যেভাবে ছড়ালো 'এরশাদের মৃত্যু'র গুজব

22 January, 2019 11:01 AM সামাজিক মাধ্যম

ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদক:

"এরশাদ মারা যাননি, মৃত্যুর খবরটি গুজব"-- আজ মঙ্গলবার সকালে এমন একটি খবর অনেকেই দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে দেখতে পেয়েছেন।

দৈনিক যুগান্তর অনলাইনের "এরশাদ সুস্থ আছেন, গুজবে কান না দেয়ার আহ্বান" শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে--

"সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সুস্থ আছেন। তাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযাগমাধ্যমে যেসব লেখালেখি হচ্ছে তা নিছকই গুজব। এসব গুজবে কান না দিয়ে এরশাদের সুস্থতার জন্য দোয়া চাওয়া হয়েছে জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের উপ-প্রেস সচিব খন্দকার দেলোয়ার জালালী যুগান্তরকে জানান, এই মাত্র সিঙ্গাপুরে কথা বলেছি- আজ তিনি অনেক ভালো বোধ করছেন। তিনি ভালো আছেন, সুস্থ আছেন। গুজবে কান না দিয়ে সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন তিনি।"


গুজবটি ছড়ালো কিভাবে?

bdfactcheck.com বিষয়টি খতিয়ে দেখে যা পেয়েছে তা নিচে তুলে ধরা হলো--

গুজব বা ভুয়া খবর ছড়িয়ে পড়ার একটা সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে, কোনো ব্যক্তি বা বা প্রতিষ্ঠান বা নিউজ পোর্টাল ইচ্ছা করে বা ভুলে কোনো ভুল তথ্য অনলাইনে ছেড়ে দেন, এবং মানুষ সেটাকে বিশ্বাস করে অন্যের কাছে শেয়ার করার মাধ্যমে আরও ছড়াতে থাকেন। এক পর্যায়ে এটা ভাইরাল হয়ে যায়।

কিন্তু আলোচ্য ঘটনায় 'এরশাদ মারা গেছেন' এই তথ্যটি প্রথমে কোনো ব্যক্তি বা নিউজ পোর্টাল সরাসরি দাবি করেনি। বরং সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা তথ্য (সেটিও আনভেরিফায়েড তথ্য এবং প্রকাশকারী পোর্টালটি ভুয়া খবর ছড়ানোর জন্য খ্যাত) ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে এবং পোর্টাল থেকে পোর্টালে কপি হতে হতে আলাদা আরও একটি 'তথ্য' বা 'গুজব' পরিণত হয়েছে। এক্ষেত্রে কপিকারীদের উপস্থাপনার কৌশল এবং সাধারণ পাঠকের 'শিরোনাম দেখে সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রবণতা' বিভ্রান্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে বলেই আমাদের কাছে মনে হয়েছে।

এরশাদ মারা গেছেন- এ ধরনের যেসব ফেসবুক পোস্ট আমরা দেখতে পেয়েছি সেগুলো সবই সোমবার দিবাগত রাত এবং আজ মঙ্গলবার সকালে পোস্ট করা। অর্থাৎ, গত রাতে থেকেই গুজবটি ছড়িয়েছে।

ভুয়া সংবাদ পরিবেশনের জন্য অতিপরিচিত বাংলাইনসাইডার নামক পোর্টালে গতকাল বিকাল ৩টা ৩৯ মিনিটে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যার শিরোনাম "এরশাদের শেষ ইচ্ছা নিজ নামে ট্রাস্ট খোলা"

প্রতিবেদনের প্রথম কয়েকটি বাক্য এরকম--"মৃত্যুর আগে জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ নিজ নামে একটি ট্রাস্ট খোলার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন স্বজনদের কাছে। তাঁর রেখে যাওয়া সহায়-সম্পত্তি এ ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত হবে। এবং ঐ ট্রাস্ট থেকে যা আয় হবে তা অসহায় এবং দরিদ্রদের কল্যাণে ব্যয় করা হবে। এদিকে, গুরুতর অসুস্থ সাবেক এই রাষ্ট্রপতি তাঁর স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি, এবং দেশে- বিদেশে থাকা তার বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সম্পদ পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে বণ্টন করে দিয়েছেন বলে পারিবারিক সূত্র দাবী করছে।"

স্ক্রিনশট-

এই প্রতিবেদনের মূল তথ্যটি হলো, "এরশাদ নিজ নামে একটি ট্রাস্ট খোলার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন স্বজনদের কাছে।" এবং এটাকে বাংলাইনসাইডার তাদের শিরোনামে অভিহিত করেছে "এরশাদের শেষ ইচ্ছা" হিসেবে। নামহীন সূত্রের বরাতে পরিবেশিত এই তথ্যটি সঠিক নাকি ভুল সেটা যাচাইয়ে যাচ্ছে না bdfactcheck.com. তবে এখানে 'এরশাদ মারা গেছেন' এমন কোনো তথ্য দেয়া হয়নি। শুধু প্রতিবেদনের শুরুতে বলা হয়েছে "মৃত্যুর আগে" শব্দ দুটি দিয়ে। যদিও স্পষ্টতই বুঝা যাচ্ছে শব্দ দুটি দিয়ে বুঝানো হয়েছে- "মৃত্যুর আগে ট্রাস্টটি খুলে যেতে চান তিনি""মারা যাওয়ার আগে তিনি বলেছেন" এমনটা বুঝানো হয়নি।

বাংলাইনসাইডারের এই প্রতিবেদনটি এরপর আরও অনেক ভুইফোড় অনলাইন পোর্টালে কপি করে প্রকাশ করা হয়েছে (কপি করার বিষয়টি নিশ্চিত হতে রিপোর্টগুলো মিলিয়ে পড়তে পারেন)।

যেমন- আমাদের সময় নামে একটি পোর্টাল বাংলাইনসাইডারের ক্রেডিট দেয়া ছাড়াই প্রকাশ করেছে "মৃত্যুর আগে নিজ নামে ট্রাস্ট খোলার ইচ্ছা এরশাদের" শিরোনামে।

ঢাকারিপোর্ট নামে আরেকটি পোর্টালও ক্রেডিট ছাড়া প্রকাশ করেছে "মৃত্যুর আগে নিজের শেষ ইচ্ছার কথা জানালেন এরশাদ! জেনে নিন" শিরোনামে।

সম্পাদক ডটকম নামে এক পোর্টাল প্রকাশ করেছে "মৃত্যুর আগে এরশাদের শেষ ইচ্ছা নিজ নামে ট্রাস্ট খোলা" শিরোনামে।

একই তথ্য ঠিক রেখে রিপোর্টি রিরাইট করেছে বাংলাদেশ টুডে নামে আরেকটি পোর্টাল "গুরুতর অসুস্থ এরশাদের সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারা শুরু!" শিরোনামে। এছাড়াও আরও অনেক পোর্টাল নিজেদের চাহিদা মতো রিপোর্টটি রিপ্রোডিউস করেছে।

স্ক্রিনশটে দেখুন ইনসাইডারে প্রকাশিত রিপোর্টের সময় এবং এরপর কপিকারীদের প্রকাশের সময়--


লক্ষ্য করার বিষয় হলো, যারা শিরোনাম করেছে "মৃত্যুর আগে নিজের শেষ ইচ্ছার কথা জানালেন এরশাদ!"- তাদের শিরোনামে ভুল নেই। এবং তাদের রিপোর্টেও ইনসাইডারের দেয়া তথ্যের চেয়ে বেশি কিছু নেই। কোনো রিপোর্টেই বলা হয়নি, "এরশাদ নিজের শেষ ইচ্ছার কথা জানিয়ে মারা গেছেন"। বরং বলা হয়েছে, "মারা যাওয়ার আগে শেষ ইচ্ছা হিসেবে একটি ট্রাস্ট খুলতে চান তিনি।"

কিন্তু কেউ শুধু শিরোনাম পড়ে সিদ্ধান্ত নিলে তার বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ আছে। "মৃত্যুর আগে নিজের শেষ ইচ্ছার কথা জানালেন এরশাদ!" শিরোনামের বাক্যগঠন শৈলীর কারণে রিপোর্টের ভেতরে না যাওয়া পাঠকের কাছে মনে হতে পারে "এরশাদ নিজের শেষ ইচ্ছার কথা জানিয়ে মারা গেছেন"!

এবং বাস্তবেও দেখা যাচ্ছে এসব ভুইফোড় পোর্টালের অনেক পাঠক এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, বা অন্ততপক্ষে প্রাথমিক পর্যায়ে এমনটা মনে করেছিলেন।

পাঠকের এমন (এরশাদ মারা গেছেন) বিশ্বাসের প্রমাণ পাওয়া যায় পোর্টালগুলোর ফেসবুক পেইজে শেয়ার করা প্রতিবেদনের নিচের কমেন্ট সেকশন থেকে। দেখুন তেমন কিছু কমেন্ট--

bd24report নামে নিচের কথিত এই নিউজ পোর্টালটির কপি করা প্রতিবেদনটিতে ৩৫ হাজারের বেশি মানুষ 'রিয়েকশন' দিয়েছেন। চারশোর মতো শেয়ার করেছেন, কমেন্ট করেছেন তিনশোর বেশি  মানুষ।

উপরের প্রতিবেদনটির নিচে এমন কিছু কমেন্টও পাওয়া গেছে যারা 'ইন্নালিল্লাহ ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' লিখেছেন। কেউ প্রশ্ন করেছেন, 'কখন মারা গেছে'। অর্থাৎ, এসব পাঠক সংবাদের ভেতরে না গিয়েই 'এরশাদ মারা গেছেন' বলে ধরে নিয়েছেন।

 

অন্য একটি পোর্টালের শেয়ার করা প্রতিবেদনে একজন কমেন্ট করেছেন, "আল্লাহ আপনাকে জান্নাতি মানুষ হিসেবে কবুল করুন আমিন।"


একজনের শেয়ার করা পোস্টে অন্য একজন মারা যাওয়ার সময় জানতে চাচ্ছেন--


সোমবার বিকালে ইনসাইডারে প্রকাশ এবং এরপর অন্যান্য পোর্টালে বিভ্রান্তিকর শিরোনামে রিপোর্টটি পুনপ্রকাশের পর থেকে পাঠকদের একাংশ বিভ্রান্ত হতে শুরু করেন। এবং এরপর আস্তে আস্তে গত রাতে এবং আজ সকালে অনেকে কোনো সূত্র উল্লেখ ছাড়াই নিজের ওয়ালে পোস্ট দেয়া শুরু করেন-- "এরশাদ মারা গেছেন।" দেখুন কয়েকটি স্ক্রিনশট--


কেউ অবশ্য প্রথমে গুজবের শিকার হওয়ার পর অন্যের কাছ থেকে জানতে পেরে সংশোধনীমূলক কমেন্ট/পোস্টও করেছেন। নিচে তেমন একটি স্ক্রিনশট দেখুন:

Related Post