সাকিব-মাশরাফী কি নির্বাচনে অংশগ্রহণে খুবই আগ্রহী?

11 November, 2018 16:11 PM পাবলিক ফিগার

ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদক:

আজ রোববার (১১ নভেম্বর) সকালে ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর কার্যালয়ে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরে কাছে সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল, ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান বা মাশরাফী বিন মর্তুজাকে কি নিজে থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে চেয়েছেন? নাকি আওয়ামী লীগ তাদেরকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিতে চেয়েছে?

এর জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, “আমরা কাউকে জোর করে আমাদের এখানে আনবো দেশের স্বার্থ ক্ষুন্ন করে, এটা আমরা করবো না। এবং সাকিবকে সিদ্ধান্ত দেয়ার মধ্য দিয়ে (নির্বাচনে না আসার) শেখ হাসিনা প্রমাণ করলেন, ব্যক্তির চাইতে দল বড়, দলের চাইতে দেশ বড়। এবং এইযে দেশপ্রেমিক (হিসেবে) তার যে মানসিকতা তা আবারও দিবালোকের মতো পরিষ্কার হলো।”

তিনি আরও বলেন, “মাশরাফীর ইলেকশন করার বিষয়টি বহু আগেই সিদ্ধান্ত হয়ে আছে। তবে সাকিবও ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। এখন দেশের স্বার্থে সাকিব মনে করছেন, বা নেত্রী তাকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, এখন তার ক্রিকেটেই মনোনিবেশ করা দরকার বিশ্বকাপ ক্রিকেট পর্যন্ত। বিষয়টা হচ্ছে এই।” (সূত্র: যমুনা টিভি। লিংক

তবে বিগত কয়েক মাসে সাকিব আল হাসান, মাশরাফী বিন মর্তুজা, মাশরাফীর পরিবার ও ঘনিষ্টজনের বেশ কিছু বক্তব্য গণমাধ্যমে এসেছে, যেগুলোতে দেখা যাচ্ছে সাকিব বা মাশরাফী কেউই ২০১৯ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপের আগে নির্বাচন বা রাজনীতি ইত্যাদি বিষয়ে তাদের কোনো চিন্তাভাবনা নেই বলে স্পষ্ট জানিয়েছিলেন। এমনকি পাঁচ মাস আগে ওবায়দুল কাদের নিজেও সাকিব ও মাশরাফীর বরাত দিয়ে বলেছিলেন, বিশ্বকাপের আগে তারা রাজনীতি নিয়ে ভাবতে আগ্রহী নন।

অর্থাৎ, আজ রোববার ওবায়দুল কাদেরের দেয়া বক্তব্য (“মাশরাফীর ইলেকশন করার বিষয়টি বহু আগেই সিদ্ধান্ত হয়ে আছে। তবে সাকিবও ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল।”) এবং আগের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী।

গত মে মাসের ৩১ তারিখ দেশের শীর্ষ স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোতে খবর প্রকাশিত হয় ওবায়দুল কাদেরের আগের বক্তব্য নিয়ে। তেমন কয়েকটি প্রতিবেদনের শিরোনাম এখানে তুলে ধরছি--

প্রথম আলো- বিশ্বকাপের আগে রাজনীতি নিয়ে কথা নেই সাকিব-মাশরাফির: কাদের

বাংলাট্রিবিউন- ‘বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আগে রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছেন না সাকিব-মাশরাফি’

ভোরের কাগজ- সাকিব-মাশরাফি নির্বাচন নিয়ে এখন ভাবছে না: কাদের

ডেইলি স্টার- Mash, Shakib not thinking to participate in polls now: Quader

প্রথম আলোর রিপোর্টটি থেকে ওবায়দুল কাদেরেরে বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিচ্ছি--

“সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আগামী জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নে কিছু চমক আছে। সাকিব আর মাশরাফি এঁদের ব্যাপারে আমরা কোনো মন্তব্য এই মুহূর্তে করতে চাই না। সাকিবের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। বিশ্বকাপের আগে নির্বাচন নিয়ে, রাজনীতি নিয়ে তাঁদের কোনো কথা নেই।’

“জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, বিশ্বকাপের পরেই দেখা যাবে তাঁরা কে কে নির্বাচন করবেন? কীভাবে করবেন, কোন আসন থেকে করবেন? এগুলো আলাপ–আলোচনার পর্যায়ে চলছে। বিশ্বকাপের আগে তাঁরা মনস্থির করেননি।”

বাংলাট্রিবিউনের প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে--

“আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মর্তুজা ও সাকিব আল হাসান প্রার্থী না হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘আগামী বিশ্বকাপের আগে সাকিব ও মাশরাফি রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন না।’ বৃহস্পতিবার (৩১ মে) দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সম্পাদকমণ্ডলীর সভা শেষে তিনি একথা জানান।

সেতুমন্ত্রী বলেন, ‘সাকিব আল হাসানের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আগে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন না।”


সাকিব কী ভাবছিলেন?

ওবায়দুল কাদেরের এই বক্তব্যের সপ্তাহ দুয়েক আগে (১৪ এপ্রিল ২০১৮) সাকিব আল হাসানের সাক্ষাৎকার নেয় ভারতীয় সংবাদমাধ্যম পিটিআই। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতেও ওই সাক্ষাৎকার পুনপ্রকাশিত হয়। “রাজনীতিতে আসা নিয়ে এখনই ভাবছেন না সাকিব” শিরোনামে প্রথম আলোর এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি--

“৩১ বছর বয়সী এ অলরাউন্ডারকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, অবসর নেওয়ার পর রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার ভাবনা আছে কি না? সাকিবের জবাব, ‘ভবিষ্যৎ নিয়ে কেউ কিছু বলতে পারে না। আমি বর্তমান নিয়েই থাকতে চাই। কিন্তু কোনো কিছুই উড়িয়ে দিচ্ছি না। এ ব্যাপারে (রাজনীতি) এখনো ভাবিনি, তাই এটা নিয়ে এখন কথা বলাও কঠিন। ক্রিকেট আমার জীবন এবং মনোযোগটা শুধু এখানেই (ক্রিকেট) থাকবে।”

এখন থেকে ৭ মাস আগের এই বক্তব্যে সাকিব ‘ভবিষ্যতে’ রাজনীতিতে আসার কথা উড়িয়ে দেননি। কিন্তু প্রশ্নটা যেহেতু ছিল ‘ক্রিকেট থেকে অবসরের পরের’ সিদ্ধান্ত নিয়ে, ফলে ধরে নেয়া যায় সাকিবও ‘ভবিষ্যত’ বলতে ক্রিকেট থেকে অবসরের পরের সময়কেই বুঝিয়েছেন। আবার এই সাক্ষাৎকারের দুই সপ্তাহ পরে সাকিবের সাথে নিজের আলাপের কথা জানিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, “সাকিব আল হাসানের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আগে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন না।” জনাব কাদেরের এই বক্তব্য থেকেও এটাই ধারণা পাওয়া যায় যে, (রাজনীতিতে আসার সম্ভাবনার বিষয়ে) ‘ভবিষ্যত’ বলতে ক্রিকেট থেকে অবসরে যাওয়ার পরের সময়কেই বুঝিয়ে থাকতে পারেন।


রাজনীতি নিয়ে মাশরাফীর চিন্তা:

ওবায়দুল কাদেরের গত মে মাসের বক্তব্য থেকেও জানা যাচ্ছে, বিশ্বকাপের আগে রাজনীতি নিয়ে ভাবনা ছিল না মাশরাফীর। এ বিষয়ে মাশরাফীর নিজের মুখের কোনো বক্তব্য কোনো প্রকাশিত সূত্রে পাওয়া যায় না। তবে গত ২৯ মে ঢাকাটাইমস২৪ এক প্রতিবেদনে রাজনীতি বিষয়ে মাশরাফীর পরোক্ষ একটি বক্তব্য পাওয়া যায়। প্রতিবেদনটি থেকে কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করছি--

“গত কয়েক বছর ধরেই আওয়ামী লীগের হয়ে মাশরাফির আগামী নির্বাচনে অংশ নেয়ার গুঞ্জন আছে। নিজ এলাকা নড়াইলের একটি আসন থেকে তিনি ভোটে দাঁড়াতে পারেন বলে প্রচার ছিল। এই গুঞ্জনের মধ্যে মঙ্গলবার পরিকল্পনামন্ত্রী জানিয়ে দেন মাশরাফি ভোটে দাঁড়াচ্ছেন। এই ক্রিকেট তারকাকে ভালো মানুষ উল্লেখ করে তাকে ভোট দেয়ারও আহ্বান জানান তিনি। এমনকি মাশরাফি যদি বিএনপি থেকেও ভোটে দাঁড়ান তাহলেও যেন সবাই তাকে ভোট দেন, সেই অনুরোধও করেন মন্ত্রী।

বিষয়টি নিয়ে মাশরফি কী ভাবছেন, তা জানতে যোগাযোগ করা হয় তার সঙ্গে। তবে তিনি কথা বলতে নারাজ। টাইগার ক্রিকেট তারকা ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘এ বিষয়ে এখন কিছু জিজ্ঞেস করবেন না, এখন এ নিয়ে কথা বলতে চাই না।”

খেলা চালিয়ে যাওয়া অবস্থায় নির্বাচনে মাশরাফীর অংশ নেয়ার সম্ভাবনার বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী (এবং বিসিবির সাবেক সভাপতি) মুস্তফা কামালের একটি বক্তব্য ২৯ মে সময় টিভির এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়।

সময় টিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, “মাশরাফি এবং সাকিবের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ নেই বলেও এসময় মত দেন মুস্তফা কামাল। তিনি বলেন, ‘সাকিব, মাশরাফি দুজনই খেলার মাঠে আছে। মাশরাফি তো নিজেই বলেছে সে ২০১৯ বিশ্বকাপ পর্যন্ত খেলতে চায়। যদি তাঁরা ক্রিকেট খেলে তাহলে নির্বাচন কীভাবে করবে?”

মাত্র এক মাস আগে গত ৮ অক্টোবর ঢাকা ট্রিবিউনের (বাংলা ভার্সন) একটি প্রতিবেদনে নির্বাচন ও রাজনীতি নিয়ে মাশরাফী ও তার পরিবারের চিন্তাভাবনা কেমন ছিল তা ফুটে ওঠেছে। “জাতীয় নির্বাচন: 'মাশরাফি' জুজুতে ভুগছে নড়াইল আওয়ামীলীগ”

ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিটি প্রতিবেদনের শিরোনামের পরেই ‘হাইলাইটস’ হিসেবে একটি বাক্য থাকে। এই প্রতিবেদনের ‘হাইলাইট’ করা বাক্যটি হলো-- “জনপ্রিয় এই ক্রিকেটারের ঘনিষ্ঠ এক সূত্র থেকে জানা যায়, এ মুহূর্তে রাজনীতিতে আসা বা নির্বাচন করতে তিনি মোটেও ইচ্ছুক নন”

প্রতিবেদনের ২য় থেকে ৪র্থ প্যারাগুলো হুবহু তুলে ধরছি--

“মাশরাফি কি এবার নড়াইলের এমপি প্রার্থী হচ্ছেন? প্রধানমন্ত্রী তার জন্য দোয়া চাইলেন কেন? এমন প্রশ্ন নিয়ে নড়াইলের হাটে মাঠে চলছে নানান জল্পনা-কল্পনা। নড়াইল-০২ আসনে মাশরাফি কী সত্যিই প্রার্থী হচ্ছেন এটি নিয়ে ভাবা শুরু করেছেন স্বয়ং আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রার্থীরাও।

গত ৪ অক্টোবর দেশব্যাপী ৪র্থ উন্নয়ন মেলার উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লোহাগড়া উপজেলার সাথে ভিডিও কনফারেন্স করেন। সেখানে তিনি মাশরাফিকে নড়াইলের বড় সম্পদ উল্লেখ করে তার সুস্থ্যতার জন্য দোয়া চেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর নড়াইলের সর্বত্র গুঞ্জন আরো বেগবান হয়েছে।

মাশরাফির সাথে রাজনীতি বিষয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন করা হলে তিনি কখনোই রাজনীতিতে আসার ব্যাপারে আগ্রহ না দেখিয়ে বরাবরের মতো বলেন, “আগে ২০১৯ সালের বিশ্বকাপ খেলতে চাই, তারপর রাজনীতি”। এছাড়া জনপ্রিয় এই ক্রিকেটারের ঘনিষ্ঠ আরো একটি সূত্র থেকে জানা যায়, এ মুহূর্তে রাজনীতিতে আসা বা নির্বাচন করতে তিনি মোটেও ইচ্ছুক নন।”

মাশরাফীর খুবই ঘনিষ্টজন হিসেবে পরিচিত এবং তার প্রতিষ্ঠিত নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এড. কাজী বশিরুল হক ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “মাশরাফি তো কখনোই নির্বাচনে আসার ব্যাপারে কোন আগ্রহ দেখায়নি, সে ইতিপূর্বে যেটা বলেছে সেটা হলো প্রধানমন্ত্রী যদি নির্বাচনের মাঠে নামতে বলেন তাহলে তাকে নামতে হতে পারে, মাশরাফি নির্বাচিত হলে বিশ্বকাপে আমাদের একজন এমপি খেলবে, এটাতো ভালই হবে।”

প্রতিবেদনে আরও একটি প্যারা হুবহু তুলে ধরছি- “নির্বাচনে মাশরাফির প্রার্থী হওয়া প্রসঙ্গে তার বাবা গোলাম মোর্তজা শ্বপন বলেন, “মাশরাফি কিংবা আমরা কখনোই নির্বাচন নিয়ে ভাবিনি। আমরা কোথাও আগ্রহ প্রকাশ করিনি। তবে প্রধানমন্ত্রী যদি চায়, তার চাওয়া ফেরত দেয়াতো সম্ভব নয়, জানিনা মাশরাফি কি করবে।”

মাশরাফীর বাবার কথার সাথে ঢাকাটাইমস২৪ এর প্রতিবেদনের (পূবোল্লেখিত) একটি তথ্য মিলে যায়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, আগামী নির্বাচনে মাশরাফিকে মনোনয়ন দেয়ার সম্ভাবনার বিষয়ে জানেন তারা। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগ্রহী। তবে সাকিবের বিষয়টি জানা নেই তাদের।”

 

Related Post