ভুয়া সংবাদ ভাইরাল হয় যেভাবে

06 December, 2018 04:12 AM মিডিয়া স্কুল

ফ্যাক্টচেক ডেস্ক:

ভুয়া সংবাদ আমাদের চারপাশ ঘিরে আছে। দুনিয়াব্যাপী ভুয়া সংবাদের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে ২০১৬ সালের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর থেকে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর বিরুদ্ধে যায় এমন প্রায় সব সংবাদকেই ভুয়া সংবাদ বলে আখ্যা দিয়ে আসছেন।

সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে ভুয়া সংবাদ বেশি ছড়াচ্ছে। এর কারণ জানতে আইরিশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট সম্প্রতি প্রযুক্তিবিদ, মনোস্তাত্ত্বিক, নৃবিজ্ঞানী ও অনলাইন সাংবাদিকতা বিশেষজ্ঞদের দ্বারস্থ হয়। তাতে প্রধানত সাতটি কারণ উঠে আসে।

১. নিজস্ব মতের প্রাধান্য।

সামাজিক মাধ্যমে কোনোকিছু শেয়ার করার ক্ষেত্রে সবসময় আবেগ কাজ করে এবং ভুয়া সংবাদ ছড়ানোর ক্ষেত্রেও একইভাবে আবেগ ভূমিকা পালন করে। যুক্তরাজ্যের নটিংহ্যাম ট্রেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের জ্যৈষ্ঠ প্রভাষক ড. জেনস বাইন্ডার এমনটি মনে করেন।

তাঁর মতে, শুধু সংবাদের ভেতরের তথ্যের জন্যই আমরা সংবাদ দেখি বা পড়ি না, দুনিয়া কীভাবে চলছে তারও একটা ধারণা নিতে চাই আমরা। আর এসবের মধ্য দিয়ে একধরণের নিশ্চয়তা পেতে চাই আমরা। যত বেশি লোক আমার মতের পক্ষের বিষয়াদি শেয়ার করে, আমরা নিজেদের তত সঠিক ভাবতে শুরু করি।

ড. বাইন্ডার বলেন, একই বিষয় নিয়ে সঠিক সংবাদটির তুলনায় আবেগতাড়িত ও নাটকীয়তাসম্পন্ন ভুয়া সংবাদটি বেশি মনযোগ আকর্ষণ করে। তিনি বলেন, ‘ভুয়া সংবাদ মূলত বিরোধীপক্ষকে আক্রমণ করে করা হয় অথবা আমরা যাদেরকে আক্রমণের শিকার দেখতে চাই তেমন সংবাদই আমাদের লক্ষ্য করে ছড়ানো হয়।’

২. তথ্য একধরণের সামাজিক মুদ্রায় হয়েছে।

মানুষের সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তির সম্পর্ক নিয়ে কাজ করা নৃবিজ্ঞানী নিক পলিঙ্গার মনে করেন, বর্তমান প্রযুক্তির দুনিয়ায় যেখানে তথ্য একধরণের সামাজিক মুদ্রায় রূপ নিয়েছে, সেখানে নিরেট সত্য তেমন গুরুত্ব নাও পেতে পারে।

তাঁর মতে, ব্যক্তি হিসেবে যেমন আমরা নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাধান্য দেই বা এর পক্ষে বেশি সমর্থন আশা করি, তেমনি তথ্যের উৎসের ওপর আমাদের কম আস্থা থাকলে তথ্যটি সত্য নাকি মিথ্যা তা অনেকটা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে।

তথ্যটি আমাদের পরিচিত ও নিকটজনদের পছন্দসই বা তাদের সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় সম্পর্কিত হলে সেটিকে সামাজিক মাধ্যমে মুদ্রা আকারে ব্যবহার করি। এসব শেয়ার করার মধ্য দিয়ে পরিচিতদের মধ্যে একটা বোঝাপড়া জোরদার হয়, সম্পর্ক মজবুত হয়। সামাজিক মাধ্যমে যে যতো চাঞ্চল্যকর ঘটনা শেয়ার করে তাঁর গুরুত্ব ততো বাড়বে, এমনও ভাবা হয়।

৩. মানুষ গুজব ভালবাসে।

ড. বাইন্ডারের মতে, খুব কম লোকই সামাজিক মাধ্যমে কিছু শেয়ার করতে গেলে ভেবেচিন্তে করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লোকজন গুজবে কান দিতে ভালবাসে। তবে সেটা পছন্দ হওয়া চাই।  গুজব যে শেয়ার দিবে তার পছন্দ হলে সেটা ভাল গুজব!

তিনি বলেন, ‘জনমতের ওপর প্রভাব বিস্তার করার উদ্দেশ্য নিয়ে অল্প কিছু লোক ভুয়া সংবাদ ছড়ানোর কাজটি করে থাকে। অধিকাংশ মানুষ ব্যক্তিগত আগ্রহের জায়গা থেকে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে, রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য নয়। সিংহভাগ লোক ভুয়া সংবাদটি এমনি এমনিতেই শেয়ার করে বসে, যেন তারা গুজবে কান দিতে ভালবাসে।’

‘মানুষের সামাজিক চর্চায়ও এটা রয়েছে, হোক সেটা অফলাইনে কিংবা অনলাইনে। কোনকিছু শেয়ার করাটা খুবই সোজা। ইন্টারনেট প্রযুক্তিগুলো শেয়ারবান্ধব করেই বানানো হয়।’

‘অনেকক্ষেত্রে দেখা যায়, মানুষ তথ্য শেয়ার করার আগে যাচাই-বাছাই করে না। যাচাইয়ের কাজটি যেহেতু সময়সাপেক্ষ ও ঝামেলাপূর্ণ। বিষয়টা তার সঙ্গে অনলাইনে যুক্ত পরিচিতদের আগ্রহের বিষয় কিনা দেখেই শেয়ার করে থাকে।’

৪. গুজব মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ে।

মহামারী রোগের ভাইরাস যেভাবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে চাঞ্চল্যকর সংবাদ ঠিক সেরকমভাবে ছড়ায়, যুক্তরাজ্যের অ্যাবার্ডিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. ফ্রান্সিসকো পেরেজ-রেশে এমনটি বলেন।

গত বছর এক গবেষণায় ভাইরাল কন্টেন্ট নিয়ে একটি গাণিতিক মডেল দাঁড় করানো হয়, ওই গবেষণায় নেতৃত্ব দেন ড. ফ্রান্সিসকো। তিনি বলেন, অনেককিছু মানুষ রাতারাতি বিশ্বাস করে ফেলে, বিশেষ করে আজকালকার সামাজিক মাধ্যমের যুগে এমন বেশি দেখা যাচ্ছে।

‘সামাজিক মাধ্যমে এও দেখা যায়, ঘটনার একদম শুরুতে একটা আন্দোলনে কেউ শরীক হতে চায় না, অল্পসংখ্যক লোক থাকলে শাস্তির ভয় কাজ করে। তবে কোনোকিছুর সমর্থনে লোকজন বাড়তে থাকলে সেটা সত্যিই ঘটেছে নাকি গালগল্প তা পরখ করার সময় মেলে না। ড. ফ্রান্সিসকো এমন পরিস্থিতিকে ‘ট্রান্সমিশন’ বলে অভিহিত করেছেন। যখন তথ্য শেয়ার করতে কোনো ‘বাধাবিপত্তি’ কাজ করে না তখন সেটা মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ে।

চাঞ্চল্যকর সত্য সংবাদ যেভাবে ভাইরাল হয়, ঠিক তেমনিভাবে ভুয়া সংবাদও সামাজিক মাধ্যমে রইরই করে ছড়িয়ে পড়ে বলে মনে করেন ড. ফ্রান্সিসকো পেরেজ-রেশে। যদিও ‘ভুয়া সংবাদ’ ড. ফ্রান্সিসকোর গবেষণার মূল বিষয় নয়।

৫. অ্যালগরিদমের ব্যবহার।

ল্যাঙ্গুয়েজ অব সোশ্যাল মিডিয়া বইয়ের সহ-লেখক ড. ফিলিপ সার্জেন্ট  কোন সংবাদ ভাইরাল হওয়ার পিছনে অ্যালগরিদমকে দায়ী করেছেন। তাঁর মতে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো মানুষের পছন্দসই বিষয়গুলোকে সামনে আনার জন্য অ্যালগরিদম ব্যবহার করে। মানুষ যেগুলো অপছন্দ করে সেগুলোকে ফিল্টার করে বাদ দেয়া হয়।

ড. সার্জেন্ট বলেন, “এর ফলে মানুষের ভিন্ন ভিন্ন আইডিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকছে না, বরং যেসবের সঙ্গে মানুষ একমত সেগুলোই নিউজফিডে সামনে চলে আসছে। একে ‘ফিল্টার বাবল’ নামে অভিহিত করেন ড. ফিলিপ সার্জেন্ট।”

তিনি বলেন, ‘ফেসবুকের মতো সাইটগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ মানুষ সংবাদ পায় আর ফেসবুকের যেহেতু কোনো দ্বাররক্ষক নেই তাই এখানে যে কেউ সংবাদ প্রকাশ করতে পারে। ভুয়া সংবাদ অনেক আকর্ষণীয় হয়। ফলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।’

৬. অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য।

প্রতিটি আর্টিকেল ক্লিকেই পেজভিউ বাবদ টাকা পান এর প্রকাশকরা। নৃবিজ্ঞানী নিক পলিঙ্গার ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, ”আজকাল অনেকে সংবাদপত্রের চেয়ে সামাজিক মাধ্যমের দেওয়া সংবাদে আস্থা রাখতে শুরু করেছে। এই সাইটগুলো এমনভাবে কাজ করে যাতে মতাদর্শিক প্রেরণা নিয়ে বা পয়সা কামানোর উদ্দেশ্যে যারা ভুয়া সংবাদ ছড়ায় তাদের জন্য মাঠ ফাঁকাই থাকে। এমন ফাঁকা মাঠ তারা এর আগে কখনও পায়নি।

এটা যদিও বিশ্বস্ত সাইটগুলোর জন্য প্রযোজ্য নয়,তবে ভুয়া সংবাদ ছড়ানো সাইটগুলোর কাছে তথ্যের সত্যতা যাচাই বা নির্ভুল হওয়ার চাইতে টাকা কামানোটাই মুখ্য।

৭. রাজনৈতিক পরিবেশ ভুয়া সংবাদের বাজার বাড়াচ্ছে।

ভুয়া সংবাদ ছড়ানোর পেছনে অনেকাংশে রাজনীতিবিদদের দায় আছে বলে মনে করেন যুক্তরাজ্যের ল্যাঙ্কশায়ার স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড এন্টারপ্রাইজ এর মুখ্য প্রভাষক ড. পল এলমার।

ভুয়া সংবাদের কারণে রাজনীতিবিদরা অনেক সময় ক্ষোভ প্রকাশ করেন, কিন্ত এক অর্থে তারাই এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেন যাতে মানুষ দ্রুত ভুয়া সংবাদ ছড়ানোর সুযোগ পায়।

নীতি নির্ধারণী বা সরকার পরিচালনার পর্যায় থেকে কৌতুককর কর্মকাণ্ডের জন্ম দেওয়া হয়। মানুষ তখন আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে খেলা করার সুযোগ পায়।

ভুয়া সংবাদ গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। কিন্তু রাজনীতিবিদরা এরকম একটি পরিবেশ তৈরিতে ব্যাপক অবদান রেখে চলেছেন, যেখানে ভুয়া সংবাদ ছড়ানোর খেলায় মত্ত খেলোয়াড়রাও গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যায়। একারণে অনেক সময় এমন সংবাদগুলো ভাইরাল হয়।

অনুবাদ: ইয়াসির আরাফাত

Related Post