অনুবাদে বদলে যাচ্ছে বিদেশি মিডিয়ার রিপোর্ট

29 December, 2018 11:12 AM গণমাধ্যম

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন আজ শনিবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে- "Tensions mount as Bangladesh gears up for general election"

প্রতিবেদনটির ইন্ট্রোতে লেখা হয়েছে--

"(CNN) Bangladeshis vote Sunday on whether to give Prime Minister Sheikh Hasina a record third consecutive term in an election marred by allegations of human rights abuses by her government."

অর্থাৎ, "প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রেকর্ড টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করবেন কিনা রোববারের ভোটে সেই রায় দেবেন বাংলাদেশিরা। এবারের নির্বাচনে তার (শেখ হাসিনা) সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।"

সিএনএন এর রিপোর্ট দেখুন স্ক্রিনশটে--

বাংলাদেশি একাধিক পত্রিকা এই রিপোর্টর অনুবাদ করে শিরোনাম দিয়েছে, "রেকর্ড গড়ে জয়ী হতে পারেন শেখ হাসিনা: সিএনএন" (যুগান্তর)।

যুগান্তরের রিপোর্টের প্রথম দুটি প্যারা হচ্ছে--

"একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ফের নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম সিএনএন। তাদের ভাষ্য, বাংলাদেশে দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে অবদান রাখায় তিনি জয়ী হতে পারেন।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসছে রোববার বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এতে রেকর্ড গড়ে নির্বাচিত হতে পারেন শেখ হাসিনা। তবে তার সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। গণমাধ্যমকর্মী ও বিরোধীদলের নেতাদের হেনস্থা করেছে ক্ষমতাসীন সরকার।"

এখানে ইন্ট্রো (প্রথম প্যারা) যুগান্তর নিজেদের মতো করে তৈরি করেছে, এবং তথ্য বিকৃতি করা হয়েছে। সিএনএন তাদের রিপোর্টের কোথাও এটা বলেনি যে, "বাংলাদেশে দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে অবদান রাখায় তিনি জয়ী হতে পারেন"

https://www.bdfactcheck.com/poster/1546086314.603.jpg

বরং এক জায়গায় বলা হয়েছে-- "But Hasina has since been accused of authoritarianism and harassment of the media and opposition figures, even as she presides over strong economic growth." (অর্থাৎ, এখানে উন্নয়নের কথা উল্লেখ করার পাশাপাশি মিডিয়া ও বিরোধী দলের ওপর নিপীড়ন চালানোর জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে।)

রিপোর্টের শেষাংশে "Weak opposition" বলে একটি উপশিরোনামের অধীনে সিএনএনকে একজন বিশেষজ্ঞ (সলীল ত্রিপাঠি) বলেছেন, তিনি মনে করছেন শেখ হাসিনাই বিজয়ী হবেন; এবং তার এই ধারণার পেছনে মূলত 'নেতিবাচক কারণ'কে তুলে এনেছেন।

তিনি বলেছেন, "I'd be surprised if Hasina doesn't win. The opposition has a lot of problems in terms of pitching candidates and intimidation. She has the advantage of incumbency," Tripathi said. (অর্থাৎ, হাসিনা না জিতলে আশ্চর্য হবো। প্রার্থী দেয়া এবং নিপীড়নের কারণে বিরোধীদেরকে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছে। ক্ষমতায় থাকার সুবিধা তার (শেখ হাসিনা) পক্ষে রয়েছে।)

যুগান্তরের শিরোনাম ও রিপোর্টের ভেতরে সিএনএনের রিপোর্টে তুলে ধরা তথ্য ও মূলভাবের বিকৃতি ঘটেছে।

(যদিও পরে শিরোনাম এবং ভেতরের রিপোর্ট পরিবর্তন করেছে পত্রিকাটি। নতুন শিরোনাম করা হয়েছে "বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যা বলেছে সিএনএন")


যুগান্তর স্ক্রিনশট--

জাগোনিউজ নামে একটি অনলাইন পোর্টাল শিরোনাম করেছে "হাসিনার সম্ভাবনাই দেখছে সিএনএন"

এই পোর্টালের রিপোর্টের প্রথম দুটি প্যারা তুলে দেয়া হল--

"যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম সিএনএন বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও দলটির নেত্রী শেখ হাসিনার পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখছে। যদিও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ বেশ কিছু বিষয়ে অভিযোগ তুলেছে তারা। তবে এতকিছু ছাপিয়ে তাদের অনুমান, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে অবদান রাখায় হাসিনার জয়ের সম্ভাবনাই বেশি।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে আগামী রোববারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রেকর্ড গড়ে তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত হতে পারেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যদিও তার সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। তথাপি উন্নয়ন ও দেশের অর্থনীতির সামগ্রিক অগ্রগতির কারণে হাসিনার পক্ষে পড়তে পারে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট।"

জাগোনিউজের প্রতিবেদনে বিকৃতির মাত্রা আরও মারাত্মক। একাধিক নতুন তথ্য আমদানি করা হয়েছে অনুবাদের সময়।

জাগোর প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট-

একই রকম বিকৃত অনুবাদ করেছে বাংলাদেশ প্রতিদিন-- ফের শেখ হাসিনার নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা : সিএনএন 

অনুবাদের সময় একই রকমভাবে তথ্য ও ভাব বিকৃতির ঘটনা দেখা গেছে বার্তা সংস্থা এপির একটা রিপোর্টের ক্ষেত্রেও। ২৮ ডিসেম্বর এপি JULHAS ALAM এর লেখা প্রতিবেদনটি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অনেক সংবাদমাধ্যম পুনঃপ্রকাশ করেছে। এর মধ্যে টাইম ম্যাগাজিনের শিরোনাম ছিলো, "Bangladesh's Iron Lady Faces a Hobbled Opposition as She Seeks Her Fourth Term" ("বাংলাদেশের লৌহমানবী চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় আসার লড়াইয়ে হাত-পা বাঁধা বিরোধী দলের মুখোমুখি হচ্ছেন")।

এই রিপোর্টটি বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে এসেছে এভাবে---

কালের কণ্ঠ- "টাইম ম্যাগাজিন বলছে- চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন আয়রন লেডি শেখ হাসিনা"

জনকণ্ঠ- রেকর্ড চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন আয়রন লেডি শেখ হাসিনা

জাগোনিউজ-- আয়রন লেডি শেখ হাসিনাই প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন : টাইম

শেখ হাসিনাই প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন: টাইম

আরটিভি অনলাইন ”আয়রন লেডি শেখ হাসিনাই হতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী: এপি”

যুগান্তর-- শেখ হাসিনাই আবার ক্ষমতায় আসছেন

এবার দেখা যাক এপির রিপোর্টে কী বলা হয়েছে।

রিপোর্টের ইন্ট্রো হচ্ছে-- "Bangladesh Prime Minister Sheikh Hasina is poised to win a record fourth term in Sunday’s elections, drumming up support by promising a development bonanza as her critics question if the South Asian nation’s tremendous economic success has come at the expense of its already fragile democracy."

অর্থাৎ, "বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী রোববারের নির্বাচনে চতুর্থবারের মতো জিতে আসার রেকর্ড গড়ার জন্য প্রস্তুত, তিনি উন্নয়নের স্বপ্ন দেখিয়ে তার পক্ষে সমর্থন নেয়ার চেষ্টা করছেন, যখন তার সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলছেন যে, দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটির বিশাল অর্থনৈতিক সাফল্য কি ইতোমধ্যে ভঙ্গুর হয়ে পড়া গণতন্ত্রের বিনিময়ে এসেছে?"

এই প্যারাটিতে একইসাথে শেখ হাসিনার উন্নয়নের প্রশংসা এবং গণতন্ত্রকে ভঙ্গুর করে ফেলার সমালোচনা রয়েছে। কিন্তু কোথাও এটা বলা নেই যে, "চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন শেখ হাসিনা"। 'poised to win a record fourth term' শব্দগুলোর অর্থ হচ্ছে, 'রেকর্ড গড়ে চতুর্থবারের মতো নির্বাচিত হতে প্রস্তুত বা আত্মবিশ্বাসী'। শিরোনামে ব্যবহার করা 'She Seeks Her Fourth Term' এর অর্থ হচ্ছে, শেখ হাসিনা 'চতুর্থবার নির্বাচিত হতে চান' 'চতুর্থবার নির্বাচিত হতে উদগ্রীব'। 'প্রস্তুত' 'আত্মবিশ্বাসী' 'ইচ্ছুক', 'উদগ্রীব' ইত্যাদি যে শব্দগুলো দিয়েই অনুবাদ করা হোক না কেন- আলোচ্য রিপোর্টে চতুর্থবার নির্বাচিত হওয়ার জন্য শেখ হাসিনার সম্ভাব্য আকাঙ্খাকে বুঝানো হয়েছে; এপির পক্ষ থেকে কোনো ভবিষ্যতবাণী করা হয়নি যে, তিনি চতুর্থবার নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন।

ফলে, বাংলাদেশি পত্রিকাগুলোতে যেমন শিরোনাম করা হয়েছে তা ভুল।

এছাড়া পুরো রিপোর্টে সরকারের করা উন্নয়ন ও জঙ্গি দমনে ভূমিকার প্রশংসা করার সাথে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভয়াবহ চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে; এবং এজন্য সরকারকে দায়ী করা হয়েছে। শেখ হাসিনার অধীনে আসন্ন নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে একই প্রতিবেদনে। "With Hasina’s hold on the state machinery increasingly clear, doubts have arisen about the fairness of the vote. The opposition demanded earlier this week the resignation of the Election Commission chief."

কালের কণ্ঠ এই রিপোর্টটির অনুবাদ করে ইন্ট্রো লিখেছে এভাবে--

"রবিবার বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রেকর্ড চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা। প্রভাবশালী মার্কিন ম্যাগাজিন টাইম এর এক প্রতিবেদনে এই আভাস দেওয়া হয়েছে। ওই প্রতিবেদনটি বলছে, ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে এবারের নির্বাচনেও ভোটাররা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকেই বেছে নেবেন।"

প্রথমত ভুল হচ্ছে, এটি টাইম ম্যাগাজিনের রিপোর্ট নয়। এপির রিপোর্ট এপির ক্রেডিট দিয়ে টাইম ম্যাগাজিন পুনঃপ্রকাশ করেছে মাত্র।

দ্বিতীয়ত, রিপোর্টে "রেকর্ড চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা" এমন কোনো আভাস দেয়া হয়নি; বরং চতুর্থবার নির্বাচিত হতে শেখ হাসিনার আকাঙ্খার কথা বলা হয়েছে।

তৃতীয়ত, "ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে এবারের নির্বাচনেও ভোটাররা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকেই বেছে নেবেন"-- ধরনের কোনো বক্তব্য এপির প্রতিবেদনে নেই।

কালের কণ্ঠের মতো উপরে উল্লেখ করা অন্যান্য পত্রিকার রিপোর্টেও একইভাবে তথ্য বিকৃতি লক্ষ্য করা গেছে।

বিদেশি সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট কিভাবে বিকৃত করা হচ্ছে তার আরো কয়েকটি উদাহরণ নিচের প্রতিবেদনগুলো।

চ্যানেল আই অনলাইনের প্রতিবেদন-- আবারও ক্ষমতায় আসছে আওয়ামী লীগ: পশ্চিমা গণমাধ্যম

কালের কণ্ঠের আরেক প্রতিবেদন-- শেখ হাসিনাই প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন : টাইম ও দ্য গার্ডিয়ান

একুশে টিভির অনলাইনে প্রকাশিত প্রতিবেদন: বিদেশি গণমাধ্যমে খবর: শেখ হাসিনা-ই ফের ক্ষমতায় আসছেন।

 

 

Related Post