‘ভয় দেখিয়ে হিন্দুকে মুসলিম বানানো’ নয়, এটি ‘জ্বিন তাড়ানোর’ ভিডিও!

28 January, 2019 11:01 AM সামাজিক মাধ্যম

মো: মাহবুবুর রহমান:

ফেসবুকে ভারতীয় কয়েকজন ব্যবহারকারী একটি ভিডিও শেয়ার দিয়ে দাবি করছেন, এটি বাংলাদেশে একজন হিন্দু নারীকে জোর করে মুসলিম বানানোর ঘটনার ভিডিও। এই দাবিকে বিশ্বাস করে হাজারো মানুষ ৬ মিনিট ৫ সেকেন্ডের ভিডিওটি শেয়ার দিচ্ছেন এবং নানান মন্তব্য করছেন।

ভিডিওটি ছড়াচ্ছেন এমন একজন ভারতীয় ফেসবুক ব্যবহারকারীর নাম ‘রূপম ভট্টাচার্য্য’। নিচের স্ক্রিনশটে দেখুন তিনি কিভাবে ভিডিওটি পোস্ট করেছেন-- (কমেন্ট ও লাইক/শেয়ারের সংখ্যাসহ পুরো পোস্টটি ল্যাপটপের স্ক্রিনে একসাথে শো না করায় দুটি আলাদা স্ক্রিনশট নিয়ে উপর-নিচে বসানো হয়েছে):

ভিডিওর ক্যামশনে তিনি বাংলা ও ইংরেজিতে নিচের কথাগুলো লিখেছেন--

“এভাবে হিন্দু মেয়েদের ভয় দেখিয়ে মুসলিম বানানো হচ্ছে বাংলাদেশে।
কোথায় বুদ্ধিবিচি কোথায় প্রতিবাদ ? !!

This is how hindu girls are forcefully converted to islam in Bangladesh.

Where is the intellectual mafia ?
Where are the protests ??”

কিন্তু bdfactcheck.com যাচাইয়ে দেখা যাচ্ছে, ‘রূপম ভট্টাচার্য্য’ এর দাবিটি ভুয়া। তিনি বাংলাদেশে এক ওঝার কথিত ‘জ্বীন তাড়ানো’র একটি বর্বর ঘটনাকে ‘হিন্দু মেয়েদের ভয় দেখিয়ে মুসলিম বানানো’ বলে প্রচার করছেন।

মূল ভিডিও ১২ মিনিট ২২ সেকেন্ডের। ইউটিউবে দেখুন এই লিংকে। নিচে দেখুন স্ক্রিনশট--

মূল ভিডিও আপলোড করা হয়েছে চলতি জানুয়ারির ১৯ তারিখ। আর ‘রূপম ভট্টাচার্য্য’ তার ফেসবুকে পোস্ট করেছেন ২৫ জানুয়ারি।

‍“জিন ছাড়ানোর সেরা ভিডিও । হিন্দু জিন কিভাবে মুসলমান হয় দেখুন”-- এই শিরোনাম থেকেই স্পষ্ট ভিডিওটির ঘটনাটি আসলে কী। ১২ মিনিট ২২ সেকেন্ড মূল ভিডিও প্রথম থেকে শুনলে শিরোনামের বাস্তবতা পরিষ্কার হবে দর্শক/শ্রোতাদের কাছে।

কিন্তু মূল ভিডিও থেকে প্রথম অংশটা কেটে পোস্ট করেছেন ‘রূপম ভট্টাচার্য্য’ (এবং পরে সেটা পোস্ট করেছেন আরও অনেকে)। অর্থাৎ, ইচ্ছা করেই দর্শক/শ্রোতাদেরকে বিভ্রান্ত করতে এটি করা হয়েছে।

ভিডিওর শুরুতে ওঝা কিছু একটা জিজ্ঞেস করে হাতবাঁধা নারীর (যাকে রূপম ভট্টাচার্য্য দাবি করছেন হিন্দু নারী) প্রতি আঙ্গুল তুলে বলছেন, “হাছা কথা কইবি”।

তখন ওই নারী নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, “নাহ, ফেম (প্রেম) করি বিয়া কইচ্ছি।”

একটু থেমে আবারও একই কথা বলেন তিনি, ‍“ফেম করি বিয়া কইচ্ছি।”

তখন ওঝা বলেন, “হাছা?” উত্তরে নারীটি বলেন, “হা”।

এরপর ওঝা নারীটিকে ধরে রাখা যুবকের দিকে আঙ্গুল তুলে নারীকে জিজ্ঞেস করেন, “তে তোর জামাই.... ইয়া.. রোগীর জামাই ফেম (প্রেম) কইচ্ছেনি?”

মহিলাটি এ পর্যায়ে কিছু না বলে তাকিয়ে থাকেন। তখন ওঝা বলে ওঠেন, “এইবার রোগীর জামাই ধরা খাইলো।” তখন আবারও “রোগীর জামাই ফেম কইচ্ছেনি?” প্রশ্ন করলে মহিলা মাথা নাড়িয়ে বলেন, “নাহ..”।

এভাবে চলতে থাকে তাদের নানান কথপোকথন। শুরুর কথপোকথন থেকেই স্পষ্ট যে, নারীটিকে পেছন থেকে শক্ত করে ধরে রাখা লোকটি তারই স্বামী। ‘মুসলিম’ স্বামী নিশ্চয়ই তার স্ত্রীকে ‘হিন্দু ধর্ম থেকে জোর করে মুসলিম বানানো’র কথা না।

ভিডিওর বাকি কথাবার্তা শুনলে আরও স্পষ্ট হয়, হাতবাঁধা নারীটি নিজেই মুসলিম। তার গায়ে বোরকা। ওঝা যখন (হিন্দু জ্বীনকে মুসলিম বানানোর চেষ্টার অংশ হিসেবে!) তাকে আরবী দোয়া পড়াচ্ছেন তখন তিনি সঠিক উচ্চারণেই সেগুলো পড়ে যাচ্ছেন; হিন্দু হলে সেটা সম্ভব হওয়ার কথা ছিল না।

ভিডিওতে বারবার শোনা যাচ্ছে ওঝা বলছেন, “আর আইতো না তো?” জবাবে নারীটি বলছেন, “নাহ, আইতো না”। এর মাধ্যমে জ্বীনে আর ফেরত না আসাকে বুঝাচ্ছেন তারা উভয়েই।

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এমন ওঝার দ্বারা এভাবে ভুক্তভোগীর ওপর নানা শারিরীক নির্যাতন চালিয়েছে ‘জ্বিন তাড়ানোর’ কথিত চেষ্টার ঘটনা খুবই সহজলভ্য।

রূপমের মতো আরও কয়েকজন ভুয়া ভিডিওটি শেয়ার করছেন। সেটা দেখা যাচ্ছে নিচের স্ক্রিনশটে--

Related Post