ভুয়া সংবাদ: ট্রাম্প থেকে শেখ হাসিনা

01:10 AM মিডিয়া স্কুল

জাহেদ আরমান

পৃথিবীতে প্রাতিষ্ঠানিক সাংবাদিকতা শুরুর অনেক আগে থেকে ভুয়া সংবাদ চলে আসছে। যদিও ২০১৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনী প্রচারণার সময় ’ভুয়া সংবাদ’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছিলেন রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি মুলধারার সংবাদ মাধ্যমের সংবাদ পরিবেশনের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, এসব সংবাদ মাধ্যম তাঁর বিরুদ্ধে ভুয়া সংবাদ ছড়াচ্ছে। অথচ ফ্যাক্টচেক সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পই তাঁর টুইটার একাউন্টের মাধ্যমে ভুয়া বক্তব্য ছড়িয়েছেন বেশি।

প্রিন্টিং প্রেস আষ্কিারের অনেক আগে থেকেই পৃথিবীতে ভুয়া সংবাদের প্রচলন চলে আসছে। উদাহরণের জন্য বেশিদূর যেতে হবে না। প্রথম বাংলা বিজেতা ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি বাংলা আক্রমণের আগে রাজা লক্ষণ সেনের কাছে খবর পাঠিয়েছিলেন, একদল ঘোড়া ব্যবসায়ী ব্যবসার উদ্দেশ্যে তাঁর প্রাসাদে আসছে। ফলে প্রাসাদের দ্বাররক্ষীরা বখতিয়ার খলজিকে ঘোড়া ব্যবসায়ী মনে করে প্রাসাদের ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দিয়ে দেয়। অথচ তিনি ঘোড়া ব্যবসায়ী ছিলেন না।

ইউরোপে প্রিন্টিং প্রেস আবিস্কারের পর ভুয়া সংবাদের ব্যবহার বেড়ে যায়। ১৬৫৭ সালে ক্যাটালোনিয়ার (বর্তমানে স্পেনের চারটি প্রদেশ নিয়ে ক্যাটালোনিয়া গঠিত) সংবাদপত্রে একটি দৈত্য আবিষ্কারের সংবাদ ছাপা হয় যেটার শরীর দেখতে অবিকল মানুষের মত এবং যার সাতটি হাত রয়েছে। ১৬১১ সালে একটি ইংরেজি সংবাদ বইতে একজন ডাচ মহিলার সংবাদ ছাপা হয় যে কোনোকিছু না খেয়ে ১৪ বছর জীবিত ছিলেন (স্ট্যানডেজ, ২০১৭)। এই সংবাদগুলো আজকের দিনের ভুয়া সংবাদের চেয়ে বেশি কিছু নয়।

আঠারো আশির দশকে যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিকতা জগতের দুই ব্যক্তিত্ব জোসেফ পুলিৎজার আর উইলিয়াম রুডলফ হার্স্টের মধ্যে পেশাগত প্রতিযোগিতার একপর্যায়ে যে হলুদ সাংবাদিকতার জন্ম হয় তার ধরনও অনেকটা এইসময়ের ভুয়া সংবাদের মতই। ওই সময়ে হলুদ সাংবাদিকরা পত্রিকায় ভুয়া সাক্ষাৎকার প্রকাশ করতো মানুষের মনোযোগ আকর্ষণের আর পত্রিকার কাটতি বাড়ানোর জন্য।

সামাজিক গণমাধ্যমের যুগে ভুয়া সংবাদ যেন নতুন যুগে প্রবেশ করলো। এর দুইটা কারণ আমি প্রত্যক্ষ করি।

এক. ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অাধিক্যের কারণে ভুয়া সংবাদের সহজলভ্যতা ও বিপনন আগের চেয়ে অনেক সহজতর হয়েছে। স্ট্যানফোর্ড এবং নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা দেখেছেন, ৪০ শতাংশ ব্যবহারকারী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্যে ৬৫ টি ভুয়া সংবাদের সাইটে প্রবেশ করেছেন। অন্যদিকে মাত্র ১০ শতাংশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারী ৬০৯ টি মুলধারার সংবাদ মাধ্যমে প্রবেশ করেছেন। এই গবেষণা থেকে পরিষ্কার, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মুলধারার সংবাদের চেয়ে ভুয়া সংবাদ বেশি ছড়ায়।

দুই. নির্বাচনকালীন প্রচারণায় ভুয়া সংবাদ মানুষের আচরণ পরিবর্তন করতে পারে। (ময়, জেনোস, এবং হেস, ২০০৬; ইয়ং, ২০০৬)। ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনই তার বড় প্রমান। গবেষক মেইটাল বালমাস ২০০৬ সালে ইসরাইলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকালীন প্রচারণা পর্যবেক্ষণ করে দেখিয়েছেন, ভুয়া সংবাদ প্রার্থী সম্পর্কে জনসাধারণের আচরণ পরিবর্তন করে দিতে পারে।

এই দুই কারণেই ভুয়া সংবাদ ব্যক্তি ও সমাজে, বিশেষ করে রাজনীতিতে অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করে চলেছে।

এবার আসি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভুয়া সংবাদ প্রসঙ্গে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে ভুয়া সংবাদ হচ্ছে যে কোনো নির্ভরযোগ্য সংবাদ যেটা সে পছন্দ করে না (কল, ২০১৭)। ফ্যাক্ট যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান পলিটিফ্যাক্ট, ২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ট্রাম্পের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে বলেছে, এই সময়ের মধ্যে ট্রাম্প তিন হাজার ২৯টি জনবক্তব্য দিয়েছেন যেগুলো সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা অথবা অধিকাংশই মিথ্যার মধ্যে পড়ে। কিন্তু ব্যাপারটা জটিল আকার ধারণ করে তখনই যখন ট্রাম্পের এই বক্তব্যের উপর ভিত্তি অনেক মূলধারার সংবাদ মাধ্যম সংবাদ প্রচার করে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত মাসের শেষের দিকে নিউইয়র্কের অবস্থানকালে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে একটি সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তিনি বলেছেন, গত আগস্ট মাসে ছাত্র আন্দোলনের সময় আলোকচিত্রী শহিদুল আলম ভুয়া সংবাদ ছড়িয়ে তার সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চেয়েছিলেন এ ব্যাপারে তার কোনো সন্দেহ নাই (স্পাইসার এবং কাদির, ২০১৮, অক্টোবর ১২)। এখানে উল্লেখ্য যে, আল জাজিরা শহীদুল আলমের বক্তব্য নেওয়ার আগে একটি সংবাদ প্রচার করেছে। এরই ফলোআপ হিসেবে তারা শহীদুল আলমের মতামত সাক্ষাৎকারটি নিয়েছে। শহীদুল আলম যে মতামত ‍দিয়েছেন তা প্রচার করেছে আল জাজিরা। তাই একথা বলা যায়, শহীদুল আলম নিশ্চিতভাবেই ভুয়া সংবাদ প্রচার করেনি, করলেও তা করেছে আলজাজিরা।

আমি মনে করি, যে কোনো পরিস্থিতিতে একজন মানুষের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। আর সেই মত নিজের মতের বিপক্ষে গেলেই তাকে ভুয়া সংবাদ কিংবা গুজব বলে আখ্যায়িত করাটা মানুষের স্বাধীন মত প্রকাশের উপর সরাসরি হস্তক্ষেপ।

[বি.দ্র. প্রবন্ধের বক্তব্য একান্তই লেখকের নিজস্ব বক্তব্য।]


Related Post