বাংলাদেশি মিডিয়ায় ভুয়া খবর উৎপাদন ও ছড়ানোর একটি উদাহরণ

21 January, 2019 14:01 PM গণমাধ্যম

কদরুদ্দীন শিশির

গত দুইদিন ধরে ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমে একটি খবর ভাইরাল হয়েছে। নানা সংবাদমাধ্যমে যেসব শিরোনামে খবরটি এসেছে তার কয়েকটি এরকম--

কালের কণ্ঠ: সৌদি নারীদের বিয়ে করতে পারবেন বাংলাদেশীরাও

পূর্বপশ্চিমবিডি: সৌদি নারীদের পছন্দ বাংলাদেশি পুরুষ

আমাদের সময়: সৌদি নারীদের বিয়ে করতে পারবেন বাংলাদেশিরাও, পাবেন পেনশন ও বেতন

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নিউজএইটিন: সুন্দরীদের বিয়ে করলেই মিলবে মাইনে ও পেনশন, বিদেশিদের সুযোগ দিচ্ছে এই দেশ

আরেকটি ভারতীয় পোর্টাল এবেলা: সুন্দরীদের বিয়ে করলে মিলবে মাইনে, বাড়ছে দরখাস্তের হুড়োহুড়ি

মোড়লনিউজ নামে একটি পোর্টাল: বিয়ে করার জন্য সৌদি নারীদের পছন্দের শীর্ষে বাংলাদেশি পুরুষরা!

এরকম আরও অনেক অখ্যাত পোর্টালে এই খবর নানাভাবে এসেছে।

আরব নিউজ, গালফ নিউজ এবং নামহীন 'আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম' এর বরাতে খবরগুলো যেসব উল্লেখযোগ্য দাবি করা হয়েছে সেগুলো হল--

১. বিয়ে করার জন্য সৌদি নারীদের পছন্দের শীর্ষে বাংলাদেশি পুরুষরা। (ভুয়া তথ্য)

২. সৌদি আরবে নারীর সংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেশি। (ভুয়া তথ্য)

৩. সৌদি নারীদেরকে বিদেশিদের কাছে বিয়ে দেয়ার জন্য 'আদা-জল খেয়ে নেমেছে সৌদি সরকার' (কালের কণ্ঠের রিপোর্ট দ্রষ্টব্য)। (ভুয়া তথ্য)

৪. সৌদি নারীদের বিয়ে করার জন্য (ইনসেন্টিভ হিসেবে) বিদেশিরা বেতন-ভাতা পাবেন। (ভুয়া তথ্য)

৫. সৌদি নারীদের বিয়ে করতে পারবেন বাংলাদেশীরাও। (আংশিক সত্য)


এখানকার প্রথম ৪টি দাবি পুরোপুরি ভুয়া। আর ৫ম তথ্যটি আংশিক সত্য


১. বিয়ে করার জন্য সৌদি নারীদের পছন্দের শীর্ষে বাংলাদেশি পুরুষরা (ভুয়া তথ্য):

পূর্বপশ্চিমবিডিসহ যেসব অনলাইন পোর্টালে এই তথ্যটি পরিবেশন করা হয়েছে সেগুলোতে সূত্র হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আরব নিউজের কথা বলা হয়েছে। আরব নিউজের ওই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে ২০১৪ সালের ৭ নভেম্বরর। শিরোনাম হচ্ছে, "Saudi women prefer to marry foreigners."

পূর্বপশ্চিমবিডি' এর প্রতিবেদনটি শুরু হয়েছে এভাবে-- "বিয়ের ক্ষেত্রে সৌদি নারীদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছেন বাংলাদেশি পুরুষেরা। সৌদি পুরুষদের চেয়ে বিদেশী পুরুষ বিয়ে করলে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনেক স্বাধীনতা পাওয়া যায় বলে বিশ্বাস করেন সে দেশের নারীরা। ফলে দিন দিন বিদেশী পুরুষ বিয়ের সংখ্যা বাড়ছে সৌদি আরবে। সম্প্রতি এক জরিপ রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে এ খবর দিয়েছে সৌদি আরবের প্রভাবশালী গণমাধ্যম আরব নিউজ।"

পূর্বপশ্চিমের পুরো প্রতিবেদনটি আরব নিউজের আলোচ্য প্রতিবেদন অবলম্বনে তৈরি করা। মূল সূত্র থেকে প্রায় সব তথ্য হুবহু অনুবাদ করা হয়েছে। কিন্তু "বিয়ের ক্ষেত্রে সৌদি নারীদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছেন বাংলাদেশি পুরুষেরা" তথ্যটি আরব নিউজের প্রতিবেদনের কোথাও নেই। এবং বলাই বাহুল্য, এমন তথ্য ইন্টারনেট সার্চ করে অন্য কোনো সূত্রেও পাওয়া যায়নি। ফলে স্পষ্টতই এটি ভুয়া তথ্য। 

সবচেয়ে বড় কথা হলো এটি সাড়ে ৪ বছরের পুরোনো প্রতিবেদন, যেটি বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমটি প্রকাশ করেছে গত ১৯ জানুয়ারি (আজ ২১ জানুয়ারি থেকে ২দিন আগে)। ফলে প্রতিবেদনের অন্যান্য তথ্যগুলোও অপ্রাসঙ্গিক ও পাঠকের জন্য বিভ্রান্তিকর।


২. সৌদি আরবে নারীর সংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেশি (ভুয়া তথ্য):

উপরে উল্লিখিত ভারতীয় দুটি পত্রিকার প্রতিবেদনসহ কয়েকটি পোর্টালের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, দেশে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা বেশি। যেমন কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের শুরুতেই বলা হয়েছে-- "দেশে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা বেশি। ফলে দেশের বহু নারীই অবিবাহিত থেকে যান। এবার এই সমস্যা সমাধানে আদা-জল খেয়ে নেমেছে সৌদি সরকার। বিয়ে করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে ভিনদেশের ছেলেদেরকে। বংলাদেশিরাও এই সুযোগ পাবেন।"

এই তথ্যটি ভুয়া। জাতিসংঘের তথ্য বলছে, সৌদি আরবের নারী পুরুষ রেশিও হচ্ছে, ১ দশমিক ২১। অথাৎ, দেশটিতে প্রতি ১ দশমিক ২১ পুরুষের জন্য একজন নারী রয়েছেন। শতাংশের হিসেবে বললে মোট জনসংখ্যায় পুরুষ প্রায় ৫৫ শতাংশ আর নারী ৪৪ শতাংশ। এই এবং এই লিংকে গিয়ে সৌদি আরবের মোট জনসংখ্যায় নারী ও পুরুষের হার দেখে নিতে পারেন।

৩. সৌদি নারীদেরকে বিদেশিদের কাছে বিয়ে দেয়ার জন্য 'আদা-জল খেয়ে নেমেছে' সৌদি সরকার (ভুয়া তথ্য):

কালের কণ্ঠসহ কয়েকটি রিপোর্টের এই দাবি করা হয়েছে। সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে এমন কোনো উদ্যোগ নেই। বরং ২০১৬ সালের আগে সৌদি নারীদের দ্বারা অ-সৌদি পুরুষ বিয়ের যেসব বাধা ছিল সেগুলো কিছুটা শীতিল করা হয়েছে বিগত কয়েক বছরে। অর্থা, এখন চাইলে সৌদি নারীরা অ-সৌদি পুরুষদের বেশ কিছু শর্তসাপেক্ষে বিয়ে করতে পারবেন। এ সংক্রান্ত আরও জানতে পারবেন গত বছরের মার্চ মাসে প্রকাশিত এই লিংকে। 


৪. সৌদি নারীদের বিয়ে করার জন্য বিদেশিরা বেতন-ভাতা পাবেন (ভুয়া তথ্য):

আমাদের সময় এবং আরও কয়েকটি প্রতিবেদনে এমনভাবে এই তথ্য দেয়া হয়েছে যে, পড়লে মনে হবে সৌদি নারীদেরকে বিয়ে করা জন্য বিদেশি বরকে বেতন-ভাতা দেবে সৌদি কর্তৃপক্ষ। এটিও ভুয়া তথ্য। মূল বিষয়টি হচ্ছে, আগে কোনো বিদেশি পুরুষ সৌদি নারীকে বিয়ে করলে তার চাকরি শেষে সরকারি কোনো পেনশন বা অবসর ভাতা পেতেন না। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এই নিয়ম বদলে বিদেশি স্বামীর জন্যও অবরসর ভাতার দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সৌদি সরকার। ২০১৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আরব নিউজ। শিরোনাম, "Expats married to Saudi women entitled to pension."


৫. সৌদি নারীদের বিয়ে করতে পারবেন বাংলাদেশিরাও (আংশিক সত্য):

গালফ নিউজের যে প্রতিবেদনের বরাতে গতকাল এবং পরশু বাংলাদেশি মিডিয়ায় প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে, "সৌদি নারীদের বিয়ে করতে পারবেন বাংলাদেশিরাও"; সেই প্রতিবেদনটি 'সাম্প্রতিক সময়ের' নয়। এটি এক বছর আগের খবর! New conditions for Saudi marriages with foreigners শিরোনামে গালফ নিউজে গত বছরের ১৮ মার্চ প্রকাশিত প্রতিবেদনটি পাবেন এই লিংকে

তাতে সাধারণভাবে 'সব বিদেশিদের' কথা বলা হয়েছে, আলাদা করে বাংলাদেশিদের কথা প্রতিবেদনে নেই। হ্যাঁ, 'সব বিদেশিদের' মধ্যে বাংলাদেশিরাও অন্তর্ভূক্ত হবেন এটাই স্বাভাবিক।

এক বছর আগের খবর নতুন করে প্রকাশ করা এবং মূল প্রতিবেদনে আলাদাভাবে না থাকা সত্ত্বেও স্বপ্রণোদিত হয়ে বাংলাদেশিদের বিয়ের তথ্য যোগ করার কারণে তথ্যের শতভাগ সঠিকতা বজায় থাকেনি। ফলে এটিকে আংশিক সত্য হিসেবে ধরে নেয়া যায়।

কয়েক বছরের পুরোনো একাধিক খবরকে জোড়া লাগিয়ে, সাথে নতুন ভুয়া তথ্য যোগ করে (এবং অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভুল অনুবাদে) নতুন করে উৎপাদন করা খবরের মাধ্যমে কেমন সংখ্যক মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে তার একটা ধারণা দেয়ার জন্য নিচের ফেসবুক থেকে কয়েকটি স্ক্রিনশট তুলে দেয়া হচ্ছে। স্ক্রিনশটগুলোতে এই ভুয়া খবরগুলোতে সাধারণ মানুষের 'রিয়েকশন' এবং 'শেয়ার' এর সংখ্যাটা লক্ষ্য করুন--

Related Post