ফেসবুক-টুইটার বন্ধ করলো একাধিক ভুয়া একাউন্ট

21 December, 2018 20:12 PM সামাজিক মাধ্যম

ফ্যাক্টচেক ডেস্ক:

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারবিরোধীদের সম্পর্কে ভুল তথ্য ও ক্রমাগত ভুয়া খবর ছড়ানোয় বেশ কয়েকটি ফেসবুক পেজ ও অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ।  গতকাল বৃহস্পতিবার ফেসবুক এমনটি জানিয়েছে।

প্রতিষ্ঠিত নিউজ সাইটের হুবহু নকল করে তৈরি করা নয়টি ফেসবুক পেজ এবং ছয়টি ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট যারা কিনা বিরোধীপক্ষকে লক্ষ্য বানিয়ে প্রোপাগাণ্ডা ছড়ানোর কাজ করতো।  আর এগুলো সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই করে আসছিলেন বলে জানিয়েছেন ফেসবুকের সাইবার নিরাপত্তা প্রধান নাথানিয়েল গ্লেচার। বার্তা সংস্থা এপিকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া থেকে টেলিফোনে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এমনটি জানিয়েছেন গ্লেচার।

‘যৌথভাবে সমন্বয় করে অস্বাভাবিক কার্যক্রম চলছে দেখে’ এগুলোকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা নাগাদ বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে বলে জানায় ফেসবুক।  পরে একই কারণে বাংলাদেশের ১৫টি অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার কথা জানিয়েছে টুইটার কর্তৃপক্ষও।

সাইটগুলো চালু করা থেকে শুরু করে ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িতরা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে জানিয়েছে ফেসবুকের পক্ষ থেকে নিয়োজিত নিরাপত্তা নজরদারি কোম্পানি।  তবে সামাজিক মাধ্যমটির সাইবারনিরাপত্তা প্রধান নাথানিয়েল গ্লেচার জড়িতদের সম্পর্কে এর বেশি কিছু জানাননি।

টুইটার বলেছে, ‘আমাদের প্রাথমিক বিশ্লেষণে মনে হয়েছে, অ্যাকাউন্টগুলোর কয়েকটির সঙ্গে সরকারি অর্থায়নপুষ্টরা জড়িত রয়েছেন।‘ টুইটারের বন্ধ অ্যাকাউন্টগুলো সম্পর্কে কিছু তথ্য দেওয়া হলেও কখন এগুলো বন্ধ করা হয়েছে তা জানানো হয়নি।

ফেসবুক পেজগুলোর একটি বিবিসি বাংলা ও আরেকটি বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমের আদলে হুবহু সাজানো। বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া যেখানে কারাবন্দী রয়েছেন সেখানে দাঙ্গাহাঙ্গামার মতো ভুল তথ্যও ছড়ানো হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সবগুলোকেই ‘সরকারপন্থি এবং বিরোধীদলের বিপক্ষের’ বলে উল্লেখ করে গ্লেচার বলেন, এগুলো দেখতে হুবহু একেকটি স্বাধীন নিউজ পোর্টালের মতো।

তিনি আরো জানান, ফেসবুক গত নভেম্বরে এ নিয়ে তদন্ত শুরু করে। ফেসবুকের সঙ্গে কাজ করা নিরাপত্তা নজরদারি কোম্পানি গ্রাফিকা’র ইঙ্গিতের পর ভেতরে-বাইরে যাচাইয়ের পর গতকাল বৃহস্পতিবার এগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে সিদ্ধান্ত নেয় ফেসবুক।

ওই নয়টি পেজের প্রচারপ্রসার ব্যাপক নয়। একটি পেজের ১১৯০০ ফলোয়ার রয়েছে বলে জানান গ্লেচার। তবে এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এ ঘটনা ঘটলো যখন ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন তৃতীয় বারের মতো ক্ষমতায় আসতে চাইছেন।

‘সত্যি বলতে প্রচারের ব্যাপ্তির দিক বিবেচনায় হয়তো বাংলাদেশে এটি নগন্য, কিন্তু আমাদের কাছে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ বলেন গ্লেচার। তিনি আরো বলেন, ‘ফেসবুক কখনোই চাইবে না যে কেউ এখানে অ্যাকাউন্ট খুলে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়াক।‘

এর আগে ২০১৬ সালের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মিথ্যা রাজনৈতিক গল্প ছড়ানো থেকে শুরু করে মিয়ানমারে বর্নবাদী বক্তব্য প্রচারে সহায়ক ভূমিকা পালনের অভিযোগে কড়া সমালোচনার মুখে পড়ে ফেসবুক।

বৃহস্পতিবারের পদক্ষেপকে ভুয়া পেজ ও অ্যাকাউন্ট বন্ধে ফেসবুকের সক্রিয় ভূমিকার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন গ্লেচার। এ বছরের তৃতীয় অংশে ৭৫৪ মিলিয়ন ভুয়া অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয় ফেসবুক, এদিকে ২০১৮ সালের প্রথম তিন মাস শেষে ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধের পরিমাণ ছিল ৫৮৩ মিলিয়ন।

একটি ভুয়া খবরে বলা হয়, বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়া তার দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বরখাস্ত করেছেন। বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমের আদলে তৈরি করা ভুয়া সাইটটির ওই খবরে বলা হয়, খালেদা জিয়া কারাগার থেকে ভিডিওবার্তায় দলের মহাসচিবের অপসারণের নির্দেশ দিয়েছেন। বিবিসি বাংলা সাইটের কপি সাইটের আরেক খবরে খালেদা জিয়ার দলে গভীর দ্বন্দ্ব-কোন্দলের ফিরিস্তি বর্ণনা করা হয়। ওই খবরে নয়াপল্টনে দলের কার্যালয়ের সামনে সংঘর্ষের সময় পুড়ে যাওয়া একটি গাড়ির ছবি ব্যবহার করা হয়।

বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী এপিকে বলেন, তিনি তার সাইটের কয়েকটি ভুয়া সংস্করণ সম্পর্কে জানেন। এ বিষয়ে তিনি নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীকে জানিয়েছেন এবং এতে ‘কোন কাজ হয়নি’ বলে জানান খালিদী। তিনি বলেন, আমাদের পাঠকরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। আমাদের সাইটের মতো হুবহু কয়েকটি সাইট খোলা হয়েছে। আমরা ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি, দেখতে যেহেতু একই রকম, ফলে মানুষ সেগুলোকেও সঠিক সাইটই মনে করছে।

বিবিসি’র বাংলা বিভাগের সম্পাদক সাবির মুস্তাফা লন্ডন থেকে এপিকে বলেন, এর আগে আরো কয়েকবার ভুয়া সাইট খোলা হয়েছিল, বিবিসি ফেসবুককে বা ডোমেইন পরিচালনাকারী সাইটগুলোকে জানালে সেগুলো বন্ধ করা হয়। বিবিসি বাংলার নামে যতো ভুয়া ফেসবুক পেজ পেয়েছি, ফেসবুককে জানানোর পর তারা সেগুলো বন্ধ করে দেয়।

বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) মুখপাত্র জাকির হোসাইন খান ফোনে এপিকে জানান, জননিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে এমন কিছু যাতে না ঘটে সেজন্য ফেসবুকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগে রাখছেন তারা। তবে অল্প দিনে তাদের নিকট কোনো অভিযোগ জমা পড়েনি বলে জানিয়েছেন তিনি।  

ভুয়া খবর ছড়ানোর কাজে শুধু সরকারপন্থিরাই নয়। নভেম্বরে দক্ষিণ কোরিয়ায় অধ্যয়নরত এক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে ঢাকা থেকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশের দাবি, ওই শিক্ষার্থী সরকারবিরোধী প্রোপাগাণ্ডা চালানো হয় এমন ২২টি ভুয়া খবরের ওয়েবসাইট চালুর সঙ্গে জড়িত। পুলিশের ভাষ্য, ওই শিক্ষার্থী বিরোধী জোটের শরিকভুক্তদল জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্য।

দীর্ঘদিন যাবৎ বাংলাদেশের সংঘাতময় রাজনীতি শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার দ্বন্দ্বের ঘেরাটোপে বন্দী। পুলিশের হিসাবমতে, গত ১০ ডিসেম্বর থেকে রাজনৈতিক সংঘর্ষে অন্তত পাঁচ জনের মৃত্যু ও কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছে।

বিরোধীপক্ষের কর্মীদের গ্রেপ্তার করতে এবং অন্যদের মুখ বন্ধ রাখতে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোসহ বিরোধী নেতৃবৃন্দ।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এক মামলায় সাত বছর ও অপর এক মামলায় দশ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। তাঁর সমর্থকরা মামলা দুটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করে থাকেন। একটি আপিল আদালতও সর্বশেষ রায় দিয়েছেন, দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ায় তিনি নির্বাচনেও লড়তে পারবেন না।

Related Post