থিংকট্যাংক সংস্থার প্রতিনিধিদলকে ‌‘ইউরোপীয় পার্লামেন্টারি প্রতিনিধিদল’ বলে প্রচার

27 November, 2018 09:11 AM গণমাধ্যম

ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদক:

গত রোববারের একটি সংবাদ সম্মেলনের খবর ওই দিন এবং গতকাল সোমবার বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় সব সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে। প্রায় সবাই রাষ্ট্রীং বার্তা সংস্থা বাসসের বরাতে খবরটি প্রচার করেছে।

“বাংলাদেশ সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে সক্ষম : ইইউ” শিরোনামে বাসসের এ সংক্রান্ত খবরে যা বলা হয়েছে তার প্রথমাংশ এখানে হুবহু তুলে ধরা হলো--

“ঢাকা, ২৬ নভেম্বর, ২০১৮ (বাসস) : সফররত ইউরোপীয় পার্লামেন্টারি প্রতিনিধিদল বলেছে, বাংলাদেশ সরকার আগামী সাধারণ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে আয়োজনে সক্ষম।
নগরীর একটি হোটেলে রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের রক্ষণশীল সদস্য রুপার্ট ম্যাথুস বলেন, বাংলাদেশের রাজননৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে কথা বলে যতটুকু জেনেছি তাতে আমি আস্থাশীল, এই দেশের আগামী সাধারণ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে।
তিনি বলেন, আসন্ন এই নির্বাচনে ইইউ পার্লামেন্ট কোন পর্যবেক্ষক পাঠাবে না কারণ, ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট বিশ্বাস করে বাংলাদেশ নিজের মতো করেই নির্বাচনী পরিস্থিতি মোকাবেলায় ভালোভাবেই প্রস্তুত।
বাজেট বরাদ্দ না থাকায় ইইউ পার্লামেন্ট পর্যবেক্ষক পাঠাচ্ছে না এই ধারণা নাকচ করে ম্যাথুস বলেন, ইইউ পার্লামেন্ট পর্যবেক্ষক পাঠাতে চাইলে এ বিষয়ে তারা বাজেট বরাদ্দ দিত।
তিনি বলেন, ইইউ পার্লামেন্ট মনে করে বাংলাদেশ নিজস্ব আইনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে সক্ষম। তাই আমরা পর্যবেক্ষক পাঠানোর প্রয়োজন মনে করছি না।
বিশ্বব্যাপী নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন ইইউ পার্লামেন্ট ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তাদের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের মতামত অনুযায়ী বাংলাদেশ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে।
ম্যাথুস বলেন, তার দল সরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ ও সাধারণ জনগণসহ বাংলাদেশের অনেক লোকের সাথে আলাপ আলোচনা করেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।
তিনি আরো বলেন, নির্বাচন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সামাজিক, নারীর ক্ষমতায়ন ও সংখ্যালঘুসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যে আমরা এখানে এসেছি।
পর্তুগীজ পার্লামেন্টের সদস্য জোয়াও পেদ্রো গুইমারেস বলেন, তার দেশ ও বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক দেশ। কিন্তু বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের কিছু ভুল ধারণা রয়েছে।
সফরটি বাংলাদেশ সম্পর্কে এই ভুল ভেঙে দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা দেখেছি এ দেশ সত্যিই চমৎকার।”

দেখুন স্ক্রিনশট--


প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, নিউ এইজ, ঢাকা ট্রিবিউন, কালের কণ্ঠ ইত্যাদিসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে খবরটি যেভাবে এসেছে তা নিচের কয়েকটি স্ক্রিনশটে দেখুন--


(লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, আলোচ্য প্রতিনিধিদল প্রকাশ্যে একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করলেও শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধম্যগুলো তাদের প্রতিবেদকদের বরাতে খবরটি প্রকাশ না করে বাসসের বরাতে প্রকাশ করেছে।)

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস এই প্রতিনিধিদলকে 'ইউরোপীয় পার্লামেন্টারি প্রতিনিধিদল' হিসেবে উল্লেখ করলেও ইউরোপীয় একটি থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট ভিন্ন কথা বলছে। একই সাথে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের 'পার্লামেন্টারি ডেলিগেশন' বা 'পার্লামেন্টারি প্রতিনিধিদল' যেভাবে গঠন করা হয় তার সাথে এই প্রতিনিধিদলের ধরণ মিলছে না।

South Asia Democratic Forum (SADF) হচ্ছে ব্রাসেলস ভিত্তিক একটি থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠান, যেটি ইউরোপীয় ইইউনিয়নের সাথে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো ও এখানকার বিভিন্ন গণতান্ত্রিক গোষ্ঠি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কোন্নয়নে কাজ করে। আলোচ্য প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফর সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন তাদের ওয়েবসাইটে গত রোববার প্রকাশ করা হয়।

Future generations should not suffer as our’s did’: PM Sheikh Hasina dreams of a prosporous Bangladesh শিরোনামের প্রতিবেদনে আলোচ্য প্রতিনিধিদলের সাথে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের একটি ছবিও প্রকাশ করা হয়েছে।

পড়ুন সেই প্রতিবেদন, এবং দেখুন স্ক্রিনশট--


প্রতিবেদনটির প্রথম প্যারাটি এখানে হুবহু তুলে দেয়া হল--

"Increasing political and economic ties between the European Union and Bangladesh has also led to a growing interest among European policy makers in this South Asian nation. Little is known about Bangladesh in Europe and to bridge this gap, the Brussels-based South Asia Democratic Forum (SADF) organised the visit of a high level European delegation comprising of Parliamentarians and officials visited Bangladesh from November 23-25. The delegation was headed by Rupert Oliver Matthews, MEP of the European Conservatives and Reformists Group, accompanied by his assistant Marc-Andre Desmarais; Fulvio Marticiello, MEP of the Group of the European People’s Party; Alberto Cirio, MEP of the Group of the European People’s Party; and the Members of the Portuguese Parliament including Sandra Pereira of the Socialist Democratic Party; Joana de Lima, of the Socialist Party; and Joao Pereira of the People’s Party. They were joined by Madi Sharma, Member of the European Economic and Social Committee; and Susan Guarda and Laura da Silva, representing SADF."

মূল লাইনটি আবারও কৌট করছি--

"the Brussels-based South Asia Democratic Forum (SADF) organised the visit of a high level European delegation comprising of Parliamentarians and officials visited Bangladesh from November 23-25."

অর্থাৎ, ইউরোপিয়ান থিংকট্যাংক সংস্থা SADF এর আয়োজনে এই প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশে এসেছে, যাতে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের একাধিক সদস্যের সাথে SADF এর কর্মকর্তা এবং অন্যরা ছিলেন (উপরের প্যারায় দেয়া ব্যক্তিদের নাম ও পদবীগুলো দেখুন)। বলা-ই বাহুল্য যে, বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতের 'ইউরোপীয় পার্লামেন্টারি প্রতিনিধিদল' হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া ব্যক্তিবর্গের নামই SADF এর ওয়েবসাইটে দেখা যাচ্ছে।

SADF-ও তাদের রিপোর্টে প্রতিনিধিদলটিকে ‘(high level) European delegation’ বলছে, বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত (ভুল) তথ্যের মতো করে ‘'ইউরোপীয় পার্লামেন্টারি প্রতিনিধিদল' বা ’European Parliamentary delegation’ বলেনি।

কোনো প্রাইভেট সংস্থার আয়োজনে কোথাও ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের সদস্যরা ভ্রমণ করলে তা 'ইউরোপীয় পার্লামেন্টারি প্রতিনিধিদল' হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের ম্যান্ডেট ছাড়া কোনো পার্লামেন্টারি ডেলিগেশন (প্রতিনিধদল) গঠিত হতে পারে না। এবং একই কারণে তাদের কোনো বক্তব্যকে 'ইউরোপীয় ইউনিয়নের বক্তব্য' হিসেবে গ্রহণ করার কোনো সুযোগ নেই।

ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের তিন ধরনের পার্লামেন্টারি ডেলিগেশনের গঠন সম্পর্কে জানতে পার্লামেন্টের ওয়েবসাইটের এই লিংকে ভিজিট করুন।

SADF সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটের এই লিংকে:

নোট: এ বিষয়ে ইইউ’র অবস্থান জানতে bdfactcheck এর পক্ষ থেকে সংস্থাটির ৫ জন মুখপাত্রকে ইমেইল করা হয়। দু’দিন পর ফিরতি ইমেইলে একটি বিবৃতি পাঠানো হয় আমাদের কাছে। একই সাথে বিবৃতিটি ইইউর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করা হয়। বিবৃতিটি পড়ুন এই লিংকে। এতে বলা হয়েছে, ইইউ’র পক্ষ থেকে বাংলাদেশে নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে পর্যবেক্ষণ বা মন্তব্য কোনো প্রতিনিধিদলকে পাঠানো হয়নি। যদি ইইউ পার্লামেন্টের কোনো সদস্য এ  বিষয়ে কোনো মন্তব্য করে থাকেন তাহলে তা তার ব্যক্তিগত মত; ইইউ বা ইইউ পার্লামেন্টের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

Related Post