‘আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার আগে কারো হাতে মোবাইল ছিল কিনা?

22 December, 2018 08:12 AM ইলেকশন চেক ২০১৮

ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদক

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, “আওয়ামী লীগ সরকারে আসার আগে কারও হাতে মোবাইল ফোন ছিল না। আমরা মোবাইল ফোন পৌঁছে দিয়েছি।” (ভিডিওটি দেখুন) বিডি ফ্যাক্টচেকের অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে মোবাইল ফোন আসে ১৯৯৩ সালে এবং বিশ্ববাজারের সাথে তাল মিলিয়েই মোবাইল ফোনের গ্রাহক বেড়েছে। 

গত শুক্রবার বিকালে রাজধানীর গুলশানের ইয়ুথ ক্লাব মাঠে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। এসময় তিনি দর্শকদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করেন, “সকলের হাতে কি আছে না মোবাইল ফোন? আছে? বিএনপির আমলে তাদের এক মন্ত্রী মোবাইল ফোনের ব্যবসা করতো। আপনারা কি জানেন মোবাইল ফোনের দাম কত ছিল? একটা মোবাইল ফোন কিনতে গেলে একলক্ষ ত্রিশ হাজার টাকা লাগতো। ফোন করলে এক মিনিটে দশ টাকা আর ফোন ধরলেও এক মিনিটে দশ টাকা। আওয়ামী লীগ আসার পর আজকে সবার হাতে হাতে মোবাইল ফোন।”

এখানে দুটি বিষয় বিবেচ্য। প্রথমত, আওয়ামীগ সরকার ক্ষমতায় আসার আগে মানুষের হাতে মোবাইল ফোন ছিল কিনা। দ্বিতীয়ত, বিএনপি সরকারের আমলে মোবাইলের দাম আর কলরেটের দাম ওই সময়কার আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল কিনা।

বাংলাদেশে প্রথম মোবাইল ফোন চালু হয় ১৯৯৩ সালের এপ্রিল মাসে৷ হাচিসন বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড (এইচবিটিএল) ঢাকা শহরে এএমপিএস মোবাইল প্রযুক্তি ব্যবহার করে মোবাইল ফোন সেবা শুরু করে ১৯৯৬ সালে। এটিই সিডিএমএ প্রযুক্তি দিয়ে সিটিসেল নামে কাজ শুরু করে৷ ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের হিসেবে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে ১৯৯৪ সাল থেকে মোবাইল ফোনের গ্রাহক ছিল। ১৯৯৪ সালে মোবাইল ফোনের গ্রাহক ছিল ০.০০১ শতাংশ। ১৯৯৫ সালে ০.০০২ শতাংশ; ১৯৯৬ সালে ০.০০৩ শতাংশ, ১৯৯৭ সালে ০.০০২১ শতাংশ; ১৯৯৮ সালে ০.০৫৯ শতাংশ; ১৯৯৯ সালে ০.১১৫ শতাংশ, ২০০০ সালে ০.২১২ শতাংশ। ২০০১ সালে মোবাইল ফোনের গ্রাহক দাড়াঁয় ০.৩৮৮ শতাংশ; ২০০২ সালে ০.৭৮৭ শতাংশ; ২০০৩ সালে ০.৯৮২ শতাংশ; ২০০৪ সালে ১.৯৬৮ শতাংশ, ২০০৫ সালে ৬.২৭৫ শতাংশ, ২০০৬ সালে ১৪.২৯ শতাংশ, ২০০৭ সালে ২৩.৩৫ শতাংশ, ২০০৮ সালে ২৯.৮৯ শতাংশ। এখান থেকে দেখা যাচ্ছে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার আগেও ২৩.৩৫ শতাংশ মানুষের হাতে মোবাইল ফোন ছিল।

চিত্র: বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের গ্রাহক বৃদ্ধির তুলনামুলক চিত্র।

এবার দেখা যাক, পুরো বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের বিকাশ ঘটেছে কিনা। ২০০৫ সালে নেপালে মোবাইলের গ্রাহক ছিল ০.৮৮৭ শতাংশ; বাংলাদেশে ৬.২৭৫ শতাংশ আর ভারতে ৭.৮৭৯ শতাংশ; আর বিশ্বে এই হার ছিল ৩৩.৮ শতাংশ। ২০০৭ সালে বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের গ্রাহক ছিল ২৩.৩ শতাংশ, ভারতে ১৯.৮৪ শতাংশ, এবং নেপালে ১২.৮৭ শতাংশ। এখান থেকে দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার আগে অর্থাৎ ২০০৭ সালে পার্শ্ববর্তী অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের গ্রাহক বেশি ছিল। (সূত্র: ওয়ার্ল্ড ব্যাংক)

এবার আসা যাক বিএনপি সরকারের সময় বাংলাদেশে মোবাইল ফোনসেটের দাম কেমন ছিল এবং তা বিশ্ববাজারের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল কিনা। পৃথিবীর প্রথম পূর্ণাঙ্গ মোবাইল ফোন সেট বাজারে নিয়ে আসে মটরোলা কোম্পনি যার নাম ছিল মটরোলা ডায়নাক্যাট। তখন এর দাম ছিল তিন লাখ ৩৫ হাজার টাকা (৩৯৯৫ ডলার)। ১৯৮৯ সালে মটরোলা মাইক্রোটেক নামে আরেকটি ফোন বাজারে আনে যার দাম ছিল প্রায় আড়াই লাখ টাকা (তিন হাজার ডলার)। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে মোবাইল ফোন কোম্পানি মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আশা শুরু করে। ১৯৯৭ সালে বাজারে আসা নকিয়া ৬১১০ এর দাম ছিল ৭৫ হাজার টাকা (৯০০ ডলার)। প্রথম আইফোন আসে ২০০৭ সালে যার দাম ছিল প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা (৬০০ ডলার)। ২০০৩ সালের দিকে বাংলাদেশের বাজারে পাঁচ হাজার টাকা দামেও ফোন পাওয়া গেছে (বিশ্বব্যাংক, ২০০৬)।

চিত্র: বিশ্ববাজারে মোবাইল ফোনসেটের দাম।

২০০১ সালে বাংলাদেশে গড় মোবাইল কলরেটের দাম ছিল ৭ টাকা ৪৩ পয়সা। ওই সময় বিশ্ববাজারেও মোবাইলের কলরেট বেশি ছিল। ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সর্বনিম্ন কলরেটের দাম ছিল মাসে প্রায় ১৬ হাজার টাকা (১৯৯ ডলার)। এশিয়ার দেশগুলোতে বিশ্বের সাথে তাল রেখেই মোবাইল জয়জয়কার শুরু হয় ২০০৬-২০০৭ সালের দিকে মূলত ফোনসেট ও কলরেট কমার ফলে। 

অতএব দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের দাম ও কলরেট বিশ্ববাজারের সাথে তাল মিলিয়েই কমেছে। 

 

 

Related Post