এই শিশুটির গায়ে কি কুরআনের আয়াত ভেসে ওঠে?

10 March, 2019 15:03 PM সামাজিক মাধ্যম

ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদক


মূল দাবি: রাশিয়া দক্ষিণাঞ্চলে এক শিশুর গায়ে মাঝে মাঝেই কোরআনের আয়াত ভেসে উঠছে।

বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যমে এমন একটি খবর এবং ভিডিও হাজার হাজার মানুষ শেয়ার করছেন। অখ্যাত কিছু অনলাইন পোর্টাল এ নিয়ে খবর প্রকাশ করেছে গতকাল এবং আজ রোববার (১০ মার্চ)।

দেখুন কিছু স্ক্রিনশট--

ফেসবুক পোস্ট--


ছড়ানো পুরো খবরটি দেখতে পারেন নিচে স্ক্রিনশটে--


সংবাদের সূত্র:

বাংলাদেশে এই খবরটি আজকে ছড়ালেও (যদিও কয়েক বছর আগেও একবার ছড়িয়েছিল), ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে এটি ২০০৯ সালের একটি ঘটনা, অর্থাৎ এখন থেকে ১০ বছর আগের।

ওই সময় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এ নিয়ে প্রতিবেদন করেছে। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল--

বার্তা সংস্থা রয়টার্স: "Miracle" baby gives hope in Russian Muslim south

দ্য গার্ডিয়ান: A miracle baby in Dagestan (মতামত)

দ্য টেলিগ্রাফ: Koran verses 'appear' on skin of miracle Russian baby

রাশিয়া টুডে (আরটি): “Signs of Allah” appear on infant’s skin

এবিসি নিউজ: Koran Verses Appear Mysteriously on Infant's Body

নিউইয়র্ক টাইমস: Village Miracle’s Glow Dims Under an Ex-Spy’s Glare


কী বলেছে এসব সংবাদমাধ্যম?

উপরিউক্ত কোনো সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টেই বাচ্চাটির গায়ে কুরআনের আয়াত 'ভেসে ওঠা'র বা 'আয়াত দেখা যাওয়া'র ঘটনাটিকে একেবারে 'গুজব' বা 'ভুয়া খবর' বলে দাবি করা হয়নি। তবে অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম এটাকে 'আলৌকিক' কিছু না হিসেবে দেখিয়েছে।

দ্য গার্ডিয়ানে নিজের মতামত কলামে (A miracle baby in Dagestan) Andrew Brown নামের একজন লেখক বাচ্চার শরীরে এমন লেখা ভেসে ওঠার বিষয়টির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, বাচ্চাদের গায়ে এক ধরনের ফুসকুড়ি উঠতে পারে। ওই সময়টাতে গায়ে কিছু দিয়ে চাপ দিলে তার চিহ্ন অনেক্ষণ স্থায়ী হয়। তখন আঙ্গুল বা কিছু দিয়ে চাইলে অনেক কিছু গায়ে লেখা সম্ভব। বিষয়টিকে মেডিকেলের ভাষায় "dermographic urticaria" বলা হয়। দেখুন তার লেখার স্ক্রিনশট--



Andrew Brown ঘটনাটিকে 'আলৌকিক' হিসেবে প্রচার করারকে 'গুজব' হিসেবে অভিহিত করেছেন। বরং তিনি মনে করেন, বাচ্চার মা-বাবাই সম্ভবত তার গায়ে এসব বাক্য লিখে রাখেন।

রাশিয়া টুডে রুশ চিকিৎসকদের উদ্ধৃতি দিয়ে dermographic urticaria এর কথা-ই উল্লেখ করেছে বাচ্চাটির শরীরের এমন অবস্থার জন্য। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ৪/৫ শতাংশ মানুষের মধ্যে এমন ডিসঅর্ডার দেখা যায়।

রয়টার্স তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করেছে বাচ্চাটিকে দেখতে যাওয়া বিদেশি সাংবাদিকরা তার শরীরে একটি অক্ষর লেখা দেখতে পেয়েছেন।

সাংবাদিকদেরকে স্থানীয় ধর্মীয় নেতারা জানিয়েছেন, ওই সপ্তাহে বাচ্চাটির গায়ে ভেসে ওঠেছিল যে বাক্যটি তার অর্থ হচ্ছে, 'আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হও'। ওই নির্দিষ্ট দিন সাংবাদিকরা পৌঁছার আগে বাক্যটির অন্যান্য অক্ষর বিলিন হয়ে যায়; তবে সাংবাদিকরা একটি অক্ষর দেখতে পেয়েছেন।

রয়টার্স Moscow State University of International Relations এর Caucasus Research Centre এর তৎকালীন উপ পরিচালক Vladimir Zakharov এর সাথে কথা বলে ঘটনাটির ব্যাপারে জানতে। তিনি জানান, এর সত্যমিথ্যা যাচাইয়ের মতো অবস্থায় তিনি নেই। তবে তিনি মন্তব্য করেন, 'এটা পরিষ্কার যে (স্থানীয় মানুষের) এসব দাবি মানুষের হতাশার প্রতিফলন। উত্তর ককেশাসে মানুষের চিন্তাভাবনায় এখন শুধু ইসলাম এবং সন্ত্রাসবাদ। তারা সম্ভব এই বাস্তবতা থেকে একটু পালাতেই এমন দাবিকে আকড়ে ধরেছেন।'

Vladimir Zakharov তৎকালীন ককেশাসে জঙ্গিবাদের উত্থান এবং নিয়মিত মানুষ হতাহত হওয়ার বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করে মন্তব্যটি করেছেন।

সিদ্ধান্ত:

বাচ্চার গায়ে কুরআনের আয়াত আরবী টেক্সট দেখা যাওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সূত্রে নিশ্চিত। তবে সেই লেখা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেসে ওঠে, নাকি তার গায়ে কেউ লিখে দেয়, অথবা এটি কোনো ধরনের রোগ কিনা (যেমন dermographic urticaria ) সে বিষয়ে সংবাদমাধ্যম ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দ্বিমত দেখা যাচ্ছে। কারণ, তখন পর্যন্ত বাচ্চাটির শরীরে কোনো ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষা করতে বাধা দিয়েছেন বাবা-মা। পরে তার একটি স্বাস্থ্যগত পরীক্ষা হওয়ার কথা রাশিয়া টুডের অন্য একটি রিপোর্টে পাওয়া গেলেও সেই পরীক্ষা আদৌ হয়েছিল কিন, বা হলে তার ফলাফল কী তা পাওয়া যায়নি।

Related Post