জরিপকারী 'আরডিসি' কেমন প্রতিষ্ঠান?

28 December, 2018 08:12 AM সংস্থা/প্রতিষ্ঠান

ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদক:

The Research and Development Center (RDC) নামে একটি প্রতিষ্ঠান বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন নির্বাচন নিয়ে জরিপ প্রকাশ করেছে। সর্বশেষ গত বুধবার একটি জরিপ প্রকাশ করা হয়।

তাতে দাবি করা হয়েছে, “একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২৪৮টি আসনে জয়ী হতে পারে। এছাড়াও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ৪৯ এবং স্বতন্ত্রসহ অন্যান্য প্রার্থীরা ৩টি আসনে জয়ী হতে পারে।” (সূত্র: বাংলাট্রিবিউন)।

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে আরডিসি এর বিভিন্ন পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। যেমন জনকণ্ঠ পত্রিকা বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র- আরডিসি”

ঢাকা ট্রিবিউন তাদের রিপোর্টে বলেছে, “The Research and Development Center (RDC), a non-government research organization.”

কোনো আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার একটি ওয়েবসাইট থাকা খুবই স্বাভাবিক। ফলে আমরা সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টে নির্ভর না করে আরডিসি’র জরিপটি কিভাবে, কোন পদ্ধতিতে করা হয়েছে তা যাচাই করে দেখার জন্য সংস্থাটির ওয়েবসাইটে ভিজিট করতে চেয়েছিলাম আমরা। কিন্তু বহু অনুসন্ধানের পরও The Research and Development Center (RDC) এর কোনো ওয়েবসাইট পাওয়া যায়নি।

অন্যভাবে বললে, এই নামে বা কাছাকাছি নামে যেসব ওয়েবসাইট বা সংস্থা/প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, সেগুলোর সাথে আলোচ্য RDC এর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বাংলাদেশে আরডিসি নামে অন্য একটি সংগঠন আছে সেটির পূর্ণ নাম Research and Development Collective; যার ওয়েবসাইট হচ্ছে- www.rdcbangladesh.org.

বসনিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজেক্ট আছে IUS Research and Development Center নামে। এটি International University of Sarajevo (IUS) এর অধীনে পরিচালিত। এর সাথেও বাংলাদেশে জরিপ পরিচালনাকারী আরডিসি'র কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। https://research.ius.edu.ba/about-research-development-center

এছাড়াও আরডিসি নাম যুক্ত বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, কিন্তু সেগুলোর কোনোটির ওয়েবসাইটেই বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে কোনো জরিপ নেই। এবং সেগুলোর কোনোটিই জরিপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানই নয়।

কিছু স্ক্রিনশট দেখুন। এভাবে সার্চ করে আপনি নিজেও বিষয়টি যাচাই করে দেখতে পারেন।

The Research and Development Center এর পক্ষ থেকে যে সংবাদ সম্মেলনে গত বুধবারের জরিপটি তুলে ধরা হয়েছে সেখানে একজন ব্যক্তির নামই বারবার এসেছে। তিনি হলেন ফরেস্ট ই কুকসন (Forrest E Cookson).

ঢাকা ট্রিবিউনের রিপোর্টে তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে, “RDC researcher and veteran American economist”। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে Forrest E Cookson এর ক্রেডেনশিয়াল হিসেবে ‘আরডিসি এর গবেষক’, বা ‘আরডিসি এর অর্থনীতিবিদ’ ইত্যাদি পরিচয় সংবাদমাধ্যমে এসেছে।

এখানে উল্লেখযোগ্য, Forrest E Cookson অর্থনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে সুপরিচিত। নিউইয়র্ক টাইমসে ২০০০ সালে বাংলাদেশ বিষয়ে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে তার বক্তব্য পাওয়া যায়। সেখানে তার পরিচয় হিসেবে বলা হয়েছে, “...Forrest E. Cookson, an American economic consultant who has been involved in a study of the potential profits from the gas.”

কিন্তু তার সাথে সংশ্লিষ্ট RDC এর নাম শুধু বাংলাদেশি কিছু সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যায়। ‘আন্তর্জাতিক একটি গবেষণা সংস্থা’-যেটি বিভিন্ন দেশের নির্বাচন নিয়ে জরিপ পরিচালনা করে থাকে- সেটির নাম কোনো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমে Forrest E Cookson এর পরিচয়ের সাথে সব সময়ই RDC এর সংশ্লিষ্টতা দেখা যায়। যেমন, ২০০৬ সালের ২০ আগস্ট ঢাকায় 'Practice of democracy: Importance of free and fair elections in Bangladesh' শীর্ষক এক সেমিনারে অন্যান্যদের সঙ্গে Forrest E Cookson আলোচক ছিলেন। ডেইলি স্টারের তৎকালীন রিপোর্টে তার পরিচয় দেয়া হয়েছে, “Forrest E Cookson of Research and Development Centre”.

২০১৩ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকার ব্রাক সেন্টারে আয়োজিত “Banking Sector Governance: Reforms and Impacts” শীর্ষক অন্য এক সেমিনারে কুকসনের পরিচয় দেয়া হয়েছে, “Mr. Forrest E. Cookson, Economist, Research and Development Centre”.

যেহেতু RDC এর ব্যাপারে কোনো তথ্য পাবলিক ডোমেইনে পাওয়া যায় না, ফলে এটিকে ‘আন্তর্জাতিক একটি গবেষণা সংস্থা’ বা এ ধরনের কিছু বলে অভিহিত করা সুযোগ নেই।

এমনকি বহু বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির নামের অস্তিত্ব থাকলেও এটি ফরেস্ট ই. কুকসন ছাড়া এটির সাথে সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো ব্যক্তির পরিচয় কোথাও পাওয়া যায় না; এটির কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই (ঠিকানা, যোগাযোগ, অর্গানোগ্রাম, ওয়েবসাইট ইত্যাদি); আবার নিকট অতীতে বাংলাদেশের কয়েকটি নির্বাচন উপলক্ষে জনমত জরিপ পরিচালনা ছাড়া RDC এর অন্য কোনো কাজও খুঁজে পাওয়া যায়না।

Forrest E. Cookson এর সাথেও আরডিসি এর সম্পর্ক কেমন এ নিয়েও কোথাও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়না। তিনি কি এটির প্রতিষ্ঠাতা, বা চেয়ারম্যান বা অন্য কিছু? নাকি তিনি এটিকে কোনো কাঠামো ছাড়াই নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান হিসেবে চালান? বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে যে ধারণা পাওয়া যায় তাহলো- তিনি আরডিসি’র ‘গবেষক’ ও ‘অর্থনীতিবিদ’।

নিউইয়র্ক টাইমসের ২০০০ সালের প্রতিবেদন (উপরে উল্লিখিত) থেকে এই ধারণা পাওয়া যায় যে, বাংলাদেশের আর্থিক খাতে Forrest E. Cookson দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। তিনি American Chamber of Commerce (AmCham) in Bangladesh এর সাবেক প্রেসিডেন্টও

চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরোর একজন পরামর্শক। প্রথম আলো এবং দৈনিক জনকণ্ঠের রিপোর্টেও একই তথ্য জানানো হয়েছে।

আরডিসির জরিপ সংক্রান্ত কাজগুলো সম্পর্কে ধারণা পেতে আরেকটি তথ্য হলো, সর্বশেষ জরিপটির অর্থায়ন করেছে বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেল ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন ও ইংরেজি দৈনিক দ্য ইনডিপেনডেন্ট

দৈনিক প্রথম আলো আজ শুক্রবার তাদের প্রিন্ট ভার্সনের ৩য় পৃষ্ঠায় “আরডিসির জরিপের অর্থায়ন সালমানের দুই প্রতিষ্ঠানের” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

তাতে বলা হয়েছে--“বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেল ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন ও ইংরেজি দৈনিক দ্য ইনডিপেনডেন্ট—এই দুটি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে জরিপ করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (আরডিসি)।
গত বুধবার রাজধানীর এক অভিজাত হোটেলে প্রতিষ্ঠানটি নির্বাচনের আগাম জরিপ তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলন করে। ওই সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের দায়িত্ব পালন করা প্রতিষ্ঠান ইমপ্যাক্ট পিআরের পক্ষ থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার জরিপের অর্থায়নের বিষয়টি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করা হয়।”

“উল্লেখ্য, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন আওয়ামী লীগ সভাপতির বেসরকারি খাতবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন ওই দুটি গণমাধ্যম। তিনি এবার ঢাকা-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। তিনি এখন বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান ও বেসরকারি খাতের আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান।”

অন্য কোনো দেশে বা বাংলাদেশের অন্য কোনো দল বা গোষ্ঠির হয়ে কোনো জরিপ পরিচালনা করার তথ্য আরডিসি সম্পর্কে পাওয়া না গেলেও, নিকট অতীতেও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নির্বাচনী জরিপ পরিচালনার তথ্য জানা যায়। চলতি বছরের জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জানিয়েছিলেন, ওই সময় ৩ সিটি করপোরেশন নির্বাচন উপলক্ষে তাদের দলের পক্ষ থেকে আরডিসি’কে দিয়ে জরিপ করানো হয়েছিল।

তিনি লিখেছিলেন, “আসন্ন বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে পুরো জুলাই মাস ধরে স্বতন্ত্র গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (আরডিসি) এর মাধ্যমে আমরা তিনটি জনমত জরিপ করিয়েছি। জরিপগুলোর ফলাফলগুলো তুলে ধরছি:...”

লক্ষ্যণীয় হলো, সজীব ওয়াজেদ প্রতিষ্ঠানটিকে ‘স্বতন্ত্র’ (independent) বলে দাবি করেছেন। কিন্তু তার বক্তব্য ‘আরডিসি এর মাধ্যমে আমরা তিনটি জনমত জরিপ করিয়েছি’ এর সাথে ‘স্বতন্ত্র’ বক্তব্যটি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ, কোনো independent প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোনো জরিপকে তখনই ‘independent’ বলে অভিহিত করা যাবে, যখন ওই প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছায় জরিপটি করবে। কাউকে দিয়ে জরিপ ‘করানো’ হলে সেই প্রতিষ্ঠানকে বা তাদের কাজকে ‘independent’ বলার সুযোগ নেই।

সর্বশেষ জরিপটির অর্থায়নের তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, আরডিসির কার্যক্রম ‘স্বতন্ত্র’ নয়।

নিচে সজীব ওয়াজেদের ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট--

Related Post