ভুয়া ছবি দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশবিদ্বেষী প্রচারণা

05:04 AM আন্তর্জাতিক

পশ্চিম বঙ্গের একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী ২ এপ্রিল একটি ছবি পোস্ট করেছেন। সেখানে গাছের সাথে বাঁধা এক নারীকে (মৃত কিম্বা জীবিত বুঝা যাচ্ছে না) দেখা যাচ্ছে। কিছু দূরে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন লোক। Writankar Das নামের ওই ফেসবুকার ছবিটির সাথে 'ক্যাপশন' আকারে যোগ করেছেন নিচের দুটি লাইন--
"বাংলাদেশে হিন্দু মেয়েদের ওপর নৃশংস অত্যাচারের একটি চিত্র। পোস্টে আর কিছু লেখার প্রয়োজন আছে কি ???"

ছবির লিংক: https://www.facebook.com/photo.php?...
পোস্টদাতার প্রোফাইল- www.facebook.com/daswritankar

গত দুইদিন ছবিটি শেয়ার হয়েছে প্রায় এক হাজার বার (৪ এপ্রিল রাত সাড়ে ১১টায় ৯৮০ বার)। 'লাইক' করেছেন সাড়ে তিনশ'র বেশি লোক। কমেন্ট করেছেন ৮০ জনের বেশি। খুব স্বাভাবিকভাবেই এই ধরনের ছবি ও ক্যাপশন যে কোনো মানুষকেই ক্ষুব্ধ করবে। আর কথিত 'নির্যাতিতে'র সাথে কোনো ধরনের 'নৈকট্যবোধ' থাকলে তা ব্যক্তিকে আরো বেশি সংক্ষুব্ধ করবেই। ফলে কমেন্টকারীরা ইচ্ছা মতো বাংলাদেশ এবং মুসলমানদের ওপর তাদের ক্ষোভ ঝেড়েছেন। গালাগালি করছেন। ছবিটি যারা শেয়ার করছেন তারাও বাংলাদেশ ও মুসলমানবিদ্বেষী নানা কথা লিখে সেটি শেয়ার করছেন।

ছবির বা ক্যাপশনে দেয়া 'তথ্য'র উৎস কী, এসব 'তথ্য' আদৌ সঠিক কিনা- তা নিয়ে মন্তব্যকারী, লাইক দাতা বা শেয়ারকারীদের কোনো মাথা ব্যথা নেই, যাদের বেশিরভাগই পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসী। ব্যতিক্রম হিসেবে দুয়েকজন বাংলাদেশি তথ্যসূত্র চেয়ে মন্তব্য করার পর সেগুলো ডিলিট করে দেয়া হয়েছে। কমেন্ট করে সূত্র জানতে চাওয়াদের মধ্যে এই প্রতিবেদনের লেখকও রয়েছেন। কিন্তু কয়েক ঘন্টা পরে দেখা গেছে লেখকের মন্তব্যটি হাওয়া!

'লাইক' 'শেয়ার' এর ক্ষেত্রে ছবি ও 'তথ্য'র সূত্র জানতে না চাওয়া, এবং কেউ জানতে চাইলে পোস্টদাতা কর্তৃক মন্তব্য ডিলিট করে দেয়া থেকে বুঝা যায়, এই প্রচারণাটি উদ্দেশ্যমূলক। আর পোস্টদাতা ও শেয়ারকারীদের অনেকের প্রোফাইল ঘেঁটে দেখা গেছে তারা সক্রিয় বিজেপি কর্মী। এ থেকে পরিস্কার, ইসলাম, মুসলমান ও বাংলাদেশবিদ্বেষ ছড়ানোর জন্যেই এই প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

রাজনৈতিক ময়দানে নানা প্রচারণা চলা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে তা ফ্যাক্ট বা তথ্যভিত্তিক হওয়া বাঞ্চণীয়। কিন্তু বিজেপি কর্মী Writankar Das ও তার ফেসবুক বন্ধু/অনুসারীদের আলোচ্য ছবি ব্যবহার করে প্রচারণাটি সম্পূর্ণ মিথ্যার উপর দাঁড়িয়ে।

এটি যে মিথ্যাচার- তা এখানে কিছু প্রমাণসহকারে তুলে ধরছি-
শেয়ার করা ছবিটির মূল সূত্র কী- তা বের করতে 'গুগল ইমেজ' এর সাহায্য নেয়া খুব সহজ একটি পদ্ধতি। তাতে দেখা গেছে, এই ছবি অনলাইনে আছে অন্তত ২০১১ সাল থেকে। এবং এরপর থেকে ছবিটি কয়েকশ' বার বিভিন্ন ভুইফোড় সাইট ও ব্লগে বিভিন্ন ক্যাপশনে নানা প্রোপাগান্ডিস্ট গ্রুপের দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছে। যারাই ব্যবহার করেছে কেউই মূল সূত্র উল্লেখ করেনি। যার যখন প্রয়োজন হয়েছে ইচ্ছা মতো একটি ক্যাপশন জুড়ে দিয়ে প্রকাশ করেছে।

২০১১ সালের ১৮ জুলাই সামহোয়ারইন ব্লগের 'প্রীতম অংকুশ' নামে এক ব্লগারের পোস্টে ছবিটি সম্পর্কে দাবি করা হয় - "গোদাগাড়ীতে উপজাতি মহিলা মরিয়ম মুর্মুকে মধ্যযুগীয় কায়দায় ধর্ষণের পর হত্যার ছবি।" গোদাগাড়ী রাজশাহীর একটি উপজেলা।
লিংক: http://www.somewhereinblog.net/blog...


২০১২ সালে ১৯ ডিসেম্বর 'জানকিরান' নামে এক ব্লগার তার পোস্টে ছবিটির ক্যাপশনের লিখেছেন, "BNP-Jamat জোট সরকার আমলে ২০০২ সনের ২২শে মার্চ কুমিল্লা জেলার বরুড়া উপজেলাধীন আড্ডা গ্রামে শিবির ক্যাডারদের নারকীয় পাশবিক নির্যাতনের দৃশ্য....এ যেন ১৯৭১ এর প্রতিচ্ছবি।"
লিংক: http://www.somewhereinblog.net/blog...

আবার ২০১২ সালের ১৯ ডিসেম্বরই গুগল প্লাস-এ এক ব্যবহারকারী ছবিটির সাথে ক্যাপশন হিসেবে লেখেন, "গোপালগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সোনার ছেলেরা গাছের সাথে বেঁধে এভাবে সম্মান কেড়ে নেয় এক অসহায় নারীর। এই নারীও কারও কন্যা, কারও বোন, কারও ঘরের সম্মান।"
লিংক: https://plus.google.com/11580180825...

এখানে থেকে কোনটিকে সঠিক বলে ধরে নেয়া যায়? কোনোটিকেই না। এরপরও যদি বাছাই করতেই হয় তাহলে প্রথম প্রকাশিত সূত্রটিকে 'প্রথম প্রকাশিত হয়েছে'-এই যুক্তিতে কতক্ষণ বিবেচনায় নেয়া যায়। তবে এখানে তুলে ধরা তিনটি দাবির মধ্যে দ্বিতীয়টি (২০০২ সালে কুমিল্লার বরুড়ার ঘটনা হিসেবে) একাধিক ব্লগে/ফেসবুক একাউন্টে পাওয়া যায়। যদিও এসব ব্লগ লেখা হয়েছে ২০১২ সালের ১৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত দ্বিতীয় ব্লগটির পরে।
এরকম কয়েকটি লিংক- ২০১৩ সালের ২১ জুন ফেসবুকে https://www.facebook.com/permalink....
২০১৫ সালের ৮ জুন ব্লগস্পটে - http://mohammadin.blogspot.com/2015...
(সবচেয়ে ভাল হতো ২০০২ সালের ২২ মার্চের পত্রিকাগুলো যাচাই করে দেখতে পারলে। কিন্তু আপাতত সে সুযোগ না থাকায় করা হয়নি।)

আবার এই একই ছবিকে 'Thumbnail' হিসেবে ব্যবহার করে অনলাইনে শতাধিক ভিডিও আছে। তবে ওইসব ভিডিওর কয়েকটি দেখে কন্টেন্টের সাথে Thumbnail ছবির কোনোই প্রাসঙ্গিকতা পাওয়া যায়নি। এরকম একটি ভিডিও লিংক: https://padmanews.com/bangla/featur...

তো যাইহোক, উপরে দেয়া তথ্যগুলো থেকে নির্দ্বিধায় এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, পশ্চিমবঙ্গের Writankar Das নামের যেই ব্যক্তি ছবিটিকে 'বাংলাদেশ হিন্দু নির্যাতন' এর চিত্র হিসেবে (এবং যেহেতু ছবির সাথে সময় উল্লেখ করেননি, ফলে ধরেই নেয়া যায় এটিকে 'সাম্প্রতিক' ছবি হিসেবেই তিনি বুঝাচ্ছেন) প্রচার চালাচ্ছেন তা- মিথ্যাচার ও বিভ্রান্তিকর।

অনলাইনে পাওয়া কোনো সূত্রই প্রমাণ করে না এটি বাংলাদেশের ছবি। আরও প্রমাণ করে না নারীটির ধর্ম হিন্দু। ছবিটি তো খোদ ভারত বা মিয়ানমারের কোনো এলাকারও হতে পারে। বাংলাদেশের অনলাইন জগতে অতীতে দেখা গেছে, রোহিঙ্গা নির্যাতনের বাস্তব ছবির সাথে অন্যান্য দেশের ছবি যুক্ত করে প্রচার করা হয়েছে।

আর যদি ছবিটি বাংলাদেশের এবং হিন্দু নির্যাতনের হয়েও থাকে, তাহলে এটি অন্তত ২০১১ সালের বা তার আগের ছবি। সময় উল্লেখ না করে বর্তমানে এটি প্রচার করে তিনি বাংলাদেশ ও মুসলমাদের সম্পর্কে উদ্দেশ্যমূলক বিদ্বেষ ছড়াচ্ছেন।

Related Post