সত্য খবরের চেয়ে ভূয়া খবর ৬ গুণ বেশি ছড়ায়: গবেষণা

22:03 PM সামাজিক মাধ্যম

কদরুদ্দীন শিশির

হোয়াইট হাউজে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটেছে। আর তাতে আহত হয়েছেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি। মুর্হূতেই খবর ছড়িয়ে পড়লো টুইটারে। সাথে সাথে মার্কিন শেয়ারবাজারে ধস। দুই মিনিটের মধ্যে ‘ডো জোন্স’ স্টক মার্কেটের সূচক নেমে গেল ১০০ পয়েন্ট। এটা তো ছিল ঘটনার শুরু মাত্র। আরও অনেক কিছু ছিল ঘটার অপেক্ষায়।

তবে ভাগ্য ভাল, বাস্তবে ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসের সেই দিনটিতে হোয়াইট হাউজে তেমন কিছু ঘটেনি। কোনো এক ব্যক্তি বার্তা সংস্থা এপির টুইটার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে ভূয়া খবরটি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।

ভূয়া খবর ছড়িয়ে পড়ার গতি এবং তার গভীর প্রভাবের এটি হচ্ছে মাত্র একটি দৃশ্যমান উদাহরণ। প্রতিনিয়ত এরকম ভূয়া খবর-তথ্যের মধ্যে আমাদের বাস করতে হচ্ছে। আমাদের জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে এর প্রভাব আমাদের উপর পড়ছে, এবং তা অবশ্যই নেতিবাচকভাবে।

ভূয়া খবরের বিস্তার, শক্তি ও প্রভাব সম্পর্কে দীর্ঘ অনুসন্ধান ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচাটুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি-এর (এমআইটি) একদল গবেষক। বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানটির গবেষণায় উঠে এসেছে এ সংক্রান্ত নানা তথ্য, যার অনেক কিছুই আগে ধারণা করা হতো না।

গত ৯ মার্চ গবেষণা প্রতিবেদনটি নামকরা বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সাইন্স’-এ প্রকাশিত হয়।

তাতে বলা হয়েছে, মিথ্যা খবর কিংবা তথ্য ছড়ানোয় শুধু টুইটার নয়, অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও সমানভাবে দায়ী। টুইটারের ঘটনাগুলো তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করায় এ নিয়ে আলোচনাটাও বেশি হয় পশ্চিমা বিশ্বে। (তবে দক্ষিণ এশিয়ায়, এবং বিশেষ করে বাংলাদেশে টুইটারের চেয়ে ফেসবুক ভূয়া তথ্য প্রচারকারীদের জন্য স্বর্গ স্বরূপ।)

গবেষণায় বলা হয়েছে , সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অন্যান্য অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষই মিথ্যা খবর কিংবা গুজব ছড়াচ্ছেন। শুধু রাজনীতি কিংবা নাগরিক তারকাদের খবর নিয়ে নয়; ব্যবসা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ সব ধরনের খবর নিয়েও গবেষণা চালানো হয়েছে।

গবেষকরা বলছেন, টুইটারে ভূয়া খবর কিংবা গুজব সঠিক খবরের চেয়ে অন্তত ৬ গুন বেশি দ্রুত ছড়ায় এবং বেশি শেয়ার হয়। যেসব নমুনা নিয়েছেন গবেষকরা তাতে দেখা গেছে, কোনো সত্য ঘটনা কদাচিৎ এক হাজার বারের বেশি শেয়ার হয়েছে। কিন্তু শীর্ষ ভূয়া খবরগুলো সব সময় লাখোবার শেয়ার হয়েছে।

গবেষক দলের একজন সদস্য ও এমআইটি’র স্লোয়ান স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক সিনান আরাল বলেন, “ভূয়া খবর ছড়ানোর জন্য রোবটা দায়ী নয়! ভাবতেই হতাশ লাগছে, আমরা সাধারণ মানুষরাই এর জন্য দায়ী।”

তিনি আরও বলেন, “ভূয়া তথ্য সঠিক তথ্যের চেয়ে বেশি ছড়ায়, দ্রুত ছড়ায় এবং অনেক বেশি প্রভাব বিস্তারকারী।”

ভূয়া খবর নিয়ে আগে যত গবেষণা হয়েছে সেগুলোর চেয়ে এমআইটির আলোচ্য গবেষণাটি অনেক বেশি বড় আকারের। গবেষকরা টুইটারের প্রতিষ্ঠার বছর ২০০৬ থেকে ২০১৭ অবধি পোস্ট করা সব সত্য ও মিথ্যা খবর কিংবা তথ্য যাচাই-বাছাই করেছেন। উৎস আমলে না নিয়ে এক লাখ ২৬ হাজার খবর কিংবা তথ্য নিয়ে কাজ করেছেন। ওই খবর কিংবা তথ্যগুলো ৩০ লাখ মানুষ ৪৫ লাখ বার পুনরায় পোস্ট দিয়েছিলেন।

গবেষণায় ছয়টি স্বাধীন ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় খবর বা তথ্যগুলোকে সত্য অথবা মিথ্য-এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। সত্যতা যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মধ্যে স্নোপস, পলিটিফ্যাক্ট, এবং ফ্যাক্টচেক ডট অর্গ উল্লেখযোগ্য। শুধু যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নয়, এ কাজে গবেষক দল টুইটারে প্রচার হওয়া ১৩ হাজারের অধিক অন্যান্য খবর তাদের শিক্ষার্থীদের দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়েছেন। যাচাইয়ে উভয় প্রক্রিয়ায় ফলাফল ছিল একই রকম।

ভূয়া খবর কেন বেশি শেয়ার হয়?

ভূয়া খবর মানুষকে সত্য খবরের চেয়ে বেশি আকর্ষণ করে। এই কথা শুনতে খারাপ লাগতে পারে, কিন্ত এটি অনেকাংশে সত্য। বিষয়টি নিয়ে আরও গভীরে অনুসন্ধান করতে গিয়ে গবেষক দল, সত্য ও মিথ্য খবরের প্রতি মানুষের আবেগ বিষয়ে কাজ করেছেন। তারা দেখতে পেয়েছেন, “ভূয়া খবর শেয়ার করার প্রবণতা মানুষের প্রবৃত্তিতেই রয়েছে।”

ভূয়া খবরের এই প্রবৃত্তিগত বিষয় উদঘাটনে কানাডার জাতীয় গবেষণা কাউন্সিল উদ্ভাবিত একটি পরিমাপ যন্ত্র ব্যবহার করেন। ধরন অনুসারে, সত্য খবর মানুষকে আশান্বিত, আনন্দ বা দুঃখ দিলেও ভূয়া খবর মানুষের ভেতরে বিস্ময় ও বিতৃষ্ণার মতো তীব্র আবেগ তৈরি করে।

ভূয়া ও সত্য দু’টি খবর:

গবেষক দল দু’টি বাণিজ্য বিষয়ক খবরের উদাহরণ তুলে ধরেন। এতে তারা দেখাতে চেয়েছেন, দুই রি-টুইট হতে কোন ধরনের খবরের কতটা সময় লাগে।

২০১৪ সালের একটি খবর:

ফ্যাশন চেইন জারা আনুভূমিক ডোরাকাটা ও সোনালী তারাসহ বাচ্চাদের একটি পায়জামা বাজারে ছাড়ে। কাউবয় শেরিফদের পরিধেয় পোশাক থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তারা পায়জামার এ নকশাটি করেছে। কিন্তু টুইটার ব্যবহারকারীরা এই নকশাকে নাজি কনসেন্ট্রেশন শিবিরের উর্দির সঙ্গে তুলনা করেছিল। স্নোপস ডটকম জানিয়েছে: খবরটি সত্য। এই খবরটি দুই শত বার রি-টুইট হতে সাড়ে সাত ঘণ্টা সময় লেগেছিল।

২০১৬ সালের আরেকটি খবর:

বিতর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে বিক্রি বাড়াতে চিক-ফিল-এ রেস্টুরেন্ট বিদ্রুপাত্নক প্রবন্ধের অংশ বিশেষ প্রকাশ করেছিল। যাতে লেখা ছিল ‘আমরা কালোদেরও পছন্দ করি না।’ স্নোপস জানিয়েছে: খবরটি মিথ্যা। এটি দুই শত বার রি-টুইট হতে সময় লেগেছিল চার ঘণ্টা ২০ মিনিটি।

করণীয় কী?

এমআইটি’র গবেষক দলটি জানিয়েছেন, “কোনটি ভূয়া এ বিষয়টি জানা-ই এ ধরনের খবর কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপ।” তারা বলেন, মানুষের চারিত্রিক ব্যবহার এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানুষের এই চারিত্রিক ব্যবহার পরিবর্তনের জন্য খবরগুলোর ধরনে পরিবর্তন আনা দরকার।

গবেষক দলের সদস্য ও টুইটারের গণমাধ্যম বিষয়ক সাবেক কর্মকর্তা দেব রায় বলেন, “শুধু মানুষের চারিত্রিক ব্যবহার পরিবর্তন করলেই হবে না; ফেসবুক, গুগল, ইউটিউব ও টুইটার, এবং গণমাধ্যম কোম্পানিগুলোকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।”

Related Post