কিছু গণমাধ্যম এমনকি শিক্ষামন্ত্রী নিজে তথ্য বিকৃত করেছেন

21:12 PM শিক্ষা

জাহেদ আরমান

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ গত ২৫ ডিসেম্বর পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে কর্মরত বিসিএস সাধারণ শিক্ষা কর্মকর্তাদের ল্যাপটপ ও সনদ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঘুষ নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা নিয়ে গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন জনপরিসরে জোর আলোচনা চলছে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক এবং ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়েছে কাটছাট করা এসব বক্তব্যের ভিডিও। এর প্রেক্ষিতে টিঅাইবি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছে।  ফলে অনেকটা বাধ্য হয়ে শিক্ষামন্ত্রীকে আবার সংবাদ সম্মেলন করে তার অবস্থান পরিস্কার করতে হয়েছে।

বিডি ফ্যাক্টচেক-এর অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, গত ২৫ ডিসেম্বর শিক্ষামন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্য অনেক গণমাধ্যম খন্ডিতভাবে প্রকাশ করেছে। আবার শিক্ষামন্ত্রী গত ২৭ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলনে যে লিখিত বক্তব্য পেশ করেছেন সেখানে তার অনেক কথাই তাঁর পূর্বের বক্তব্যের সাথে মিল পাওয়া যায়নি। অতএব দেখা যাচ্ছে, এই ঘটনায় কিছু গণমাধ্যম এমনকি মন্ত্রী নিজেও তথ্যের বিকৃতি ঘটিয়েছেন।

গণমাধ্যমের তথ্য বিকৃতি:

দেখা যাক গত ২৫ ডিসেম্বর শিক্ষামন্ত্রী কী বলেছিলেন আর তা কিছু গণমাধ্যমে কীভাবে এসেছে। ভিডিওটি দেখুন।

শিক্ষামন্ত্রী তাঁর দেওয়া বক্তব্যে বলেন, “আপনার দয়া করে ভালো কাজ করবেন। আপনাদের প্রতি আমাদের অনুরোধ, আপনারা ঘুষ খাবেন, তবে সহনশীল হয়ে খাবেন। কারণ আমার ওই সাহসই নাই বলার যে আপনার ঘুষ খাইয়েন না। এটা অর্থহীন কথা হবে।” (ভিডিও, ১:৫৭-২:১০)

পরবর্তীতে অন্য কথার প্রেক্ষিতে তিনি আরও বলেন, “খালি যে অফিসার চোর তা না, মন্ত্রীরাও চোর। আমিও চোর। আমি না হয় ওইরকমই। এই জগৎটা এরকমই চলে আসছে। সবাইকে আমাদের পরিবর্তন করতে হবে।” (ভিডিও, ১১:৪০-১১৫০)

আমার দেশ অনলাইন শিক্ষামন্ত্রীকে ভুলভাবে উদ্ধৃত করেছে। আমার দেশ লিখেছে, “শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কর্মচারীদের উদ্দেশ্য করে মন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের প্রতি আমার অনুরোধ, আপনারা ঘুষ খাবেন, তবে সহনশীল হইয়া খাবেন, সহনশীল হইয়া মানে এই নয় যে আপনারা ঘুষ খাইয়েন না, এটা অর্থহীন কথা হবে।’” আমার দেশ শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য “কারণ আমার ওই সাহসই নাই বলার যে ঘুষ খাইয়েন না”-কে বিকৃত করে বলেছে, “সহনশীল হইয়া মানে এই নয় যে আপনারা ঘুষ খাইয়েন না।”

বাংলা ট্রিবিউন শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যকে বিকৃত করে লিখেছে, “ঘুষ খান, কিন্তু সহনীয় মাত্রায় খান।” উল্লেখ্য, তাঁর বক্তব্যে “সহনশীল মাত্রায় খান” এই কথাটি বলেননি।

অনেক গণমাধ্যম ২৫ ডিসেম্বরে দেওয়া শিক্ষামন্ত্রীর একই বক্তব্যে পূর্বের সাথে পরের বক্তব্য মার্জ (স্বাতন্ত্র বিলোপ করে যুক্ত হওয়া) করে প্রচার করেছে। যার ফলে অর্থের সামান্য বিকৃতি ঘটেছে। অর্থমন্ত্রী যে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে বলেছেন সেটা অনেক গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়নি।

শিক্ষামন্ত্রীর তথ্য বিকৃতি:

২৭ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “২০০৯ সালে বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত বিভিন্ন দপ্তর, অধিদপ্তর ও সংস্থাসমুহের মধ্যে ভাবমূর্তির দিক থেকে সবচেয়ে পিছিয়ে ছিল পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)।চরম দূর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, মনিটরিং দুর্বলতা ছিল দৃশ্যমান। কর্মকর্তারা ঘুষ-দুর্নীতিতে ছিল আকণ্ঠ নিমজ্জিত।এসবই ছিল পূর্ববর্তী বিএনপি-জামাত সরকারের অপশাসনের ফসল।”

শিক্ষামন্ত্রী ওই বক্তব্যে আরও বলেন, “সেসময় ডিআইই কর্মকর্তারা স্কুল-কলেজ পরিদর্শনে গিয়ে অসহায় শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে ভয় দেখিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকার ঘুষের খামগ্রহণ করার সময় বলতো এর ভাগ উপরেও দিতে হয়। তাতে শিক্ষক-কর্মচারীরা মনে করতে বাধ্য হতো-তাদের প্রদত্ত ঘুষ শুধু পরিদর্শনকারী অফিসাররাই খায় না, উর্ধ্বতন আমলারাও পায়, এমনকি মন্ত্রী হিসেবে আমিও পাই। স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষক-কর্মচারীরা মনে করতো- ‘অফিসাররা চোর, মন্ত্রীও চোর’।

শিক্ষামন্ত্রী তাঁর এই বক্তব্যে বেশকিছু তথ্যের বিকৃতি ঘটিয়েছেন।

এক। শিক্ষামন্ত্রী ২৫ ডিসেম্বর বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারদের সামনে দেওয়া বক্তব্যে যেসব দুর্নীতি ও ঘুষ গ্রহণের উদাহরণ টেনেছেন সবগুলোই এই সরকারের আমলে ঘটেছে। উদাহরণস্বরূপ, তিনি বলেন, “তিন মাসও হয়নি। আমরা যে তথ্য সংগ্রহ করলাম তাতে কী দাড়াঁলো? তিনি ওখানে গিয়ে পাঁচটা স্কুলের সাথে কন্টাক্ট করেছেন, সব কর্মচারি- পিয়ন থেকে হেড মাস্টার পর্যন্ত পুরো একমাসের বেতন তাকে দিবেন। তা না হলে খারাপ হবে।” (ভিডিও, ৬:১৫ - ৬:৩৫) শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী এই ঘুষ গ্রহণের ঘটনাটি ঘটেছে তাঁর বক্তব্য দেওয়ার মাত্র তিনমাস আগে।

দুই। শিক্ষামন্ত্রী আগের বক্তব্যে বিএনপি-জামাতের কথা একবারও মুখ দিয়ে উচ্চারণ করেননি। যদিও বিএনপি জামাত ক্ষমতায় ছিল ১১ বছর আগে। কিন্তু এই বক্তব্যে তিনি বলেন, “এসবই (ঘুষ-দুর্নীতি) ছিল পূর্ববর্তী বিএনপি-জামাত সরকারের অপশাসনের ফসল।”

তিন। আগের বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী তাঁর নিজের উদ্ধুতি দিয়েই বলেছিলেন, “খালি যে অফিসার চোর তা না, মন্ত্রীরাও চোর। আমিও চোর। আমি না হয় ওইরকমই।” কিন্তু ২৭ ডিসেম্বরের সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী যুক্ত করেন, “স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষক-কর্মচারীরা মনে করতো- ‘অফিসাররা চোর, মন্ত্রীও চোর’।” এখানে তিনি তাঁর আগের বক্তব্যটাই শিক্ষক-কর্মচারীর বক্তব্য বলে দায় এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন।

অতএব দেখা যাচ্ছে এই ঘটনায় কিছু গণমাধ্যম এমনকি মন্ত্রী নিজেও তথ্যের বিকৃতি ঘটিয়েছেন।

 

Related Post