নীল আর্মস্ট্রং ও সুনিতা উইলিয়ামস কি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন?

03:11 AM আন্তর্জাতিক

জাহেদ আরমান

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন সংবাদপত্রে এইরকম সংবাদ প্রায়ই দেখা যায়, নাসা’র মহাকাশ বিজ্ঞানী নীল আর্মস্ট্রং ও সুনিতা উইলিয়ামস ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। এর স্বপক্ষে প্রচারকারীরা বিভিন্ন রকম যুক্তিও দিয়ে থাকেন। তবে বিডি ফ্যাক্টচেক’র অনুসন্ধানে নীল আর্মস্ট্রং ও সুনিতা উইলিয়ামস এর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

নীল আর্মস্ট্রং সম্পর্কে যা বলা হয়:

নীল আর্মস্ট্রংয়ের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে যে প্রচারণা সেটা অনেক পুরনো। ১৯৮০ দশকের। নীল আর্মস্ট্রং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন এমন দাবির স্বপক্ষে প্রচারকারীদের মুখে দুইটি কাহিনী শুনা যায়।

প্রথম কাহিনী: আর্মস্ট্রং যখন চাঁদের মাটিতে হাঁটছিলেন তখন এক অচেনা ভাষায় অদ্ভুতসুরে কিছু শব্দ শুনতে পান। সেই শব্দ সেই সময় তাঁর বোধগম্য হয়নি। পরবর্তীতে পৃথিবীতে ফেরার পর তিনি মিশরে যান এবং সেখানে আযানের ধ্বনি শোনেন। তিনি বলেন, “আমি যখন চাঁদে গিয়েছিলাম তখন এরকমই কিছু শুনতে পেয়েছিলাম”। তখন তার মিশরীয় বন্ধু এটিকে আযানের ধ্বনি বলে জানালে তিনি তৎক্ষনাৎ ইসলাম গ্রহণ করেন।

দ্বিতীয় কাহিনী: আর্মস্টং যখন চাঁদের মাটিতে তথ্যানুসন্ধান করছিলেন তখন তিনি চাঁদের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত একটি লম্বা ফাটল দেখতে পান। এই ফাটলের সাথে তিনি তিনি নবী মুহাম্মদের চাঁদ দ্বিখন্ডিত করার কাহিনীর যোগসূত্র খুঁজে পান। এরপর পৃথিবীতে ফিরে এসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

সুনিতা উইলিয়ামস সম্পর্কে যা বলা হয়:

সুনিতা উইলিয়ামস এর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে বলা হয়, সুনিতা যখন ভু-পৃষ্ঠ থেকে ২৪০ মাইল উপরে উঠেন তখন জানালা দিয়ে পৃথিবীর দিকে তাকান। তখন তিনি দুইটি তারা (আলো) দেখতে পান। পরে তিনি টেলিস্কোপ দিয়ে দেখেন ওই দুটি আলোর উৎস মক্কা এবং মদিনা। তিনি তখনই সিন্ধান্ত নেন, ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করবেন। পরে তিনি পৃথিবীতে ফিরে এসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

বিডি ফ্যাক্টচেক’র অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, নিল আর্মস্ট্রং কিংবা সুনিতা উইলিয়ামস কেউই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেননি। এর স্বপক্ষে প্রমাণগুলো হচ্ছে:

নীল আর্মস্ট্রংয়ের ইসলাম গ্রহণ না করার প্রমাণ:

১৯৮০র দশকে নিল আর্মস্ট্রংয়ের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কিত প্রচারণা এতই ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছিল যে বিভিন্ন গবেষণা সংস্থ্যা, যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশ মিশনসহ বিভিন্ন জায়গায় তা চিঠির মাধ্যমে জানাতে হয়েছিল।  

এশিয়ান রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক ফিল পার্সালের কাছে লেখা এক চিঠিতে আর্মস্ট্রয়ের হয়ে ওই মিথাচারের জবাব দেন ভিভিয়ান হোয়াইট। চিঠিতে তিনি লিখেন,

“আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি এই বিষয়ে আপনার আগ্রহের জন্য। আর্মস্ট্রং আমাকে এই চিঠির উত্তর দিতে বলেছেন।

আর্মস্ট্রংয়ের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ ও চাঁদে আযানের মতো কিছু শুনতে পাওয়া নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে যে প্রতিবেদন এসেছে তা সত্য নয়। মালেশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ অন্যান্য দেশের সংবাদপত্রে যেসব প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে তা যাচাই না করেই ছাপা হয়েছে। আমরা ক্ষমা চাচ্ছি এই কারণে যে, ওইসব অপূর্নাঙ্গ সংবাদ আপনাকেও প্রভাবিত করেছে।”

ওই সময় নীল আর্মস্ট্রংয়ের ইসলাম গ্রহণ করার খবর এতই ব্যাপকহারে ছড়িয়েছিলো যে যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে পর্যন্ত এই প্রচারণার উত্তর দিতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রে স্টেট ডিপার্টমেন্ট নিল অার্মস্ট্রংয়ের হয়ে একটি চিঠি বিভিন্ন দেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসগুলোতে পাঠান। এতে বলা হয়,  

“সাবেক নভোচারী নীল আর্মস্ট্রং যিনি এখন অবসর সময় কাটাচ্ছেন এবং কোনো প্রয়োজন ছাড়া জনসাধারণের সামনে আসেন না। মিশর, মালেশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সংবাদপত্রে ১৯৬৯ সালে চন্দ্র অভিযানের সময় তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন এমনটি বলা হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন ব্যক্তি, সংস্থা এমনকি একটি দেশের সরকারের পক্ষ থেকে তার ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ব্যাপারটি নিয়ে তাঁর সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে।”

কোন ধর্মকে অশ্রদ্ধা করাকে তিনি কখনও পছন্দ করেন না। তারপরও তিনি স্টেট ডিপার্টমেন্টকে নিশ্চিত করেছেন, তাঁর ইসলাম গ্রহণ করার যে সংবাদ বিভিন্ন দেশের সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে তা সত্য নয়।

যারা এই বিষয়ে অতীব আগ্রহী তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের মাধ্যমে জানান, তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি এবং অদূর ভবিষ্যতে করবেন এমন ইচ্ছাও নাই।



সুনিতা উইলিয়ামের বক্তব্য:

২০১০ সালে সাহার খান মহাকাশ বিজ্ঞানী সুনিতা উইলিয়ামস এর সাক্ষারৎকার নেন। ওই সাক্ষাৎকারটি একই বছরের ১০ অক্টোবর ট্রাভেলার ম্যাগাজিনে ছাপোনো হয়। সেখানে সাহার খান উইলিয়ামসকে জিজ্ঞেস করেন, মহাকাশ থেকে মক্কা ও মদিনায় আলো দেখার পর আপনি ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন বলে যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে তা কতটুকু সত্য?

এর উত্তরে সুনিতা উইলিয়ামস যা বলেছেন তা হচ্ছে:

“আমি জানি না এটা কোথা থেকে শুরু হয়েছে। কোনো ধর্মের প্রতি আমার কোনো বিশেষ পক্ষপাতিত্ব নেই। আমার বাবা হিন্দু এবং আমি বড় হয়েছি কৃঞ্চ, রাম এবং সীতা সম্পর্কে জেনে। আমার মা খ্রিষ্টান।সে দিক দিয়ে যীশু কী বলেছেন সে সম্পর্কেও জেনেছি। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, একজন ইশ্বর আছেন যিনি সবসময় আমাদেরকে পর্যবেক্ষণ করছেন, পরিচালনা করছেন যাতে আমরা সুখী ও সুন্দর জীবন কাটাতে পারি। এটা শুধু আমার চিন্তা।” (খান, ২০১০)

২০১৩ সালের ২ এপ্রিল ভারত সফরে এসে গণমাধ্যমের সাথে সাক্ষাৎকারে সুনিতা উইলিয়াম বলেছিলেন,

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে যাওয়ার সময় তিনি এক কপি ভগবদ্ গীতা ও ভগবান গণেশের ছোট একটি মূর্তি নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি মহাকাশ স্টেশনে অবস্থানকালে গীতা পাঠ করতেন বলেও জানান।” (এনডিটিভি, ২০১৩)

অতএব, নভোচারী নীল আর্মস্ট্রং ও সুনিতা উইলিয়ামস ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন বলে যে প্রচারণা চালানো হয় তা সত্য নয়।

Related Post