ফ্যাক্ট চেক- মঙ্গল শোভযাত্রা: ধর্মের সাথে সম্পর্ক আছে কি?

23:04 PM সংস্থা/প্রতিষ্ঠান

কদরুদ্দিন শিশির: বাংলা নববর্ষ বরণ এবং বরণের ধরন নিয়ে বিতর্ক বেশ পুরোনো। এটিকে ‘সার্বজনীন’ ও ‘অসাম্প্রদায়িক’ বলে দাবি করা হয় আয়োজক এবং তাদের সমর্থকদের পক্ষ থেকে। আবার বিরোধীরা বলে থাকেন নববর্ষ বরণকে ঘিরে একটি বিশেষ ধর্মের রীতিনীতিকেই অনুসরণ করা হয়। ফলে এটি সাম্প্রদায়িক উৎসব হয়ে দাঁড়িয়েছে, সার্বজনীন বা অসাম্প্রদায়িক নয়। বিবদমান পক্ষ দুটির মোটাদাগে পরিচয়- এক. সেকুলারিস্ট। দুই. ইসলামপন্থী। বিতর্কের কেন্দ্রে অবস্থান করছে বর্ষবরণ উৎসবের সবচেয়ে বড় কর্মসূচি ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নিয়ে। এটিতে যেসব রীতিনীতি অনুসরণ করা হয় সেগুলো অধিকাংশই হিন্দুয়ানী রীতিনীতির অংশ বলে দাবি সমালোচকদের।

এবছর বিতর্কটি যেন মাথাচাড়া দিয়েছে। অন্যরা তো পক্ষে-বিপক্ষে বক্তব্য দেয়া চালিয়ে যাচ্ছেনই, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও যোগ দিয়েছেন এতে। বর্ষবরণের রীতিনীতির (বিশেষ করে মঙ্গল শোভাযাত্রা) পক্ষ অবস্থান নিয়ে তিনি এটিকে 'অসাম্প্রদায়িক', এবং কোনো ধর্মের সাথে এসব রীতিনীতির সম্পর্ক নেই বলে একাধিকবার দাবি করেছেন।
আমরা আলোচ্য নিবন্ধে উভয় পক্ষের দাবিকে বাস্তব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করার চেষ্টা করবো।
#প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য:

গত ১২ এপ্রিল বুধবার এক অনুষ্ঠানে বাংলা নববর্ষ উদযাপন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “পহেলা বৈশাখ ও মঙ্গল শোভাযাত্রার সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই বরং এগুলো দেশের সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও আচার আচরণের প্রতিফলন। এ নিয়ে যারা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে তারা ভুল করছে।”
সূত্র: একাত্তর টিভি, এনটিভি

পরদিন বৃহস্পতিবার আবারও তিনি একই কথা বলেন অন্য একটা অনুষ্ঠানে। গণভবনে হাতিরঝিল সমন্বিত প্রকল্প উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন গোটা বিশ্বে স্বীকৃত। এটিকে ধর্মের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলার কোনো সুযোগ নেই। কারণ বিশ্ব সংস্কৃতির ঐতিহ্য হিসেবে ইউনেস্কো এটিকে ঘোষণা করেছে। যারা মঙ্গল শোভাযাত্রাকে হিন্দুদের সংস্কৃতি বলছে তারা না জেনে বলছেন। এর সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। আমি সবার কাছে অনুরোধ করব কেউ এটি নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াবেন না।”
সূত্র: আরটিভি, দেশটিভি, বাংলাট্রিবিউন

প্রধানমন্ত্রীর সাথে বর্তমান সংস্কৃতিমন্ত্রীর একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করা প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
গত ৯ এপ্রিল সোমবার সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর চারুকলায় জয়নুল গ্যালারিতে আয়োজিত মঙ্গল শোভাযাত্রার তহবিল সংগ্রহের বিশেষ প্রদর্শনীর উদ্বোধন করে বলেন, “আবহমান কাল ধরে এই ভূখণ্ডে বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপিত হচ্ছে। সময়ের প্রয়োজনের এ উৎসবের চরিত্র বদলেছে। একসময় নববর্ষ ছিল শুধুই উৎসব। বর্তমানের উৎসবের গণ্ডি পেরিয়ে নববর্ষ হয়ে উঠেছে মানবিকতা ও সম্প্রীতির উৎস। যখনই সাম্প্রদায়িক শক্তি মাথাচাড়া দিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে প্রতিবাদ হয়েছে এর মাধ্যমে। এর সঙ্গে কোনো ধর্মের কোনো আচারের সম্পর্ক নেই। মঙ্গল শোভাযাত্রা হচ্ছে সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এটাকে সবাই ধারণ করে।”

আয়োজকদের বক্তব্য:

আয়োজকরাও একই দাবি করেন- মঙ্গলশোভাযাত্রার যাথে কোনো ধর্মের বা ধর্মীয় প্রতীকের কোনো সম্পর্ক নেই। গত ১০ এপ্রিল আয়োজকদের একজনের বক্তব্য প্রথম আলোতে এভাবে এসেছে- “মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। বিরুদ্ধ প্রচার সত্ত্বেও বিপুল উৎসাহে ছাত্র-শিক্ষকদের উদ্যোগে চলছে শোভাযাত্রার প্রস্তুতি। অনুষদের ডিন শিল্পী নিসার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বলা হচ্ছে, মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রতীকগুলোর কাছে আমরা মঙ্গল কামনা করি। কিন্তু আমরা মঙ্গল শোভাযাত্রায় প্রতিবছরই কতগুলো যুদ্ধাপরাধী, শয়তানের প্রতীক তৈরি করি। তাদের গলায় জুতার মালা দিয়ে দড়ি ধরে টানা হয়। নিশ্চয়ই আমরা এসব শয়তানের কাছে মঙ্গল কামনা করি না। আমরা বরং এসব শয়তানকে দেশ থেকে অপসারিত করতে চাই। এর সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই।”


শিল্পকলা একাডেমির চারুকলা বিভাগের পরিচালক চিত্রশিল্পী মনিরুজ্জামান বলেন, "মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে আমরা একটি বার্তা দেয়ার চেষ্টা করেছি যে অশুভকে তাড়িত করে আমরা একটি শুভাগমন ঘটাতে চাই। এর একটা রাজনৈতিক প্রেক্ষিতও ছিল"। (সূত্র: বিবিসি বাংলা, লিংক: প্রাগুক্ত)

বিরোধীদের বক্তব্য:

অন্যদিকে মঙ্গল শোভাযাত্রার বিরোধীদের বক্তব্য হচ্ছে, এটি হিন্দু ধর্মের আচারনির্ভর। গত ১৩ এপ্রিল বিবিসি বাংলাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম-মহাসচিব মুফতি ফায়জুল্লাহ তাদের আপত্তির কারণ হিসেবে বলেন, "এখানে বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তির সাথে পেঁচার মূর্তিও বহন করা হয় মঙ্গল শোভাযাত্রার নামে। আমরা মনে করি এটি নিছক একটি হিন্দু ধর্মীয় রীতি এবং এটি মুসলমানদের জন্য বাধ্যতামূলক করার অধিকার কারো নেই"।

১৪ এপ্রিল দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত “ মঙ্গল শোভাযাত্রা পালনের নির্দেশ প্রত্যাহার দাবি হেফাজতের” শিরোনামে রিপোর্টে বলা হয়েছে, “দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মঙ্গল শোভাযাত্রা বাধ্যতামূলকভাবে পালনের নির্দেশ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী। গতকাল (বৃহস্পতিবার) এক বিবৃতিতে তিনি এ দাবি জানান।...তিনি বলেন, মঙ্গল শোভাযাত্রা হচ্ছে মূলত হিন্দু সম্প্রদায়ের গণেশপূজার অংশ। হিন্দু পুরাণের দেব-দেবীর বাহনের মূর্তি নিয়ে এই শোভাযাত্রা হয়ে থাকে, যেমন : কার্তিকের বাহন ময়ূর, হিন্দু দেবী সরস্বতীর বাহন হাঁস, ল²ীর বাহন পেঁচা। এছাড়া প্রাচীনকালের মতো শয়তানের উপাসনাস্বরূপ অমঙ্গলের প্রতীক কল্পিত রাক্ষস-খোক্কসের মুখোশ পরিধান করে সেগুলোকে সন্তুষ্ট করা হয়, যাতে শয়তান কোনো অমঙ্গল না ঘটায়। এই শোভাযাত্রায় এভাবে নতুন বছরে মঙ্গল কামনা করা হয়। সুতরাং এই পৌত্তলিক শোভাযাত্রা নিঃসন্দেহে মুসলমানদের ঈমান-আকিদার বিরোধী। মুসলমানরা একমাত্র আল্লাহর কাছেই মঙ্গল কামনা করেন, দোয়া করেন। এর অন্যথা হলে সেটি অবশ্যই শিরক বলে গণ্য হবে।”

বিরোধিতা বর্ষবরণ নিয়ে, নাকি ভিন্ন সংস্কৃতি নিয়ে?

সাধারণত ধরে নেয়া হয়, হেফাজতে ইসলাম বাংলা বর্ষবরণে বিরোধী। কিন্তু সংগঠনটির কয়েকটি বিবৃতিতে দেখা যাচ্ছে, বষবরণ নিয়ে বিরোধিতার চেয়ে তাতে ‘বিজাতীয় সংস্কৃতি’ চর্চার প্রতি অনীহা প্রকাশ পেয়েছে বেশি।
গত ৮ এপ্রিল হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় মহাসচিব আল্লামা হাফেজ মুহাম্মদ জুনাইদ বাবুনগরী একটি বিবৃতি দেন। সেখানে পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ বরণের নামে বিভিন্ন জীবজন্তুর মূর্তি নিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রা, মুখে উল্কি আঁকা এবং নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণসহ সব অনৈসলামিকতা ও বিজাতীয় সংস্কৃতি থেকে দূরে থাকার জানান। একই সঙ্গে এবার পহেলা বৈশাখ দেশের সব সরকারি স্কুল-কলেজে মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো ‘ঈমান বিধ্বংসী আগ্রাসী সংস্কৃতির’ আয়োজনকে শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক বাধ্যতামূলক করার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে ‘ঈমান-আক্বিদা ও ইসলামবিরোধী’ এই নির্দেশনা প্রত্যাহারেরও দাবি জানিয়েছেন বাবুনগরী। (সূত্র: কালের কণ্ঠ) এখানে দুটি আপত্তির জায়গা স্পষ্ট, এক. বিজাতীয় সংস্কৃতির চর্চা। দুই. এমটি করতে সরকারের বাধ্যতামূলক পদক্ষেপ।

২০১৬ সালের ১১ এপ্রিল এ সংক্রান্ত হেফাজতের বিবৃতি নিয়ে বাংলাট্রিবিউনের “পহেলা বৈশাখ উদযাপনে নারীদের অংশ না নেওয়ার পরামর্শ হেফাজতের” শিরোনামের রিপোর্টটি থেকে আরো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় এ বিষয়ে। সেখানে বলা হয়েছে, “পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ বরণের নামে বিভিন্ন জীবজন্তুর মূর্তি নিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রা, মুখে উল্কি আঁকা এবং নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণকে অনৈসলামিক ও বিজাতীয় সংস্কৃতি আখ্যায়িত করে এসব থেকে দূরে থাকতে মুসলিম জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। এছাড়া বিবৃতিতে গত বছর বর্ষবরণের সময় টিএসসি এলাকায় যৌন নির্যাতনের বিষয়টিকে সামনে এনে এবারের বৈশাখ উদযাপন অনুষ্ঠানে নারীদের অংশ না নেওয়ার পরামর্শ দেয় সংগঠনটি।”

১৪ এপ্রিলের ইনকিলাবে প্রকাশিত হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী তার বিবৃতি বলেছেন, “মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের অঙ্গীভূত করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ঈমান-আকিদা ও তাদের মুসলিম জাতিসত্তার আত্মপরিচয়কে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যেই পয়লা বৈশাখের মতো একটি জাতীয় উৎসবের সাথে পৌত্তলিক শোভাযাত্রাকে সংযুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পরবর্তী সময়কালেও বাংলা নববর্ষ উদযাপনের সাথে মঙ্গল শোভাযাত্রার কোনো সম্পর্ক ছিল না। সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদের আমলে ‘বর্ষবরণ শোভাযাত্রা’ নামে এটির প্রথম সূচনা ঘটে। এরপর নব্বই-এর দশকে এসে সেটি ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নাম ধারণ করে। ব্রাহ্মণ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের সুপরিকল্পিত চক্রান্তের অংশ হিসেবে আজ মঙ্গল শোভাযাত্রা, মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্বলন ও মঙ্গলসঙ্গীত ইত্যাদি হিন্দুদের পৌত্তলিক ধর্মাচারকে তথাকথিত হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি ও সার্বজনীনতার বিভ্রমের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ তৌহিদী জনতার ওপর চাপিয়ে দেয়ার ব্যাপক অপচেষ্টা চলছে। তিনি বাংলাদেশের বৃহত্তর সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের সচেতন হওয়ার আহŸান জানান। আসন্ন পয়লা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বর্জন করুন।”

আলোচ্য বিষয় মঙ্গল শোভাযাত্রা: এটি কী?

উইকিপিডায় বলা হয়েছে- “মঙ্গল শোভাযাত্রা প্রতি বছর বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে আয়োজিত একটি তুলনামূলকভাবে নতুন বর্ষবরণ উৎসব। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বাংলাদেশের ঢাকা শহরে এটি প্রবর্তিত হয়। একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব হিসাবে সারাদেশে এটি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের উদ্যোগে প্রতিবছরই পহেলা বৈশাখে ঢাকা শহরের শাহবাগ-রমনা এলকায় এই মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। এই শোভাযাত্রায় চারুকলা ইন্সটিটিউটের শিক্ষক শিক্ষার্থী ছাড়াও বিভিন্ন স্তরের ও বিভিন্ন বয়সের মানুষ অংশগ্রহণ করে। শোভাযাত্রায় বিভিন্ন ধরনের প্রতীকী শিল্পকর্ম বহন করা হয়। এছাড়াও বাংলা সংস্কৃতির পরিচয়বাহী নানা প্রতীকী উপকরণ, বিভিন্ন রঙ-এর মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি নিয়ে হাজার হাজার মানুষ মানুষ জমায়েত হয়।বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আবেদনক্রমে ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ৩০শে নভেম্বর বাংলাদেশের ‘‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’’ জাতিসংঘ সংস্থা ইউনেস্কোর অধরা বা ইনট্যানজিবল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে র তালিকায় স্থান লাভ করে।”

ইতিহাস সম্পর্কে বলা হয়েছে, “মাহবুব জামাল শামীম নামক শুরুর দিকের একজন অংশগ্রহণকারীর কাছ থেকে জানা যায় পূর্বে এর নাম ছিল বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা। সেই সময়ের সংবাদপত্রের খবর থেকেও এমনটা নিশ্চিত হওয়া যায়। সংবাদপত্র থেকে যতোটা ধারণা পাওয়া যায়, ১৯৯৬ সাল থেকে চারুকলার এই আনন্দ শোভাযাত্রা মঙ্গল শোভাযাত্রা হিসেবে নাম লাভ করে।[৮] তবে বর্ষবরণ উপলক্ষে আনন্দ শোভাযাত্রা চারুকলায় ১৯৮৯ সালে শুরু হলেও এর ইতিহাস আরো কয়েক বছরের পুরানো।১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে চারুপীঠ নামের একটি প্রতিষ্ঠান যশোরে প্রথমবারের মতো নববর্ষ উপলক্ষে আনন্দ শোভাযাত্রার আয়োজন করে।”

শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত নানা প্রতীক/প্রতিকৃতি:

মঙ্গল শোভাযাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় বিষয়টি হচ্ছে বিশাল বিশাল আকৃতির নানা প্রতিকৃতি তৈরি করে সেগুলোকে সাথে নিয়ে যাত্রা করা। এসব প্রতিকৃতিকে নানা গুনের প্রতীক হিসেবে মনে করা হয়।
এ বছর শোভাযাত্রায় কি কি প্রতীক/প্রতিকৃতি ব্যবহার করা হয়েছে সে সম্পর্কে আয়োজকরা জানিয়েছেন, “চারুপীঠ যশেরের সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশিদ বলেন, ‘শোভাযাত্রাকে বর্ণিল ও আকর্ষণীয় করতে আমরা করেছি বিশাল আকৃতির ময়ূর, পুতুল, লোকজ নৌকা, হাতি, ঘোড়া, কচ্ছপ, ফড়িং, ইঁদুর।” (সূত্র: বাংলাট্রিবিউন) প্রথম আলো জানাচ্ছে, “প্রতিবারের মতো এবারও মঙ্গল শোভাযাত্রায় হরেক রঙের মুখোশ, হাতি, বাঘ, ফুল, পাখির প্রতিকৃতি ছিল। সমৃদ্ধির প্রতীক কালো হাতি সবার সামনে। এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রায় রাখা হয় সূর্য।”

২০১৪ সালের শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত নানা প্রতীক ও প্রতিকৃতির বিষয়ে ইত্তেফাকের এক রিপোর্টে বলা হয়, “আয়োজনের সঙ্গে থাকা চারুকলার ছাত্র ওবায়দুল ইসলাম মিঠু জানান, এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রায় হাঁসকে প্রাধান্য দেয়া হলেও বরাবরের মতো বাংলা সংস্কৃতির সবকিছুই থাকবে। অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে থাকছে সরাচিত্র, খেলনা, মা ও শিশু, মাছের ঝাঁক, লক্ষ্মী পেঁচাসহ আরও নানান শিল্পকর্ম।”

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একেক বছর একেক ধরনের প্রতিকৃতির প্রাধান্য থাকে। আবার কিছু কিছু প্রতীক কোনো বছর বাদ পড়ে আবার পরের বছর যুক্ত হয়। সার্বিকভাবে যে কয়টি প্রাণী বা বস্তুর প্রতিকৃতি বানানো হয় তার মধ্যে নিচেরগুলো উল্লেখযোগ্য-
বাঘ, সিংহ, হাতি, ষাঁড়, ময়ূর, লক্ষ্মী পেঁচা, প্রজাপতি, ইঁদুর, ঘোড়া, কচ্ছপ, ফড়িং, ঈগল, পুতুল, লোকজ নৌকা, কোলা ইত্যাদি।

এছাড়া মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জলন করেই সাধারণত মঙ্গল শোভাযাত্রার শুরু করা হয়। এ বছর (১৪২৪ সাল) ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমানও মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়েই শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন।
“...শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান। মঙ্গল প্রদীপ ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে ময়মনসিংহে বাংলা নববর্ষ শুরু হয়। ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসন ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট বর্ষবরণ উদযাপন পর্ষদের উদ্যোগে মুকুল নিকেতন থেকে মঙ্গল সকাল সাড়ে ৮টায় শোভাযাত্রা বের হয়।”

কিছু প্রতীকের সাথে ধর্মের সংশ্লিষ্টতা আছে কি?

মঙ্গল শোভাযাত্রার বিরোধিতাকারীদের দাবি, এটিতে ব্যবহৃত বেশ কিছু প্রতীক বা প্রতিকৃতি হিন্দু ধর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট। কিন্তু আয়োজক ও সমর্থকরা বলছেন হিন্দু ধর্মের সাথে সংশ্লিষ্টতা নেই। আমরা এখানে যাচাই করবো কার দাবি সঠিক বা ভুল।

মঙ্গল প্রদীপ:

প্রথমেই মঙ্গল প্রদীপের বিষয়টি খতিয়ে দেখা যাক। এবারের শোভাযাত্রা উদ্বোধনের সময় ময়মনসিংহে ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জলন করেছেন।
হিন্দুধমের নানা অনুষ্ঠান, বিশেষ করে পুঁজার শুরুতে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালানোর রেওয়াজ অনেক পুরনো। কিছু উদাহরণ দেয়া যায়।

২০১৬ সালের ২৫ আগস্ট দৈনিক মানবজমিনের “আজ শুভ জন্মাষ্টমী” শিরোনামের প্রতিবেদন বলা হয়েছে, “এদিকে শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে হাটখোলা রোড টিকাটুলির শ্রী শ্রী প্রভূ জগদ্বন্ধু মহাপ্রকাশ মঠ ২৫শে আগস্ট থেকে ২৮শে আগস্ট বিস্তারিত কর্মসূচি পালন করবে। আজ সকালে শুভ শঙ্খধ্বনি ও মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে জন্মাষ্টমী উৎসব শুরু হবে।”

২০১৪ সালের ১৭ আগস্ট বাংলানিউজের “দেশব্যাপী জন্মাষ্টমী উদযাপন” শিরোনামের প্রতিবেদনের শুরুতেই বলা হয়, “দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় জন্মাষ্টমী উপলক্ষে মঙ্গল শোভাযাত্রা, প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, প্রসাদ বিতরণ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।”

২০১৪ সালের ১৮ আগস্ট সরকারি সংবাদ সংস্থা বাসস-এর ‌‘Janmashtami' celebrated in Rangpur division amid festivity’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “Dozens of colourful rallies, 'Mangal Shovajatra', discussions on Lord Krishna and religious rituals were arranged and special prayers offered seeking divine blessings for continuous peace, welfare and prosperity of the nation and the whole humankind.

Thousands of the Hindu people of all ages, attired in traditional dresses, took part in the 'Mangal Shovajatra' and colourful rallies carrying idol of Lord Krishna, colourful banners and festoons to mark the auspicious day.

গত ৩০ মার্চ দৈনিক কালের কণ্ঠের একটি প্রতিবেদন ছিল, “ভাণ্ডারিয়ায় শ্রীগুরু সংঘের ৫৫তম ধর্মীয় উৎসবে মঙ্গল শোভাযাত্রা”। তাতে লেখা হয়েছে, “হিন্দু ধর্মীয় শ্রীগুরু সংঘের উদ্যোগে সংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্রী শ্রীমদ দুর্গাপ্রসন্ন পরমহংসদেবের স্মরণে ৫দিন ব্যাপি ৫৫তম ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে আজ বৃহস্পতিবার মঙ্গল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকালে ভাণ্ডারিয়া কেন্দ্রীয় মন্দির প্রাঙ্গণে প্রাতঃকালীন প্রার্থণা ও শ্রীগুরু বন্ধনা, গীতাপাঠ, সংঘ পতাকা পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে এ ধর্মীয় অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করা হয়।“

২০১৪ এর ১৮ আগস্টের নিউজ এইজ এর ‘Janmashtami celebrated’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়, “Praying for welfare of the nation and the country, Geeta Jajna was held in the morning and the traditional Janmashtami procession was brought from the national temple in the afternoon. Custodian of the national temple Pradeep Kumar Chakroborty and commerce minister Tofail Ahmed jointly inaugurated the procession by lighting ‘mangal pradeep’.”

এভাবে বহু সংবাদ আছে, যেগুলোর মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে, হিন্দুধর্মীয় আচার বা পূঁজার একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ হচ্ছে মঙ্গল প্রদীপ।

এছাড়া ‘মঙ্গল’ শব্দ সহযোগে হিন্দুধর্মের বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের নামকরণ করা হয়েছে। এখানে প্রসঙ্গক্রমে মহাভারতের দ্বিতীয় খণ্ডের ১০১ পৃষ্ঠায় ‘মঙ্গলযাত্রা’ করার নির্দেশের কথাটি উল্লেখ করা যায়। (সূত্র: মহাভারত)


লক্ষ্মী পেঁচা:

হিন্দু ধর্মে ধন আর ঐশ্বর্যের দেবী লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা। পেঁচা দিনের বেলা চোখে দেখতে পায় না। লোককথা মতে, মনে করা হয় যারা তত্ত্ব বিষয়ে অজ্ঞ, যারা ধনবান, তারা পেচকধর্মী। আপাত দৃষ্টিতে অন্ধ। ধনবান ব্যক্তির মধ্যে এই প্যাঁচার বৃত্তিটি বর্তমান থাকে। তাই ভাবার্থগত কারণেই বাঙালি লোক বিশ্বাসে প্যাঁচাকে লক্ষ্মীর বাহন হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। (সূত্র: প্রথম আলো)

সিংহ ও বাঘ দুর্গার বাহন

দেবী দুর্গার বাহন সিংহ। পূজায় দুর্গার সঙ্গে সিংহেরও পূজা করা হয়। সিংহ রজোগুণের শক্তির উচ্ছ্বাসের প্রতীক। সিংহ আসুরিকতা ও পাশবিকতা দূর করে দেবীর পুণ্য কাজের সাহায্যকারী হয়ে উঠেছে। সিংহকে মানুষের পাশবিকতা বিজয়ের প্রতীকও ধরা হয়। মানুষ মানবতা আর সত্যিকারের মনুষ্যত্বের অধিকারী হয়। সিংহ দেবীর চরণতলে সেই ভাবনারই প্রতীক। লোককথায় আছে, মহিষাসুর বধের সময় হিমালয় সিংহকে বাহন হিসেবে দিয়েছিল। (সূত্র: প্রথম আলো)

ইঁদুর: (ইঁদুর গণেশের বাহন)

দুর্গার এক ছেলে গণেশ। বিঘ্ন নাশকারী। অষ্টপাশ নাশকারী। অষ্টপাশ হচ্ছে ঘৃণা, অপমান, লজ্জা, মান, মোহ, দম্ভ, দ্বেষ ও বৈগুণ্য। গণেশের মধ্যে এই অষ্টপাশ ছেদ করার ভাব বর্তমান। গণেশ গণশক্তির ঐক্যবদ্ধতারও প্রতীক। গণেশের বাহন ইঁদুর বা মুষিক। ইঁদুর মায়া ও অষ্টপাশ ছেদনের প্রতীক। প্রশ্ন জাগতে পারে, ওইটুকু একটা প্রাণী এত বিশাল শরীরের একজনকে কী করে বহন করে! মূলত এখানে ইঁদুরের চরিত্রবৈশিষ্ট্য মুখ্য। এই ছোট্ট প্রাণী একটু একটু করে আস্ত পর্বতও কাটতে পারে। এটি মূলত ধৈর্য, অধ্যবসায়, উদ্যমের প্রতীক। তাই গণেশের বাহন ইঁদুর। (সূত্র: প্রথম আলো)

হাঁস: স্বরসতীর বাহন

সরস্বতী বাণী আর জ্ঞানের দেবী। আর তাঁর বাহন হাঁস। হাঁস হিন্দুদের নিকট একটি পবিত্র প্রতীক। হিন্দু শাস্ত্রীয় মতে, দেবী এই উভচর বাহন ব্রহ্মার শক্তি হিসেবে তাঁর কাছ থেকে পেয়েছিলেন। কিন্তু ব্রহ্মা বা সরস্বতী দেবীর বাহনটি পাখিবিশেষ নয়। বেদ ও উপনিষদে হংস শব্দের অর্থ সূর্য। সূর্যের সৃজনী শক্তির বিগ্রহান্বিত রূপ ব্রহ্মা এবং সূর্যাগ্নির গতিশীল কিরণরূপা ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিবশক্তি সরস্বতী দেবীর বাহন হয়েছে হংস বা সূর্য। (সূত্র: প্রথম আলো)

ময়ূর: দেব সেনাপতি কার্তিকের বাহন

দেব সেনাপতি কার্তিকের বাহন ময়ূর। সৌন্দর্য আর বীর্যের প্রতীক। আর তাকে বহন করে একটি ময়ূর! তবে লোককাহিনি বলে ভিন্ন কথা। ময়ূর বিশাল বিষধর সাপকে কৌশলে নিহত করে। এটা তার যুদ্ধনৈপুণ্যের পরিচয় দেয়। ময়ূর দলবদ্ধভাবে বাস করে। ময়ূর স্ত্রীদের রক্ষায় সদা সচেষ্ট। ময়ূরের এই বৈশিষ্ট্য গুণের জন্যই কার্তিকের প্রিয় বাহন ময়ূর। কার্তিক একজন বীর যোদ্ধা। তিনি যুদ্ধে সিদ্ধহস্ত। অসহায় নারীদের প্রতি মানবিক মনোভাবসম্পন্ন। (সূত্র: প্রথম আলো)

ষাঁড়: শিবের বাহন

শিবের বাহন নন্দী ষাঁড়। ষাঁড় শক্তি, আস্থা এবং বিশ্বাসের প্রতীক। শিব মোহ, মায়া, এমনকী সমস্ত ভৌতিক ইচ্ছার ঊর্ধ্বে। ষাঁড় অর্থাত্‍‌ নন্দী এগুলিকে পুরোপুরি চরিতার্থ করে। তাই শিবের বাহন নন্দী। (সূত্র: এই সময়)

প্রজাপতি: বিয়ের দেবতা

গণেশ (বা হাতির মাথা সম্পন্ন দেবতা):

গণেশ হিন্দু দেবতা। শিব ও পার্বতীর পুত্র গণেশ সিদ্ধিদাতা হিসেবে বিশেষভাবে পূজিত হন। তিনি খর্বাকৃতি, ত্রিনয়ন, চতুর্ভুজ এবং হস্তিমস্তক। শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী গণেশের বাহন হচ্ছে ইঁদুর। গণেশ মঙ্গল ও সিদ্ধির জনক বলে সব দেবতার আগে পূজিত হন। তাকে ঐশ্বর্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক বলে গণ্য করা হয়। (সূত্র: বাংলাপিডিয়া)

সূর্য: সূর্য দেবতার প্রতীক

হিন্দুধর্মের প্রধান সৌর দেবতা। তিনি আদিত্যগণের অন্যতম এবং কশ্যপ ও তাঁর অন্যতমা ... কারণ তিনিই একমাত্র দেবতা যাঁকে মানুষ প্রত্যহ প্রত্যক্ষ করতে পারেন। অন্যান্য অনেক পৌত্তলিক ধর্মে সর্যকে দেবতা হিসেবে মনে করা হয়।

হিন্দু ধর্মের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে আয়োজক ও সমর্থকরা সচেতন?

মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী, সংস্কৃতিমন্ত্রীর মন্তব্যসহ আয়োজকদের উপরে দেয়া মন্তব্যে দেখা গেছে তারা বলেছেন যে, এই শোভযাত্রার কোনো রীতিনীতির সাথে কোনো ধর্মের মিল/সংশ্লিষ্টতা নেই। কিন্তু নিচের দুয়েকটি উদাহরণ স্পষ্টই বলছে, আয়োজকরা মঙ্গল শোভাযাত্রার সাথে হিন্দু ধর্মের মিলের বিষয়ে সচেতন।
এ বছরের ১ এপ্রিল দৈনিক সমকালের “জঙ্গিবাদ অপশক্তির বিরুদ্ধে এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রা” শিরোনামের প্রতিবেদন থেকে উদ্ধৃতি: “চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. নিসার হোসেন সমকালকে বলেন, 'এবার আমরা অর্জনকে উদযাপন করব। সে জন্য বিগত বছরগুলোতে যেসব শিল্প-কাঠামো মঙ্গল শোভাযাত্রার সম্মুখভাগে ছিল, সেগুলো ফিরিয়ে আনা হবে। যেমন ১৯৮৯ সালের প্রথম শোভাযাত্রার ঘোড়া ও বিশাল বাঘের মুখ এবারের শোভাযাত্রায় থাকছে। থাকছে সমৃদ্ধির প্রতীক হাতি।”

অধ্যাপক নিসার বলছেন, হাতি সমৃদ্ধির প্রতীক। উপরে উল্লেখ করা হয়েছে হিন্দু ধর্মের গণেশ দেবতাও (হাতির মাথা সম্পন্ন) সমৃদ্ধির প্রতীক! অধ্যাপক নিসার তাহলে জেনে বুঝেই বলেছেন।
২০১৪ সালের ১৪ এপ্রিল মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে বিডিনিউজের একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, “লক্ষ্মীপেঁচায় সমৃদ্ধি, গাজী ও বাঘ দুঃসময়ের কাণ্ডারি”। বাংলাদেশের সিংহভাগ সংবাদমাধ্যম সম্পাদকীয় নীতির দিক থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রার ঘোর সমর্থক। বিডিনিউজও একই নীতি অনুসরণ করে বলেই তাদের সংবাদে প্রতীয়মান। উপরিউক্ত শিরোনাম থেকেই স্পষ্ট হিন্দু ধর্মে লক্ষ্মী পেঁচার যে মাহাত্ম তা জেনেই প্রচার করছে অনলাইন পত্রিকাটি।

অসুরের বাহন মহিষের প্রতিকৃতি থাকে না!

উপরের বিবরণ থেকে দেখা যায়, ‘আবহমান বাঙলার ঐতিহ্য’ হিসেবে অভিহিত করে যেসব প্রাণীর প্রতিকৃতি মঙ্গল শোভাযাত্রায় ব্যবহার করা হয় সেগুলোর বেশিরভাগই হিন্দুধর্মের দেবতার প্রতীক বা দেবতার বাহন হিসেবে গৃহীত। কিন্তু এসব প্রাণীর বাইরেও অনেক প্রাণী বাঙালীর দৈনন্দিন জীবনের সাথে অতপ্রোতভাবে জড়িত, কিন্তু সেসব প্রাণীর প্রতিকৃতি ব্যবহার করা হয় না! যেমন, স্বরস্বতীর বাহন রাজহাঁসের প্রতিকৃতি শোভাযাত্রায় ব্যবহার করা হলেও মোরগের কোনো প্রতিকৃতি কখনো চোখে পড়ে না। অথচ, রাজহাঁসের চেয়ে গ্রামবাংলায় মোরগ বেশি সহজলভ্য এবং গুরুত্ব। আবার শিবের বাহন ষাঁড়ের প্রতিকৃতি বানানো হলেও গ্রামবাংলায় সহজলভ্য ছাগলের প্রতিকৃতি পাওয়া যায় না! এভাবে আরো অনেক গ্রামীণভাবে পরিচিত প্রাণীকে ‘বাংলার ঐতিহ্য’ মনে করেন না শোভাযাত্রার আয়োজকরা।

সবচেয়ে মজার বিষয়টি হল, মহিষের কোনো প্রতিকৃতি কখনো দেখা যায় না মঙ্গল শোভাযাত্রায়। ‘কাকতালীভাবে’ মহিষ হচ্ছে হিন্দু ধর্মের প্রধান খল চরিত্র অসুরের বাহন। একই সাথে এটি যমেরও বাহন হিসেবে স্বীকৃত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বছরের প্রথম দিনে অসুর আর যমের প্রতিকৃতি বহন করাকে ‘মঙ্গলজনক’ মনে করেন না আয়োজকরা!

NOTE: হিন্দু ধর্মের কোনো প্রতীক বা বিষয়কে ছোট করে দেখা বা দেখানো এই পোস্টের উদ্দেশ্য নয়। বরং বিভিন্ন প্রাণীকে দেব দেবীদের বাহন হিসেবে ব্যবহার করার মধ্যে ইতিবাচক দর্শন রয়েছে বলেই আমরা মনে করি। এই পোস্টে শুধুমাত্র এটাই দেখতে চাওয়া হয়েছে যে, হিন্দু ধর্মের সাথে মঙ্গল শোভাযাত্রার বিভিন্ন রীতিনীতির মিল থাকার বিষয়টিকে আয়োজক ও সমর্থকরা যেভাবে অস্বীকার করছেন তা সঠিক কিনা? বিশ্লেষণের পর দেখা যাচ্ছে আয়োজকদের দাবি সঠিক নয়।

Related Post