ফ্যাক্টচেক: বস্তা থেকে উদ্ধার করা ব্যালটগুলো কি সাদা-কালো রঙের?

11 March, 2019 15:03 PM সামাজিক মাধ্যম

কদরুদ্দীন শিশির

আজ সোমবার ডাকসুর ভোট গ্রহণ শুরু হয় সকাল ৮টা থেকে। কিছুক্ষণের মধ্যে সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও ও ছবি ছড়াতে থাকে; যাতে দেখা যায় বস্তা থেকে ব্যালট পেপার বের করে সাংবাদিকদের দেখাচ্ছেন ছাত্রছাত্রীরা। তারা সাংবাদিকদেরক কাছে দাবি করছেন, এগুলো কুয়েত মৈত্রী হল (ছাত্রী হল) থেকে তারা উদ্ধার করেছেন। ব্যালটগুলোতে ছাত্রলীগের প্যানেলের প্রার্থীদের নামের পাশে সিল মারা দেখা যাচ্ছে।

এরপর সংবাদমাধ্যমে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, উদ্ধারকৃত ব্যালটগুলোতে ছাত্রলীগের প্যানেলের প্রার্থীদের নামের পাশে সিল মারা ছিল। নিচে দেখুন যুগান্তরের রিপোর্ট--


এ বিষয়ে বাংলাট্রিবিউনের রিপোর্ট--

এবার দেখুন ছাত্রলীগের প্রচারণা পোস্টারে তাদের প্যানেলের প্রার্থীদের নাম। ব্যালটে যেসব নামের পাশে ক্রস চিহ্ন দেয়া (সিল মারা) সেগুলোর সাথে ছাত্রলীগ কুয়েত মৈত্রী হলের ছাত্রলীগে প্যানেলের নাম হুবহু মিলে যায়--


কুয়েত মৈত্রী হলের উদ্ধারকৃত ব্যালেটগুলোর যেসব ছবি সংবাদমাধ্যমে এসেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, সেগুলো রঙিন ব্যালট পেপার। যেমন বিডিনিউজের ছবি দেখুন--


বাংলাদেশ প্রতিদিনে আসা ছবিতেও দেখা যাচ্ছে ব্যালটগুলো রঙিন। দেখুন ছবিতে--

ব্যালট উদ্ধারের ঘটনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়ার জন্য বিডিনিউজের প্রতিবেদন থেকে একটি অংশ উল্লেখ করছি এখানে--

"হল সংসদ নির্বাচনের বিপুল পরিমাণ ব্যালট দেখিয়ে শিক্ষার্থীরা সাংবাদিকদের বলেন, আগের রাতেই এসব ব্যালটে ‘ক্রস চিহ্ন’ দিয়ে ভোটের চিহ্ন দিয়ে রাখা হয়েছে। যেসব নামে ভোটের চিহ্ন দেওয়া হয়েছে সেগুলো ছাত্রলীগের হল প্যানেলের প্রার্থীদের।

কুয়েত মৈত্রী হল সংসদের ভিপি পদের স্বতন্ত্র প্রার্থী শামসুন্নাহার পলি অভিযোগ করেন, হলের মিলনায়তনের পাশে রিডিং রুমে বসে ব্যালটে ভোটের চিহ্ন দেওয়া হচ্ছিল।

“ভেতর থেকে দরজায় ছিটকিনি দিয়ে ভেতরে বসে এগুলো করছিল। ওই রুমে বসে সিল মারছিল। আমরা সাড়ে ৭টার দিকে ম্যামকে বলেছিলাম ‘ম্যাম আমরা দেখব ব্যালট বাক্স খালি কিনা। তিনি কিছুতেই দেখাবেন না। উনি বলেন, প্রক্টর স্যার এসে দেখাবেন।

“প্রক্টর স্যার এসে বললেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। সব দেখাব। এটা বলে তিনি ওই রুমে নিয়ে গিয়ে ছিটকিনি দিয়ে দিয়েছেন। আমরা দরজা ধাক্কাচ্ছি, কিছুতেই খোলে না। যখন দরজা খুললো, আমরা ভেতরে গিয়ে দেখি বস্তাভর্তি ব্যালট পেপার।”

সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে সিলমারা ব্যালটের ছবি ও খবর ছড়িয়ে পড়তে থাকলে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে 'গুজব' বলে উড়িয়ে দেয়া হয়। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক অভিযোগ করেছে, বিরোধী জোটের প্রার্থীরা একজোট হয়ে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে গুজব ছড়াচ্ছেন।

দুপুরের পর থেকে ছাত্রলীগের বিভিন্ন পেইজ ও নেতাকর্মীদের একাউন্ট থেকে প্রচার করা শুরু হয়, কুয়েত মৈত্রী বা অন্যান্য হল থেকে শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করা ব্যালটগুলো সাদা-কালো রঙের; অর্থাৎ এগুলো জাল। কারণ, ডাকসু কেন্দ্রীয় সংসদ ও হল সংসদের ব্যালটগুলো রঙিন (আংশিক)।

ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা তাদের দাবির পক্ষে 'প্রমাণ' হিসেবে হল সংসদের একটি ব্যালটের ছবির সাথে কেন্দ্রীয় সংসদের একটি ব্যালটের ছবির তুলনা করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। তুলনামূলক পোস্টগুলোতে হল সংসদের ব্যালটের ছবিটিকে 'সাদা-কালো' বলে মনে হচ্ছে। এরকম একটি তুলনামূলক পোস্ট দেখুন নিচের স্ক্রিনশটে---



তবে বেশিভাগ পোস্টে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা কেন্দ্রীয় সংসদের একটি রঙিন ব্যালটের পাশে হল সংসদের ব্যালট হাতে ছাত্রীদের ছবি দিয়ে বলা হচ্ছে, 'দেখুন একটি রঙিন, অন্যগুলো সাদা-কালো'। যদিও এসব পোস্টে দুটি ব্যালটকে তুলনা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, ছাত্রীদের হাতে থাকা ব্যালটগুলোর ছবি অনেক দূরে থেকে তোলা। এত দূরে থেকে ব্যালটে থাকা সুক্ষ্ম লাল রঙের দাগগুলো ভেসে ওঠে না।

দেখুন ছাত্রলীগ কর্মীদের এমন কিছু পোস্ট---






bdfactcheck.com এর বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ছাত্রলীগ কর্মীদের দাবিটি অসত্য। অর্থাৎ, শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করা বস্তাভর্তি ব্যালটগুলো সাদা-কালো রঙের নয়। বরং সেগুলো রঙিন, এবং সেই রঙিন ব্যালটেই ছাত্রলীগের প্যানেলের প্রার্থীদের নামের পাশে সিল দেয়া।

ছাত্রলীগ কর্মীদের যে পোস্টটিতে (উপরে উল্লেখ করা) দেখা যাচ্ছে পাশাপাশি রাখা দুটি ব্যালটের মধ্যে একটি (কেন্দ্রীয় সংসদের) রঙিন, এবং অন্যটি (কুয়েত মৈত্রী হল সংসদের) সাদা-কালো। এই ব্যালটটি সাদা-কালো কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে আমরা দেখাতে চাই কুয়েত মৈত্রী থেকে উদ্ধার ব্যালটগুলো যে রঙিন ছিল তার প্রমাণ আসলেই আছে কিনা?

আছে।

উপরে আমরা দেখিয়েছি সংবাদমাধ্যমে আসা উদ্ধারকৃত রঙিন ব্যালটের ছবি। এবার সামাজিক মাধ্যমে কিছু ভিডিও ও ছবি বিশ্লেষণ করে দেখবো

নিচের ছবিটি দেখুন। হলের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন ছাত্রীরা। তাদের হাতেই আছে উদ্ধার করা বস্তাটি। এবং সেই বস্তা থেকে বের করে সাংবাদিকদেরকে দেখানো ব্যালটগুলোর দিকে তাকান (সবুজ চিহ্নিত অংশ)। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, লাল টেক্সট রয়েছে।



হল সংসদে আজকে যে ব্যালট পেপারে ভোট গ্রহণ করা হয়েছে তার একটি স্যাম্পল ক্যাম্পাসে দায়িত্ব পালন করা একজন সাংবাদিকের মাধ্যমে সংগ্রহ করেছে bdfactcheck.com. ছবিটি দেখুন নিচে--


(এখানে উল্লেখ্য, সব হল সংসদের ব্যালট পেপার একই রকম। শুধু প্রার্থীদের নাম ভিন্ন)

এবার কুয়েত মৈত্রী হল থেকে উদ্ধার করা একটি ব্যালটের হাই-রেজুলেশন ছবি দেখুন। এবং মিলিয়ে নিন মুহসিন হল থেকে bdfactcheck.com এর সংগ্রহ করা আজকের ব্যালটের সাথে (যেটিতে ভোটগ্রহণ হয়েছে)।

দেখা যাচ্ছে, প্রার্থীদের নাম ছাড়া বাকি ডিজাইন এবং টেক্সটের রঙ একই রকম। এ থেকে আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে, আজ কুয়েত মৈত্রী হলে যে রঙিন ব্যালট পেপারে ভোট গ্রহণ করা হয়েছে সেই একই রঙিন ব্যালট পেপার ওই হলে ভোট শুরুর আগে শিক্ষার্থীরা বস্তা থেকে উদ্ধার করেছেন। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ছবি ও ভিডিও থেকে এটি স্পষ্ট।

এবার আগের প্রশ্নটি উত্তর দেয়া যায়। ছাত্রলীগ কর্মীরা একটি পোস্টে কুয়েত মৈত্রী হলের যে সাদা-কালো ব্যালট পেপারটি দেখালেন সেটি সাদা-কালো কেন?

এর প্রথম উত্তর হচ্ছে, লো-রেজুলেশনের যে কোনো ছবিতে ব্যালট পেপারের টেক্সট ও রেখাগুলোর লাল রঙটি স্পষ্টভাবে বুঝা যায় না। যেমন দেখুন নিচের ছবিটি--

উপরের ছবিটিতে ডাকসু কেন্দ্রীয় সংসদে জিএস পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী আসিফুর রহমান সাংবাদিকদেরকে কয়েকটি ব্যালট দেখাচ্ছিলেন ভিডিও দেখতে পারেন এই লিংকে। পাশাপাশি সাজানো তিনটি স্ক্রিনশটের প্রথম দুটিতে লাল অ্যারো চিহ্নগুলোর মধ্যবর্তী জায়গাটি খেয়াল করুন। সেখানে অস্পষ্টভাবে লাল রঙের টেক্সটের লাইনগুলো বুঝা যাচ্ছে। কিন্তু লাল রেখাগুলোর রঙ স্পষ্ট হচ্ছে না। আর ৩ নং স্ক্রিনশটটি খেয়াল করুন। সেখানে রেজুলেশন আরেকটু কম হওয়ায় উপরের টেক্সটের লাল রঙটিও আর বুঝা যাচ্ছে না। পুরো ব্যালটটিকে সাদাকালো মনে হচ্ছে।

ছাত্রলীগ কর্মীদের পোস্টে খুবই লো-রেজুলেশনের (টেক্সটগুলোও ঠিক মতো পড়া যাচ্ছে না) একটি ছবিতে দেখানো হয়েছে, ব্যালটটি সাদা-কালো। কোথাও হাই-রেজুলেশনের কোনো ছবিতে ‘সাদা-কালো ব্যালট’ দেখাতে পারেনি কেউ।

লো-রেজুলেশনের ছবিতে যে রঙিন ব্যালট পেপারটিকে সাদা-কালোর মতো দেখায় তার আরও একটি উদাহরণ দেয়া যায়। দেখুন নিচের ছবিটি--

এখানে ছাত্রীটির হাতে ব্যালটগুলোকে সাদা-কালো বলে মনে হচ্ছে, সেই একই ছাত্রীর হাতে ব্যালটের হাই-রেজুলেশন ছবিতে একই ব্যালট পেপারকে রঙিন দেখাচ্ছে। দেখুন বাংলাদেশ প্রতিদিনের তোলা নিচের ছবিটি--

একই ছাত্রীকে অন্যদের সাথে রঙিন ব্যালট পেপারসহ দেখা যাচ্ছে অন্য আরেকটি ছবিতেও। উপরের ছবিটি একবার দেয়া হলেও এখানে আবারও দেয়া হচ্ছে--

দ্বিতীয়ত, কোনো রঙিন ছবিকে চাইলেই সফটওয়ার দিয়ে সাদা-কালো করা যায়। স্মার্টফোনে এমনটা খুবই সহজে করা যায়। নিচের ছবিতে পাশাপাশি দেখা যেতে পারে ছাত্রলীগের দাবি করা কথিত সাদা-কালো ব্যালট ও শিক্ষার্থীদের দেখানো রঙিন ব্যালটটি--


তৃতীয়ত, আবার এমনও হতে পারে যে, কেউ উদ্ধার করা রঙিন কিছু ব্যালট পেপার ফটোকপি করে প্রচার করেছে অথবা ফটোকপির ছবি তুলে ফেসবুকে ছড়িয়েছে।

কিন্তু একটি বা কিছু ব্যালট পেপারকে ফটোকপি করে প্রচার করলেও উপরের প্রমাণাদি থেকে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে যে, বস্তা থেকে উদ্ধার করা ব্যালট পেপারগুলো রঙিন ছিল, এবং একই রকম ব্যালট পেপারে আজ হল গুলোতে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সর্বশেষ আরও কয়েকটি ছবি এবং ভিডিও থেকে আমরা ব্যালট পেপারগুলো দেখার চেষ্টা করতে পারি- আদৌ সেগুলো সাদা-কালো নাকি রঙিন ব্যালট?


সিদ্ধান্ত:

উপরের বিশ্লেষণের পর আমাদের সিদ্ধান্ত হল- উদ্ধার করা বস্তাভর্তি ব্যালটগুলোকে ‘সাদা-কালো রঙের’ বলে যে দাবি ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের অনেকে করছেন তা ভুয়া।

Related Post