতীক হলো মহাগ্রন্থ পবিত্র আল কোরআন। মহান আল্লাহর মনোনীত ধর্ম ইসলামে মূর্তি স্থাপন হারাম।”
সংবাদের লিংক:


http://www.ittefaq.com.bd/court/2017/01/16/99858.html

প্রধানমন্ত্রী জাস্টিশিয়াকে ‘মূর্তি’ বলে বর্ণনা করলেও দেশের অধিকাংশ সংবাদপত্র সেটিকে ভাস্কর্য হিসেবেই উল্লেখ করেছে। এ সম্পর্কিত বিডিনিউজের সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে “সুপ্রিম কোর্টের ভাস্কর্য সরাতে চান প্রধানমন্ত্রীও।” একই ঘটনায় প্রথম আলো পত্রিকার শিরোনাম হচ্ছে, ”উচ্চ আদালত প্রাঙ্গণের গ্রিক দেবীর ভাস্কর্য সরানোর পক্ষে প্রধানমন্ত্রী।” বিডিনিউজের ২৪ ফেব্রুয়ারির শিরোনাম, “সুপ্রিম কোর্টের ভাস্কর্য সরাতে বিক্ষোভের ডাক হেফাজতের।” হেফাজতে ইসলাম ”জাস্টিশিয়া”কে বারবার মূর্তি হিসেবে উল্লেখ করলেও গণমাধ্যমটি শিরোনাম ও ইন্ট্রোতে ভাস্কর্য হিসেবেই উল্লেখ করেছে।
বিডিনিউজের সংবাদ লিংক: http://bangla.bdnews24.com/bangladesh/article1318190.bdnews
প্রথম আলোর সংবাদ লিংক: http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/1142561/
বিডিনিউজের সংবাদ লিংক: http://bangla.bdnews24.com/ctg/article1293800.bdnews

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরে মুলধারার সংবাদপত্র এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্পষ্টতই একটা বিতর্ক লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জাস্টিশিয়া আসলে ভাস্কর্য না মূর্তি? তবে তার আগে জেনে নেওয়া যাক জাস্টিশিয়া সম্পর্কে।

জাস্টিশিয়া:
জাস্টিশিয়া একটি রোমান শব্দ। যার অর্থ বিচারক এবং তিনি একজন নারী। পৃথিবীর অনেক দেশের সর্বোচ্চ আদালতে জাস্টিশিয়ার ভাস্কর্য রয়েছে। একে ন্যায়বিচারের প্রতীক বিবেচনা করা হয়।

কোর্টহাউজ অব তেহরানের সামনের দেয়ালে খোদাই করা জাস্টিশিয়া।
একেক দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বিবেচনায় জাস্টিশিয়ার অবয়ব ও পোশাক একেক রকম। বাংলাদেশের জাস্টিশিয়ার পরনে আছে শাড়ি। জাস্টিশিয়ার চোখ কাপড়ে বাঁধা, যা বস্তুনিষ্ঠতা প্রকাশ করে। এটি আরো প্রকাশ করে যে আদালতের একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। ডান হাতে রয়েছে একটি খোলা তরবারি, যা কর্তৃত্ব, শক্তি ও সামর্থ্য প্রকাশ করে। এ তরবারি আদালতের রায় বাস্তবায়ন ও আইনের আশ্রয় লাভের প্রতীক হিসেবেও পরিচিত। ভাস্কর্যের বাঁ হাতে আছে দাঁড়িপাল্লা, যা পক্ষপাতহীনতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রতীক।

জাস্টিশিয়া ভাস্কর্য না মূর্তি?
সংসদ বেঙ্গলি টু ইংলিশ ডিকশনারি মতে, ভাস্কর্যের ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে “Sculpture” (পৃ. ৮১৬)। Merriam-Webster ডিকশনারিতে “sculpture” এর অর্থ করা হয়েছে,
এক. “the action or art of processing (as by carving, modeling, or welding) plastic or hard materials into works of art.” দুই. (ক): ”work produced by sculpture” (খ): ”a three-dimensional work of art (as a statue)”
অর্থাৎ ভাস্কর্য হচ্ছে এমন কোনো শৈল্পিক কাজ যেটা খোদাই, প্রতিমানকরণ কিংবা ঢালাই করে তৈরি করা হয়। আক্ষরিক এবং পারিভাষিক দিক থেকে জাস্টিশিয়া ভাস্কর্যই। কারণ এটি ঢালাই করে তৈরি করা হয়েছে এবং এর শৈল্পিক মান রয়েছে।
অন্যদিকে মূর্তির আক্ষরিক অর্থ হল অবয়ব। সাধারণত পাথর, কাঠ, ধাতু অথবা মাটি দিয়ে মূর্তি নির্মাণ করা হয়।
অন্যদিকে মূর্তি শব্দের উৎপত্তি দেবনাগরী লিপি ( मूर्ति) থেকে বিধায় সেখান থেকেই এর অর্থ করা ঠিক হবে। দেবানাগরী লিপিতে মূর্তি বলতে দেবতার প্রতিমাকে বোঝানো হয়েছে। মূর্তি দেবতার প্রতিনিধি। হিন্দুরা মূর্তির মাধ্যমে দেবতার পূজা করে থাকেন। ধর্মীয় সংস্কার বা শাস্ত্রের নির্দেশ অনুযায়ী নির্দিষ্ট দেবতার মূর্তি নির্মিত হয়ে থাকে (Klaus K. Klostermaier, ১৯৮৯, পৃ. ২৯৩-২৯৫)। পারিভাষিক অর্থে ইংরেজিতে এর প্রতিশব্দ হচ্ছে “idol”। Merriam-Webster ডিকশনারিতে “idol” এর অর্থ করা হয়েছে, “a representation or symbol of an object of worship; broadly : a false god”। এখানে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে ‘জাস্টিশিয়া’ পূজা করার জন্য স্থাপিত হয়নি। ন্যায় বিচারের প্রতিক হিসেবেই স্থাপন করা হয়েছে।
সুতরাং আক্ষরিক অর্থ বিবেচনায় নিলে জাস্টিশিয়া মূর্তি হতে পারে কিন্তু পারিভাষিক অর্থে নয়। অন্যদিকে আক্ষরিক ও পারিভাষিক দুই অর্থেই এটি একটি ভাস্কর্য। এদিক বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী এবং হেফাজতে ইসলামের বক্তব্য অর্ধসত্য।

 

Related Post