বিশ্বের অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীদের তালিকায় কি তারেক রহমানের নাম এসেছে?

02 December, 2018 16:12 PM গণমাধ্যম

ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদক:

গত কয়েকদিন ধরে কয়েকটি অখ্যাত অনলাইন পত্রিকায় "অস্ত্র ব্যবসায়ী তারেক জিয়া" "বিশ্বে অস্ত্রের কালোবাজার ব্যবসায়ীর তালিকায় তারেক জিয়া!" ইত্যাদি শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ২ ডিসেম্বর ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক শোভন তার ফেসবুক পেইজেও এরকম একটি প্রতিবেদন শেয়ার করেছেন, যা চার হাজারের বেশি মানুষ 'রিয়েকশন' দিয়েছেন এবং পাঁচশতাধিক মানুষ শেয়ার করেছেন।

স্ক্রিনশট--

প্রতিবেদনটি কিভাবে অনলাইন পোর্টাল ও সামাজিক মাধ্যমে এসেছে তা নিচের কয়েকটি স্ক্রিনশটে দেখে নেয়া যাক--


bdfactcheck.com এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত কয়েকদিনে নতুন করে বিভিন্ন পোর্টালে প্রকাশিত হওয়ার পর এটি ভাইরাল হলেও এ সংক্রান্ত মূল প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর। বাংলা ইনসাইডার নামক একটি অনলাইন পোর্টাল তাদের ইংরেজি ভার্সনে ওই সময় প্রতিবেদনটির শিরোনাম করেছিল, "Arms dealing allegation against Tarique".

নিচের স্ক্রিনশটে তখনকার প্রতিবেদনটি দেখুন--

আবার এই বাংলা ইনসাইডর গত ২৯ নভেম্বর (২০১৮) নতুন করে একই প্রতিবেদন তাদের বাংলা ভার্সনে প্রকাশ করে। এক বছর পর নতুন করে প্রকাশিত প্রতিবেদনটির শিরোনাম "অস্ত্র ব্যবসায়ী তারেক জিয়া"। এরপরই অন্য কিছু পোর্টাল প্রতিবেদনটি পুনরুৎপাদন করে।

নিচের স্ক্রিনশটে দেখুন নতুন প্রতিবেদনটি--

পাঠকের বুঝার সুবিধার্থে দুটি প্রতিবেদন থেকে কয়েকটি প্যারা এখানে তুলে ধরা হলো--

২০১৭ সালের ইংরেজি প্রতিবেদনের প্রথম তিন প্যারা--

"Lately, the name Tarique Rahman has been frequently affiliated with the words like ‘money laundering’ and ‘graft case’ in the national newspapers. Soon, this name will have another affiliation with ‘arms dealer’.

Tarique Rahman, the Senior Vice Chairman of Bangladesh Nationalist Party (BNP), is currently staying in London with his wife and daughters and with the wife and daughters of his departed younger brother Arafat Rahman alias Koko. He has been living in the United Kingdom since 2008.

Tarique’s name has appeared in the list of black market arms dealers. According to the report of a US-based research institute named Peace and Conflict, his name is in the 17th position in the illegal drug dealers’ list. The report is titled as ‘Arms Dealers around the World’ in November 2015. However, he topped the most wanted list of Bangladesh, according to this report."

২০১৮ সালের বাংলা প্রতিবেদনের প্রথম প্যারাটি--

"বিশ্বে কালোবাজারে অস্ত্র বিক্রেতাদের নামের তালিকায় তারেক জিয়ার নাম পাওয়া গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট’ এর প্রতিবেদনে ‘অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীদের তালিকায় তাঁর নাম আছে ১৭ নম্বরে। ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে ‘আর্মস ডিলারস অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এই প্রতিবেদনে তারেক জিয়াকে বাংলাদেশে মোস্ট ওয়ান্টেড হিসেবে চিহ্নিত বলে জানানো হয়।"

এখানে লক্ষ্যণীয় একটি বিষয় হল, ২০১৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা রিপোর্ট নিয়ে ২০১৭ সালে সংবাদ প্রতিবেদন (মতামত কলাম নয়) প্রকাশ করা সাংবাদিকতার মৌলিক নিয়মের পরিপন্থী। 'তাৎক্ষণিকতা' কোনো ঘটনার সংবাদ হয়ে ওঠার অন্যতম প্রধান উপাদান। এরপরও ২০১৭ সালে একবার প্রকাশিত 'খবর'কে ২০১৮ সালে আবারও নতুন করে উৎপাদন করা সাংবাদিকতার নীতিমালার আরও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

খবরটি কি সত্য?

বাংলা ইনসাইডারের দাবি অনুযায়ী, বিশ্বের অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীদের তালিকায় তারেক রহমানের নাম এসেছে কিনা তা যাচাই করতে গিয়ে খবরটির সত্যতা পাওয়া যায়নি। ইনসাইডারের ইংরেজি প্রতিবেদন থেকে আমরা বিভিন্ন কীওয়ার্ড নিয়ে গুগল সার্চ করে আলোচ্য গবেষণা প্রতিবেদন, এমনকি সংস্থাটির নামও পাইনি।

ইনসাইডার বলছে ২০১৫ সালের গবেষণা রিপোর্টটির শিরোনাম ছিলো- ‘Arms Dealers around the World’.

রিপোর্ট প্রকাশকারী সংস্থাটির নাম- Peace and Conflict.

সংস্থাটির পরিচয়- US-based research institute.

এসব কীওয়ার্ডের সাথে তারেক রহমানের নাম (Tarique Rahman) দিয়ে গুগল সার্চের পর পাওয়া ফলাফলগুলো নিচে স্ক্রিনশট আকারে তুলে ধরা হলো--

(কোনো শব্দ বা শব্দগুচ্ছের আগে পরে উদ্ধরণ কমা যুক্ত করে গুগল সার্চ করলে অবিকল ওই শব্দ বা শব্দগুচ্ছ উদ্ধৃত করে যত প্রতিবেদন অনলাইনে আছে তা একসাথে চলে আসে। বাংলা ইনসাইডারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে গবেষণা রিপোর্টটির নাম ছিল 'Arms Dealers around the World'. উদ্ধরণ কমা সহযোগে এই শব্দগুলো সার্চ করলে বাংলা ইনসাইডারের প্রতিবেদনটি ছাড়া অন্য কোনো রেজাল্ট আসে না (উপরের ছবি দেখুন)।)

 

 

উপরের কোনো স্ক্রিনশটেই www.banglainsider.com এর ইংরেজি প্রতিবেদনের বাইরে অন্য কোনো সূত্র থেকে ‘Arms Dealers around the World’ বা ‘Arms Dealers around the World 2015’ সংক্রান্ত কোনো ফলাফল দেখা যাচ্ছে না। এছাড়া Peace and Conflict নামে যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক কোনো গবেষণা সংস্থার কোনো ওয়েবসাইটের সন্ধানও পাওয়া যায়নি। অথবা অন্য কোনো সংবাদমাধ্যমে এরকম কোনো প্রতিষ্ঠানের বরাতে কোনো খবর পাওয়া যায়নি। বৈশ্বিক কোনো বিষয়ে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক কোনো গবেষণা সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক ওয়েবসাইট না থাকা এবং তাদের বরাতে কোনো খবর স্বীকৃত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে না থাকা- দুটিই অস্বাভাবিক।

অবশ্য উপরিউক্ত কীওয়ার্ডগুলোর বাইরেও বিভিন্ন কীওয়ার্ড দিয়ে এবং সঠিক সার্চ রেজাল্ট আসার ক্ষেত্রে সহায়ক বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে সার্চ চালানোর পরও উপরের চেয়ে ভিন্ন কোনো রেজাল্ট আসেনি। এক কথায় বলা যায়, ওইরকম কোনো প্রতিবেদনের আদৌ কোনো অস্তিত্ব নেই।

অর্থাৎ, বাংলাইনসাইডারে প্রথম প্রকাশিত এবং অন্যান্য কিছু বাংলা অনলাইন পোর্টালে পুনরুৎপাদিত "বিশ্বের অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীদের তালিকায় তারেক রহমানের নাম আসা"র খবরটি ভুয়া।

Related Post