ভুয়া জরিপ: মহাজোট ১৪, ঐক্যফ্রন্ট ৮৬ শতাংশ

15 December, 2018 07:12 AM ইলেকশন চেক ২০১৮

ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদক:

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন জরিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে। এইরকমই একটি জরিপে দেখা যাচ্ছে, শেখ হাসিনা ও তার দলকে দেশের ১৪ শতাংশ মানুষ সমর্থন করছে। অন্যদিকে বিরোধী দলীয় জোটকে সমর্থন করছে দেশের ৮৬ শতাংশ মানুষ।  বিডি ফ্যাক্টচেক-এর অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, এই টেলিভিশন সংবাদ ও জরিপটি অসত্য।

Australia24News এবং বিডিচোখ-BDchokh নামক দু্ইটি ফেইসবুক পেইজ থেকে এই ভিডিওটি শেয়ার করা হয়। ভিডিওটি ১২ হাজারের উপরে মানুষ দেখেছে। সহস্রাধিক মানুষ এতে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এবং সর্বশেষ একহাজার ৪৩ জন ভিডিওটি শেয়ার করেছে।

ভিডিওটিতে জরিপের পাশাপাশি দাবি করা হচ্ছে, “বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চায়। কিন্তু সরকার নির্বাচনকে নিজের আয়ত্তে রেখেছে। বিরোধী দল দাবি করেছে, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসনের অধিকাংশ লোকই অনিরপেক্ষ।”

এবার দেখা যাক সংবাদ এবং জরিপটি কেন অসত্য-

অস্ট্রেলিয়া টোয়েন্টিফোর নিউজ

অস্ট্রেলিয়া টোয়েন্টিফোর নিউজ নামক একটি গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে টেলিভিশন সংবাদটি ভাইরাল হয়েছে।  তবে এই নামের কোনো গণমাধ্যম খুঁজে পাওয়া যায়নি। গুগল সার্চ করে অস্ট্রেলিয়ান নিউজ নামক কোনো টেলিভিশন চ্যানেলের অস্তিত্ত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। যদিও এর একটি ফেসবুক পেইজ, টুইটার একাউন্ট এবং ইউটিউব চ্যানেল আছে। তাদের ফেইসবুক পেইজে যে ওয়েবসাইটের ঠিকানা দেয়া আছে সেখানে ক্লিক করলে “কামিং সুন” লেখা দেখা যায়। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে আর কোনো তথ্য নাই। আর ইউটিউব চ্যানেল এই ভিডিওটিসহ মাত্র তিনটি ভিডিও আপলোড করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়াতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে তিনটি টেলিভিশন চ্যানেল চালু রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে, নাইন নেটওয়ার্ক, সেভেন নেটওয়ার্ক এবং নেটওয়ার্ক টেন।

স্ক্রিনশট: গুগল সার্চ করে সংবাদ মাধ্যমটি সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

জরিপ কি নিয়মতান্ত্রিকভাবে করা হয়েছে?

জরিপটি সম্পর্কে বলা হয়েছে, এটি একটি অনলাইনভিত্তিক স্বাধীন জরিপ। জরিপটি পরিচালনা করেছে,  অস্ট্রেলিয়া টোয়েন্টিফোর নিউজ। যার পরিচয় আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। জনমত যাচাইয়ের জন্য জরিপ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি পদ্ধতি। তবে সেখানে কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। এসবের মধ্যে রয়েছে গ্রহণযোগ্য নমুনায়ন ঠিক করা। জরিপের উদ্দেশ্যের সাথে সঙ্গতি রেখেই নমুনা ঠিক করতে হয়। উদারহরণস্বরূপ বলা যায়, কোনো দেশে যদি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর অনুপাত মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও কম হয় তাহলে তা মোট জনগোষ্ঠীকে প্রতিনিধিত্ব করবে না। গ্লোবাল ডিজিটাল রিপোর্ট-২০১৭ এর মতে, বাংলাদেশের মোট ৪৯ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। সুতরাং, অনলাইন জরিপের যে ফলাফল তা ওই ৪৯ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীকেই প্রতিনিধিত্ব করে, বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীকে নয়।

ফেসবুকভিত্তিক জরিপ কতটা মানসম্পন্ন?

ফেসবুক জরিপ নিয়ে বিডি ফ্যাক্টচেক এর সহ প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক কদরুদ্দীন শিশির বলেন, ফেসবুক যে পদ্ধতির জরিপ তাদের সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য করার সুযোগ রেখেছে তার মূল লক্ষ্য, 'এংগেজমেন্ট' বাড়ানো। এ ধরনের জরিপে কোনো আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করা হয় না। কোনো একটি পক্ষ চাইলেই যে কোনো সময় তা প্রভাবিত করতে পারে। যেমন- আলোচ্য জরিপে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পেইজে শেয়ার দিয়ে এই দলের পক্ষে ভোট দেয়ার আহ্বান জানালে ১০ মিনিটের মধ্যেই ফলাফল উল্টে যাবে। মাত্র ২ হাজারের কিছু বেশি লোক এখানে তাদের মতামত জানিয়েছেন। আওয়ামী লীগ সমর্থক আরও দুই হাজার লোক ভোট দিলে পুরো চিত্র উল্টে যাবে।

তিনি বলেন, আবার একইভাবে ঐক্যফ্রন্ট বা বিএনপিপন্থী কোনো এক্টিভিস্ট এটি শেয়ার দিয়ে সমর্থকদের ভোট দেয়ার আহ্বান জানালে নতুন আরেক ধরনের ফলাফল আসবে। ফলে এই পদ্ধতিতে কোনো মানসম্পন্ন জরিপ করার সুযোগ নেই।

অসংখ্য ভুল

ভিডিওতে যে গ্রাফটি দেখা যাচ্ছে, সেখানেই অনেক ভুল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বার গ্রাফের নিচে বারের পরিচয় হিসেবে একটাতে লেখা হয়েছে, “কারেন্ট গভর্নমেন্ট” আর অন্যটিতে লেখা হয়েছে “অপজিশন পার্টি”। কিন্তু উপরে যে পরিচয় দেয়া হয়েছে তা বারের পরিচয়ের সাথে মিলে না। উদারহরণস্বরূপ, নিচে যে লাল রঙের বারটিকে “কারেন্ট গভর্নমেন্ট” বলে চিহ্নিত করা হয়েছে উপরে সেটাকে লেখা হয়েছে, ”শেখ হাসিনা অ্যান্ড হার অ্যালাইস”। এছাড়া বানান ও ব্যাকরণগত ভুল আছেই।  প্রফেশনাল জরিপ পরিচালনাকারীদের গ্রাফে এমন অসঙ্গতি দেখা যায় না।

প্রতিবেদনের ভাষা

বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রতিবেদনে ভাষা ব্যবহারের দিক থেকে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। প্রতিবেদনে বিশেষণবাচক শব্দ সাধারণত ব্যবহার করা হয়না। বিশেষণবোধক শব্দ ব্যবহার করলেও তা প্রমাণসাপেক্ষে করে থাকে। এই প্রতিবেদনে যেসব বিশেষণবাচক শব্দ ব্যবহারকরা হয়েছে তা সাধারণত বস্তুনিষ্ঠ গণমাধ্যম ব্যবহার করে না। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া সম্পর্কে বলা হয়েছে, “সবচেয়ে জনপ্রিয় বিরোধীদলীয় নেত্রী,” আর বাংলাদেশ সরকারকে বলা হয়েছে, “স্বৈরচারী সরকার”।

অতএব, অস্ট্রেলিয়ান নিউজ নামক কোনো সংবাদ মাধ্যমের অস্তিত্ত্ব খোঁজে না পাওয়া, জরিপকারী প্রতিষ্ঠান ও জরিপ পদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য না দেয়া এবং প্রপাগান্ডামুলক ভাষা ব্যবহারের কারণে এই জরিপটি অসত্য ও বিভ্রান্তিমূলক।  

Related Post