মিডিয়া ওয়াচ

মিডিয়া ওয়াচ

December 28, 2020, 3:34 am

Updated: December 28, 2020, 2:04 pm

কপিপেস্ট ও সূত্র উল্লেখে অসততা: ডিমের পিস ৩০ টাকা? ৩০ রুপি? না ৯ টাকা?

Author: BD FactCheck Published: December 28, 2020, 3:34 am | Updated: December 28, 2020, 2:04 pm

২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশি কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে, পাকিস্তানে এক ডিমের দাম ৩০ রুপি“।

এসব প্রতিবেদনের প্রায় সবগুলোতেই পাকিস্তানী সংবাদমাধ্যম দ্য ডন এর বরাত দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমগুলো দ্য ডন এর প্রতিবেদন দেখে তাদের এ সংক্রান্ত প্রতিবেদগুলো তৈরি করেছে।

যেমন দেখুন কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে খবরের সূত্র হিসেবে শেষ ‘ডন’ লেখা রয়েছে।

সময় টিভির প্রতিবেদন দেখুন এখানে। এই সংবাদমাধ্যমটিও পাকিস্তানের ‘দ্য ডন’-কে খবরেরর একমাত্র সূত্র হিসেবে উল্লেখ করেছে।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দুটি সংবাদমাধ্যমই তাদের প্রতিবেদনের সূত্র উল্লেখ করতে অসততার আশ্রয় নিয়েছে। বিডি ফ্যাক্টচেক যাচাই করে দেখেছে, কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনটির উল্লেখযোগ্য অংশ ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নিউজএইটিনের একটি প্রতিবেদনের সাথে অবিকল মিলে যায়। নিউজএইটিনের প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিলো, “একটি ডিমের দাম ৩০ টাকা ! আদা কিলো প্রতি হাজার টাকা, পাকিস্তানে মুদ্রাস্ফীতি“।

নিচে কালের কণ্ঠ এবং নিউজএইটিনের প্রতিবেদন দুটির মিলগুলো দেখুন–

লক্ষ্যণীয় হলো, নিউজএইটিনের প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে পাকিস্তানে একটি ডিমের দাম ‘৩০ টাকা’। যদিও কালের কণ্ঠের শিরোনামে ‌‌’৩০ রুপি’র কথা বলা হয়েছে। টাকা আর পাকিস্তানি রুপির মানের পার্থক্য বিশাল। ৩০ পাকিস্তানি রুপি বাংলাদেশি ১৬ টাকার সমান।

টাকা আর রুপি এই দুটি মুদ্রার নাম ভিন্নভাবে লেখলেও দুটি সংবাদমাধ্যমের অন্যান্য তথ্যাদি একই রকম। যেমন নিউজএইটিন জানিয়েছে পাকিস্তানে এখন ডিমের ডজন সাড়ে ৩০০ টাকা আর কালের কণ্ঠ জানিয়েছে সাড়ে ৩০০ রুপি। মজার বিষয়টি হলো, উভয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এই তথ্যের সূত্র হিসেবে দ্য ডন এর বরাত দেয়া হলেও দ্য ডন-এ সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানে ডিমের দাম সংক্রান্ত যেসব খবর পাওয়া যায় সেগুলোতে এমন তথ্য নেই।

গত ২১ ডিসেম্বর ডন এক প্রতিবেদনে জানায় দেশটিতে ডিমের দাম রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। Eggs rate in Lahore’s open market breaks records শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়, খুচরা বাজারে ডিমের ডজন ২১৬ রুপি পর্যন্ত ছুঁয়েছে। সে হিসেবে একটি ডিমের দাম পড়ে ১৮ পাকিস্তানি রুপি। বাংলাদেশি মুদ্রায় তা ৯ টাকার মতো। এর চেয়ে বেশি দামে ডিম বিক্রির কোনো তথ্য ডন-এ নেই।

দ্য ডন-এর প্রতিবেদনে সাড়ে ৩০০ রুপি/টাকা ডজন এবং ৩০ রুপি/টাকা প্রতি পিস- এমন কোনো তথ্য নেই। কালের কণ্ঠ দ্য ডন থেকে খবরটি নিলে ডন-এর তথ্যের সাথে মিল থাকতো। অর্থাৎ, সাড়ে ৩০০ রুপি ডজনের পরিবর্তে ২১৬ রুপি ডজন দামের কথা বলা হতো।

এছাড়া কালের কণ্ঠের (এবং নিউজএইটিন এর) প্রতিবেদনে “পাকিস্তানে বর্তমানে ২৫ শতাংশের বেশি মানুষ দারিদ্র সীমার নিচে বাস করেন” বলে তথ্যের উল্লেখ থাকলেও দ্য ডন এর ডিম সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এই তথ্য ছিলো না।

অর্থাৎ, কালের কণ্ঠ ডন থেকে প্রতিবেদনটির টেক্সট ও তথ্য নেয়নি। বরং বহু বাক্য ও তথ্যের হুবহু মিলে যাওয়া কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনটি নিউজএইটিন এর প্রতিবেদনের রি-রাইট করা ভার্সন।

অন্যভাবে বললে, কালের কণ্ঠ তাদের খবরের সূত্র উল্লেখের ক্ষেত্রে অসততা অবলম্বন করেছে এবং ভারতীয় একটি সংবাদমাধ্যমের খবর কপি/রিরাইট করে নাম উল্লেখ করেছে পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমের।

একই ধরনের অসততার পরিচয় পাওয়া যায় সময় টিভির প্রতিবেদনেও। এই সংবাদমাধ্যমটির “পাকিস্তানে একটি ডিম ৩০ রুপি, আদার কেজি হাজার!” শিরোনামের প্রতিবেদনটির টেক্সটের সাথে অস্বাভাবিক মিল পাওয়া গেছে ভারতীয় আরেক সংবাদমাধ্যম এবিপি আনন্দ-এর “গম ৬০, ডিম ৩০ টাকা! পাকিস্তানে জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া দামে হিমশিম আমআদমি” শিরোনামের প্রতিবেদনের।

নিচে দুটি প্রতিবেদনকে মিলিয়ে দেখুন–

এক্ষেত্রে সময় টিভি ‘দ্য ডন’ এর বরাত দিয়ে খবরটি নিয়েছে এবিপি আনন্দ থেকে। রিরাইট করার পরও উভয় প্রতিবেদনের বেশ কিছু বাক্য হুবহু একই থেকে গেছে।

এবিপি আনন্দ তাদের প্রতিবেদনে দ্য ডন বা অন্য কোনো সংবাদমাধ্যমের নাম উল্লেখ ছাড়াই তথ্য দিয়েছে, “পাকিস্তানে এখনও জনসংখ্যার প্রায় ৫০ শতাংশ দারিদ্রসীমার নিচে”। সময় টিভিও হুবহু এই তথ্যই দিয়েছে। কিন্তু এমন তথ্য ‘দ্য ডন’-এর এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে নেই। (অবশ্য একই তথ্যের ক্ষেত্রে নিউজএইটিন লিখেছিলো ২৫ শতাংশ)। ডিমের দামের ক্ষেত্রেও ডন-এর সাথে সময় টিভির উল্লেখ করা দামের মিল নেই। কিন্তু এবিপি আনন্দের উল্লেখ করা দামের সাথে মিল রয়েছে (যদিও এখানেও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমটি ‘টাকা’ আর বাংলাদেশিটি ‘রুপি’ লিখেছে।

কালের কণ্ঠের মতো সময় টিভিও ভারতীয় সূত্র থেকে পাকিস্তান বিষয়ক খবর নিয়ে পাকিস্তানের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমকে সূত্র হিসেবে উল্লেখ করে দিয়েছে। অথচ সূত্র হিসেবে উল্লেখ করা প্রতিবেদনের সাথে খবরে দেয়া তথ্যের মিল নেই।

এই খবর বাংলাদেশি আরও বেশ কিছু সংবাদমাধ্যম দ্য ডন এর বরাতে প্রকাশ করেছে। প্রায় সবার শিরোনামেই ছিলো ‘৩০ রুপি’ এর তথ্যেটি। কিন্তু কোনো প্রতিবেদনেই পাকিস্তানি ৩০ রুপি সমান বাংলাদেশি কত টাকা সেটির কোনো ধারণা দেয়া হয়নি। সাধারণত বাংলাদেশি পাঠকের কাছে ‘রুপি’ বলতে ভারতীয় রুপিই অধিক পরিচিত। তাদের অনেকেরই পাকিস্তানি রুপির মান সম্পর্কে ধারণা নেই। ফলে ‘রুপি’ শোনার সাথে সাথে ভারতীয় রুপির মান-কেই অনেকে বিবেচনায় নেবেন পাকিস্তানে ডিমের দাম সম্পর্কে ধারণা পেতে। অথচ ভারতীয় রুপির মান পাকিস্তানি রুপির দ্বিগুনের চেয়েও বেশি। ৩০ পাকিস্তানি রুপি সমান ১৪ ভারতীয় রুপি, আর ১৬ বাংলাদেশি টাকা।

ফলে যেসব ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ‘৩০ টাকা’ লেখা হয়েছে সেগুলো পড়ে পাঠকরা ভুল ধারণা পেয়েছেন। বাংলাদেশি যেসব সংবাদমাধ্যমে ‘৩০ রুপি’ লেখা হয়েছে সেগুলোর পাঠকদেরও বিভ্রান্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

অবশ্য দ্য ডন- এর বরাতে দেয়া এই ‘৩০ টাকা’ বা ‘৩০ রুপি’ তথ্যটিই তো সঠিক নয়। দ্য ডন-এর তথ্য বলছে ডিমের সর্বোচ্চ রেকর্ড দাম হয়েছে প্রতি পিস ১৮ পাকিস্তানি রুপি, যা ভারতীয় রুপিতে সাড়ে রুপি আর বাংলাদেশি টাকায় ৯ টাকা।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *