‘শীঘ্রই আসছে’: বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গে হামলার হুমকি দেয়নি আইএস

27 April, 2019 11:04 AM গণমাধ্যম

কদরুদ্দীন শিশির

বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় প্রায় সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে, ‘শীঘ্রই আসছি’ বলে ‘বাংলাদেশে হামলার পরিকল্পনা করছে আইএস!’

বাংলাদেশি কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে এ সংক্রান্ত খবরটি দেখুন:

ডেইলি স্টার: আইএসের পোস্টারে বাংলায় লেখা ‘শীঘ্রই আসছে’

বাংলাট্রিবিউন: ‘শিগগিরই আসছি’, বাংলাদেশকে আইএস-এর হুমকি?

ইত্তেফাক: বাংলাদেশে হামলার পরিকল্পনা করছে আইএস!

সবার প্রকাশ করা খবরটির একমাত্র উৎস হলো টাইমস অব ইন্ডিয়া। ভারত সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনের শিরোনাম হলো 'Coming soon', says Islamic State poster in Bengali.

একই খবর প্রকাশ করেছে ভারতীয় আরেক সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে। তাদের শিরোনাম হলো, “Coming soon: IS poster in Bengali hints at attack days after Sri Lanka serial blasts”.

স্ক্রিনশট দেখুন-



Times of Inida এর প্রতিবেদনের প্রথম দুটি প্যারায় বলা হয়েছে, “Indicating that Islamic State could be planning an attack in Bangladesh or West Bengal, a pro-IS Telegram channel has released a poster in Bengali saying “Coming Soon”. Sources in an intelligence agency confirmed that such a poster was in circulation and that it was being looked into.”

The poster, released on Thursday night, reads “Shighroi Aschhe (coming soon), Inshallah..” and has the logo of a group called al Mursalat. Agencies have taken the poster seriously as the IS has just carried out deadly serial blasts in Sri Lanka through local outfit Tawheed Jamaat.

টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কথিত আইএস সংশ্লিষ্ট টেলিগ্রাম একাউন্ট থেকে ছড়ানো পোস্টারে শুধু বলা হয়েছে, “শীঘ্রই আসছি.. ইনশাআল্লাহ”। এছাড়া আরেকটি তথ্য দেয়া হয়েছে- পোস্টারটিতে al Mursalat নামে একটি গ্রুপের লোগো রয়েছে। (লক্ষ্যণীয় হল, “শীঘ্রই আসছি.. ইনশাআল্লাহ” বলে কোথায়, বা কী উদ্দেশ্যে আসার কথা বুঝানো হয়েছে তার কোনো উল্লেখ ওই পোস্টারে নেই।)

(এখানে আরও লক্ষ্যণীয়, ভারতীয় পত্রিকাগুলো পোস্টারের কোনো ছবি প্রকাশ করেনি, এবং তারা দাবি করেছে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে তারা এসব তথ্য পেয়েছে)।

এইটুকু তথ্য পেয়েই টাইমস অব ইন্ডিয়ার রিপোর্টার স্বপ্রণোদিত হয়ে আরও কিছু তথ্য নিজে নিজে উৎপাদন করেছেন। সেগুলো এরকম--

“আলোচ্য টেলিগ্রাম একাউন্টটি আইএস সংশ্লিষ্ট, আর সেটি থেকে ছড়ানো হচ্ছে, “শীঘ্রই আসছি.. ইনশাআল্লাহ”। তার মানে, তারা ‘হামলা করার জন্যই আসছে’। আর যেহেতু বাংলায় লেখা হয়েছে, তাহলে অবশ্যই উদ্দিষ্ট পাঠক হিসেবে বাংলাদেশ কিম্বা পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে বুঝা যাচ্ছে, আইএস পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলাদেশে হামলার জন্যই ‘শীঘ্রই আসছে’!”

টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন দেখেই যাচাই বাছাই ছাড়াই অতিউৎসাহে সংবাদটি কপিপেস্ট বা অনুবাদ করেছে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম। অনুবাদ করতে গিয়ে অনেকে টাইমস অব ইন্ডিয়ার তথ্যকেও বিকৃত করেছে! যেমন টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে ‌'Bangladesh or West Bengal'. অর্থাৎ, হামলাটি বাংলাদেশ অথবা পশ্চিমবঙ্গে হতে পারে। (পোস্টারটি বাংলা ভাষায় হওয়ায় বাংলাভাষী এই দুই অঞ্চলকে সম্ভাব্য টার্গেট হিসেবে কল্পনা করেছে ভারতীয় পত্রিকাটি)।

কিন্তু অনুবাদের সময় বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যম লিখেছে ‘বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে’ (হামলার হুমকি)। দেখুন স্ক্রিনশট--

দ্বিতীয়ত আরেকটি সুক্ষ্ম ভুল করেছে ভারত ও বাংলাদেশের বাংলাভাষী সংবাদমাধ্যমগুলো। টাইমস অব ইন্ডিয়া আইএসের বাংলা লেখাটিকে রোমান হরফে লিখেছে এভাবে- “Shighroi Aschhe...”.

রোমান হরফে বাংলা লেখার নিয়ম যারা জানেন তারা বুঝার কথা, এটি বাংলায় লিখলে হবে ‘শীঘ্রই আসছে’। কিন্তু অনেক বাংলাভাষী সংবাদমাধ্যম শিরোনাম করেছে, “শিঘ্রই আসছি’। ‘আসছে’ ও ‘আসছি’ এর এই সুক্ষ্ম পার্থক্যটিই প্রকৃতপক্ষে এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে ওঠেছে।

টেলিগ্রামে পাওয়া আইএসের আলোচ্য পোস্টারটি দেখুন--

(সৌজন্য: সাংবাদিক তাসনীম খলিল)


অর্থাৎ, আইএস বলেছে, ‘শীঘ্রই আসছে’, ‘শিঘ্রই আসছি’ বলে নাই। 

কী ‘আসছে’?

আইএস সংশ্লিষ্ট আরেকটি টেলিগ্রাম একাউন্টের বার্তায় দেখা যাচ্ছে, ‘শীঘ্রই আসছে’ বলতে বুঝানো হয়েছে, বাংলায় অনুদিত আইএসের একটি নাশিদ (ইসলামী সংগীত) ‘শীঘ্রই আসছে’। এবং এটির অনুবাদে কাজ করেছে ‘আল মুরসালাত মিডিয়া’। এটি আইএসের অনুবাদ শাখা। তুর্কি ভাষায় আইএসের একটি সংগীত “Our Black Flag” - এটিকেই বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে এবং সেটিই ‘শীঘ্রই আসছে’ বলে স্পষ্ট বাংলা জানানো হয়েছে।

দেখুন স্ক্রিনশট-- (সৌজন্যে: সাংবাদিক তাসনীম খলিল)

 

আইএসের পক্ষ থেকে ‘আসছি’ বলার অর্থ হতো- সংগঠনটি বা তাদের সদস্যরা ‘আসছেন’। কিন্তু ‘আসছে’ বললে সংগঠনের সদস্যদের বাইরে অন্য কিছুর ‘আসা’র বার্তা দেয়ার উদ্দেশ্যও থাকতে পারে। আর বর্তমান খবরটিতে প্রকৃতপক্ষে তা-ই হয়েছে। তাদের একটি সংগীতের বাংলা ভার্সন ‘আসা’কে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু বড় বড় সংবাদমাধ্যম এই ‘সংগীতের আসা’কে ‘হামলার জন্য আসা’ হিসেবে প্রচার করছে!

Related Post