নাইজেরিয়ার Daily Leadership পত্রিকার দুটি রিপোর্টের ফ্যাক্টচেক

15 April, 2019 14:04 PM গণমাধ্যম

কদরুদ্দীন শিশির

প্রথম আলোর আজ সোমবারের (১৫ এপ্রিল) একটি রিপোর্টের শিরোনাম, "শেখ হাসিনা সেরা ৫ নীতিমান নেতার একজন" দেখুন স্ক্রিনশটে--

প্রথম আলো লিখেছে--

"প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বের অন্যতম নীতিমান নেতা। নাইজেরিয়ার প্রভাবশালী সংবাদপত্র দ্য ডেইলি লিডারশিপ বলেছে, বিশ্বের সেরা পাঁচ নীতিমান নেতার মধ্যে একজন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নাইজেরিয়ার বাংলাদেশ হাইকমিশন এমনটাই জানিয়েছেন বলে গতকাল রোববার বার্তা সংস্থা ইউএনবির খবরে বলা হয়েছে।"

প্রথম আলো বার্তা সংস্থা ইউএনবি'র বরাতে খবরটি প্রকাশ করলেও শিরোনামটি নিজেদের মতো করে দিয়েছে। ইউএনবির শিরোনাম ছিল, "সবচেয়ে সংযমী ৫ বিশ্বনেতার একজন শেখ হাসিনা: নাইজেরিয়ান পত্রিকা" 

বাংলাদেশের মূলধারা অনেক সংবাদমাধ্যমে খবরটি প্রকাশিত হয়েছে। যেমন-

দৈনিক ইত্তেফাক: সবচেয়ে সংযমী ৫ বিশ্বনেতার একজন শেখ হাসিনা: নাইজেরিয়ান পত্রিকা

জাগোনিউজ: শেখ হাসিনা বিশ্বের সেরা ৫ নীতিমান নেতার একজন

পরিবর্তন ডটকম: সবচেয়ে সংযমী ৫ বিশ্বনেতার একজন শেখ হাসিনা: নাইজেরিয়ান পত্রিকা

খবরটির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য bdfactcheck এর ফেসবুক পেইজের ইনবক্সে কয়েকজন পাঠক অনুরোধ করেন। এর প্রেক্ষিতে নাইজেরিয়ার the Daily Leadership পত্রিকা এবং তাদের রিপোর্টের ব্যাপারে অনুসন্ধান চালায় bdfactcheck.

ইন্টারনেট ঘেঁটে পাওয়া যায়, গত বছরের নভেম্বরেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে (এবং অন্য আরও ৪ দেশের নেতাকে) নিয়ে রিপোর্টা বা ফিচার প্রকাশ করেছিল the Daily Leadership পত্রিকা। তখন এ নিয়ে বাংলাদেশের কয়েকটি সংবাদমাধ্যম খবরও প্রকাশ করে।

তখনও প্রধান সূত্র ছিল বার্তা সংস্থা ইউএনবি। গত বছরের ১৯ নভেম্বর ইউএনবির একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, "Hasina’s humility admired in Nigeria". দেখুন স্ক্রিনশট--


ইউএনবি'র তখনকার প্রতিবেদনটি এখানে হুবহু তুলে ধরছি--

"Dhaka, Nov 18 (UNB) - Daily Leadership, one of the most influential Nigerian dailies on Sunday mentioned Prime Minister Sheikh Hasina as one of the world leaders with humble lifestyles.

The daily carried a feature story in its “Unreported" section only on five world leaders titled "World Leaders With Humble Lifestyles," said Bangladesh High Commissioner to Nigeria M Shameem Ahsan.

It specially mentioned about her modest monthly salary (US$ 800 equivalent to Nigerian Naira 288000) while referring to Forbes’s list of the “World’s Hundred Most Powerful Women” in which Prime Minister was ranked at 59, he said.

“Two of the most outstanding achievements of Sheikh Hasina are her leadership roles and success behind the trials of Bangabandhu killers and the persons who committed crimes against humanity in 1971,” the prestigious daily pointedly mentioned.

As a part of public diplomacy drive, the High Commissioner recently visited some media houses in Nigeria in recent months including the Office of the Daily Leadership.

Dele Fanimo, Chief Operating Officer(COO) of the Daily assured to work closely with the Bangladesh High Commission to create greater understanding between the peoples of the two friendly countries."

এই রিপোর্টের সাথে ইউএনবি Daily Leadership এর প্রতিবেদনের একটি ছবিও প্রকাশ করে; সেটি দেখুন নিচের স্ক্রিনশটে। ইউএনবির তখনকার রিপোর্ট পড়তে ক্লিক করুন এখানে

কালের কণ্ঠ পত্রিকা ইউএনবির রিপোর্টের বাংলা ভার্সন প্রকাশ করে (যদিও ক্রেডিট দেয়া ছাড়াই)। কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট দেখুন--


লক্ষ্যণীয় হল, গত বছরের ১৮ নভেম্বর the Daily Leadership এর প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিলো "World Leaders With Humble Lifestyles." (সাধাসিধে জীবনযাপনকারী বিশ্বনেতারা)

আর এ বছরের ১৪ এপ্রিল একই পত্রিকার আরেকটি শিরোনাম ছিলো, "World’s Most Austere Presidents". (বিশ্বের সবচেয়ে মিতব্যয়ী প্রেসিডেন্টরা)।

(দ্বিতীয় শিরোনামে Presidents শব্দ ব্যবহার করা হলেও বাস্তবে এদের মধ্যে তিনজন কখনো প্রেসিডেন্ট ছিলেন না। তারা হলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ডাচ প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুট এবং নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালা।)

মজার বিষয় হলো, প্রায় ছয় মাসের ব্যবধানে প্রকাশিত দুটি রিপোর্টের শিরোনাম ভিন্ন হলেও ভেতরে পুরো রিপোর্ট দুটি হুবহু এক!

অর্থাৎ, ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসের ১৮ তারিখ "world leaders with humble lifestyle" শিরোনামে ওই দিনের পত্রিকার ৬৫ পৃষ্ঠায় “Unreported" বিভাগে যে ফিচারটি প্রকাশ করেছিল the Daily Leadership, ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসের ১৪ তারিখ একই ফিচার একই বিভাগে (এবার ৬৭ তম পৃষ্ঠায়) প্রকাশ করা হয়েছে ভিন্ন শিরোনামে! আগের ফিচার যে ৫ জন ব্যক্তিকে নিয়ে করা হয়েছিল সেই ব্যক্তিদের ছবিগুলো একটু বদলে নতুন শিরোনাম দেয়া হয়, "World’s Most Austere Presidents". বা বিশ্বের সবচেয়ে মিতব্যয়ী প্রেসিডেন্টরা।

খুবই কষ্টকর ও সময় নষ্ট হলেও bdfactcheck গত বছর ও এ বছরের রিপোর্ট দুটির পুরো টেক্সট (ম্যাগনিফায়ার দিয়ে) মিলিয়ে দেখেছে। তাতে শিরোনাম ছাড়া উভয় রিপোর্টের ভেতরটা হুবহু মিল পাওয়া গেছে।

যে কেউ ফটোশোপ বা এ ধরনের কোনো সফটওয়ারে ফেলেও জুম-ইন করে রিপোর্ট দুটিকে তুলনা করে দেখতে পারেন। সেক্ষেত্রে ইউএনবি'র প্রকাশ করা গত বছরের রিপোর্টের ছবিটি নিতে পারেন এখান থেকে। এটি তুলনামূলক হাই-রেজুলেশন।

The Daily Leadership এর ওয়েবসাইটের আর্কাইভে গত বছরের ১৮ নভেম্বরের রিপোর্টটি খুঁজে পায়নি bdfactcheck। 'সার্চ' বাটনে আগের রিপোর্টের শিরোনাম খুঁজেও কোনো ফল আসেনি। এ কারণে ইউএনবি'র রিপোর্টে প্রকাশিত ছবির ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।

আর ১৪ এপ্রিলের রিপোর্টটি The Daily Leadership এর ওয়েসবাইটেই পাওয়া যাচ্ছে। দেখুন এই লিংকে

গত বছরের এবং এ বছরের ফিচার দুটিতেই ৫ জন নেতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

"World Leaders With Humble Lifestyles." (সাধাসিধে জীবনযাপনকারী বিশ্বনেতারা) শীর্ষক প্রতিবেদনে গত বছর ৫ জন নেতার নাম উল্লেখ করা হয়। ক্রমানুসারে তারা হলেন-- উরুগুয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসে মুজিকা, মালাওয়ী প্রেসিডেন্ট জয়সে বান্দা, নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালা, বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং নেদারল্যান্ডসের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুট।

আবার "World’s Most Austere Presidents". (বিশ্বের সবচেয়ে মিতব্যয়ী প্রেসিডেন্টরা) হিসেবে গতকাল ১৪ এপ্রিল এই ৫ ব্যক্তির নামই উল্লেখ করা হয়েছে (যদিও তাদের ৩জনই কখনো তাদের দেশের প্রসিডেন্ট ছিলেন না!)। দুটি রিপোর্টেই এই ৫ নেতার নামের সিরিয়ালও একই রাখা হয়েছে। প্রথমে হোসে মুজিকা, তারপর জয়সে বান্দা, তারপর সুশীল কৈরালা, শেখ হাসিনা এবং মার্ক রুট।


দেখুন দুটির স্ক্রিনশট--


পাঠকের বুঝার সুবিধার্থে আমরা এখানে দুটি রিপোর্টের ভেতরের টেক্সট কিভাবে হুবহু এক- তা দুটি উদাহরণ দিয়ে তুলে ধরছি--

Jose Mujica কে নিয়ে ১৪ এপ্রিলের রিপোর্টে লেখা প্রথম বাক্যটি হলো, "Uruguay's former President, Jose "Pepe" Mujica, was dubbed the "world's poorest president" for good reason.

তাকে নিয়ে ১৪ এপ্রিলের রিপোর্টের শেষ লাইনটি হচ্ছে, ‍"Although Mujica left politics earlier this year, his almost mystical reputation as a political leader remains-- and we suspect will linger for a while"

২০১৮ সালের ১৮ নভেম্বরের রিপোর্টেও শুরুতে ও শেষে একই বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে। বাকিটুকুও একইভাবে হুবহু মিলে যায়।

এখানে আরেকটি লক্ষ্যণীয় বিষয়, ২০১৮ সালে ফিচারেও বলা হয়েছে 'Although Mujica left politics earlier this year' ("যদিও মুজিকা এর আগে চলতি বছরে রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছেন...") এবং ২০১৯ সালের ফিচারেও একই বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে।

এই 'চলতি বছর'টি প্রকৃতপক্ষে ২০১৮ সাল। ওই বছরের আগস্ট মাসে মুজিকা রাজনীতি থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। ২০১৯ সালে এসে 'চলতি বছর রাজনীতি ছেড়ে দেন' বলাটা ভুল তথ্য। এই ধরনের ভুল তথ্যও সংশোধন না করে নতুন করে প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে "প্রভাবশালী" ও "মর্যাদাপূর্ণ" বলে পরিচিতি পাওয়া নাইজেরিয়ান পত্রিকাটি।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে ১৪ এপ্রিলের ফিচারে লেখা প্রথম দুটি বাক্য হলো-- "Sheikh Hasina, the Prime Minister of Bangladesh, is said to have a monthly salary of $800 (about N288000). Sheikh Hasina is ranked no. 59 in Forbes' list of the 'World's 100 Most Powerful Women'."

এবং শেষের বাক্যটি হলো-- "Two of the most outstanding achievements of Sheikh Hasina are her leadership-roles and success behind the trials of Bangabandhu killers and the persons who committed crimes against humanity in 1971."

একইভাবে শুরু এবং শেষ করা হয়েছে আগের বছরের ফিচারে থাকা শেখ হাসিনাকে নিয়ে লেখা অংশটুকু। শেখ হাসিনাকে নিয়ে বাকি টেক্সটও দুই বছরের ফিচারে হুবহু এক।


দূতাবাস সংযোগ:

গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসের ১৩ তারিখ ইউএনবি'র একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, "Nigerian newspaper wants to project Bangladesh positively". অর্থাৎ, "বাংলাদেশকে ইতিবাচকভাবে দেখাতে চায় নাইজেরিয়ান পত্রিকা"।

নাইজেরিয়ায় বাংলাদেশি হাইকমিশনার Md Shameem Ahsan দ্য ডেইলি লিডারশিপের অফিসে যান এবং তার সাথে সাক্ষাতের সময় লিডারশিপের Chief Operating Officer (COO) Bamidele Fanimo উপরিউক্ত মন্তব্য (বাংলাদেশকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরার ইচ্ছা) করেন। হাইকমিশনারের সাক্ষাতের দুই মাস পর "World Leaders With Humble Lifestyles." (সাধাসিধে জীবনযাপনকারী বিশ্বনেতারা) শিরোনামের রিপোর্টটি প্রকাশ করে ডেইলি লিডারশিপ; যেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামও ইতিবাচকভাবে অন্তর্ভূক্ত ছিল।

নাইজেরিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের ওয়েবসাইটে লিডারশিপের কর্তকর্তার সাথে বৈঠকরত হাইকমিশনার শামীম আহসান। ছবি দেখুন--


আমাদের মন্তব্য:

প্রথমত-
আজ প্রথম আলো প্রকাশিত ইউএনবি'র রিপোর্ট "শেখ হাসিনা সেরা ৫ নীতিমান নেতার একজন" রিপোর্টটিকে ফেইক নিউজ বা ভুয়া খবর বলা যাচ্ছে না। কারণ, এটি যে সূত্রের বরাতে (দ্য ডেইলি লিডারশিপ নামক পত্রিকা) বাংলাদেশে প্রকাশ করা হয়েছে সেই সূত্রে সংবাদটির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

দ্বিতীয়ত-
কোনো সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ইস্যুতে কোনো দেশের বা বিশ্বনেতাদের র্যাংকিং করা বা এক বা একাধিকজনকে নিয়ে ফিচার প্রকাশ করা অস্বাভাবিক কোনো অনুশীলন নয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এমনটি করে থাকে।

তৃতীয়ত-
তবে একই রিপোর্ট দুই সময়ে দুই শিরোনামে প্রকাশ করা, বিভিন্ন তথ্যগত ভুল, এবং পত্রিকা কর্তৃপক্ষের সাথে সরকারি সংযোগ থাকার বিষয়গুলো আলোচ্য দুটি রিপোর্টকে বিতর্কিত এবং উদ্দেশ্যমূলক হিসেবে অভিযুক্ত করতে যথেষ্ট।

চতুর্থত-
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে যেভাবে 'প্রভাবশালী' ও 'মর্যাদাপূর্ণ' বলেআলোচ্য দ্য ডেইলি লিডারশিপ পত্রিকাকে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা উপরিউক্ত তৃতীয় কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

Related Post