অস্তিত্বহীন সংস্থার নামে ভূয়া খবর উৎপাদন চলছেই

08:03 AM পাবলিক ফিগার

কদরুদ্দীন শিশির

bdfactcheck.com এর আগের একাধিক অনুসন্ধানে প্রমাণসহ দেখানো হয়েছে যে, “পিপলস অ্যান্ড পলিটিক্স” নামে কোনো গবেষণা সংস্থার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এ সংক্রান্ত আমাদের আগের প্রতিবেদন: অস্তিত্বহীন সংগঠনের নামে 'শেখ হাসিনার সততা'র প্রচারণা

বাংলাদেশে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য (disinformation) ছড়ানোর জন্য ইতোমধ্যে ‘খ্যাতি’ অর্জন করা অনলাইন পোর্টাল ‘বাংলাইনসাইডার’ এর কর্তৃপক্ষ এই সংস্থাটির ‘আবিস্কারক’ এবং এটির নামে গত প্রায় বছর দুয়েক ধরে একের পর এক ভূয়া সংবাদ পরিবেশন করা হচ্ছে।

তাদের কয়েকটি ভূয়া সংবাদ নিয়ে ইতোমধ্যে bdfactcheck.com একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। নিচে কয়েকটির লিংক দেয়া হল--

ফের ভূয়া সংবাদ, ‌‘আস্থার সাথে’ ছড়াচ্ছেন উচ্চশিক্ষিতরা!

“শেখ হাসিনা নতুন মাহাথির?” সিডনী বিশ্ববিদ্যালয় প্রফেসরের অস্বীকার

শেখ হাসিনাকে নিয়ে আবারও ভূয়া সংবাদ

আবারও সংসদে উঠলো ভুয়া সংবাদ

শেখ হাসিনা কি নোবেল শান্তির সংক্ষিপ্ত তালিকায় আছেন?

 

সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার (১৫ মার্চ) আরেকটি ভূয়া সংবাদ উৎপাদন করা হয়েছে ভূয়া গবেষণা সংস্থা “পিপলস অ্যান্ড পলিটিক্স” এর নামে। “বিশ্ব নেতার সংক্ষিপ্ত তালিকায় শেখ হাসিনা” শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়--

“সমাজতন্ত্রের পতনের পর, বিশ্বের নেতা মানেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বারাক ওবামা পর্যন্ত এই রীতি মানতো বিশ্ব। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হবার পর এটা মানতে রাজি নয় বিশ্ব। এই মুহূর্তে বিশ্ব নেতা কে? এই প্রশ্নের উত্তরে বিভক্ত রাজনীতি বিষয়ে গবেষকরা। তাঁদের ভোটে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছেন অ্যাঙ্গেলা মেরকেল। তবে, বিশ্ব নেতার তালিকায় পঞ্চম স্থানে আছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশ্বের খ্যাতিমান ১২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও সরকার বিষয়ে উচ্চতর গবেষণা করেছেন এমন ১০০জন শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতে এই তালিকা তৈরি করেছে গবেষণা সংস্থা পিপলস অ্যান্ড পলিটিক্স।

১২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আছে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়,স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, ইয়েল ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো, জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি, বোস্টন ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব এডিনবার্গ, ইউনিভার্সিটি অব মিউনিখ এবং ইউনিভার্সিটি অব টোকিও।”

বাংলাইনসাইডারের সর্বশেষ ভূয়া খবরের স্ক্রিনশট


খবরটি ভূয়া:

প্রথমত, “পিপলস অ্যান্ড পলিটিক্স” একটি ভূয়া সংগঠন (পড়ুন অস্তিত্বহীন সংগঠনের নামে 'শেখ হাসিনার সততা'র প্রচারণা) । কোনো ভূয়া সংগঠনের বরাতে কিছু বলা হলে সেটিও খুব স্বাভাবিকভাবেই ভূয়া।

দ্বিতীয়ত, “বিশ্ব নেতার সংক্ষিপ্ত তালিকা” বলতে আসলে কী বুঝানো হয়েছে তা বাংলাইনসাইডারের প্রতিবেদন থেকে স্পষ্ট নয়। সাধারণত, প্রতি বছর বিখ্যাত সাময়িকী ‘দ্য ইকোনোমিস্ট’ ‘ফোর্বস’ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান ‘বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব’ ‘বিশ্বের সেরা নেতা’ ‘বিশ্বের সেরা ধনী’ ইত্যাদি বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে নানা তালিকা প্রকাশ করে। এগুলো নিয়ে সারা বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। যেমন গত বছর (২০১৭) ‘বিশ্বের ১৮ নারী নেতার তালিকা’য় স্থান পেয়েছিলেন শেখ হাসিনা। সেই খবর বাংলাদেশের সব সংবাদমাধ্যমে গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়েছে।

কিন্তু “বিশ্ব নেতার সংক্ষিপ্ত তালিকা” বলতে কোনো কিছুর নাম কখনো শোনা যায়নি। এবং বাংলাইনসাইডারের প্রতিবেদনের পরও গুগলে বাংলা/ইংরেজিতে খুঁজে এ সংক্রান্ত কোনো সংবাদ পাওয়া যায়নি। কয়েকটি ভূঁইফোড় পোর্টাল বাংলাইনসাইডারের প্রতিবেদনটি কপি করে (ক্রেডিট ছাড়াই!) প্রকাশ করলেও মূলধারার কোনো সংবাদমাধ্যমে এরকম কিছু মিলেনি।

‘ভূয়া পোর্টাল’ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করা পোর্টালটির ইংরেজি ভার্সনে Sheikh Hasina in shortlist of ‘world leaders’  শিরোনামে যে রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে সেই শিরোনাম দিয় গুগল সার্চ করেও দুনিয়ার অন্য কোনো সূত্র থেকে এরকম কোনো খবর/তথ্য পাওয়া যায়নি।

তৃতীয়ত, ‘ভূয়া সংগঠনের নামে করা গবেষণাটি’ কোথায় এবং কবে প্রকাশিত তার কোনো তথ্য দেয়া হয়নি। আবার ‘গবেষক দলের’ একাধিক ‘উদ্ধৃতি’ প্রতিবেদনে ব্যবহার করা হলেও কোনো ‘গবেষক’ এর নাম-পরিচয় বলা হয়নি। এর আগে একাধিক ভূয়া রিপোর্টে বাংলাইনসাইডার খ্যাতিমান অধ্যাপক ও গবেষকদের নাম ব্যবহার করে ভূয়া সংবাদ/উদ্ধৃতি ছড়িয়েছিল। সেইসব অধ্যাপক ও গবেষকদের সাথে bdfactcheck.com এর পক্ষ থেকে যোগযোগ করার পর তারা ওই সংবাদ ও উদ্ধৃতিগুলোকে ভূয়া বলে জানিয়েছিলেন। আমাদের অনুসন্ধানী তেমন একটি রিপোর্ট পড়ুন: “শেখ হাসিনা নতুন মাহাথির?” সিডনী বিশ্ববিদ্যালয় প্রফেসরের অস্বীকার

ধারণা করা যাচ্ছে, কোনো গবেষকের নাম/পরিচয় ব্যবহার করলে তার সাথে যোগাযোগ করে পাল্টা বক্তব্য নেয়ার পথ বন্ধ করতেই এখন আর ভূয়া রিপোর্টে কোনো গবেষকের নাম উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকছে সংবাদ উৎপাদনকারীরা।

নিচের স্ক্রিনশটে দেখুন কিভাবে কোনো গবেষকের নাম ছাড়াই ‘বলা হয়েছে’, ‘মন্তব্য করা হয়েছে’ ‘তাদের বক্তব্য হলো’ ইত্যাদি পরোক্ষ ‘উদ্ধৃতি’র মাধ্যমে অনেক বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে--

উদ্বেগের বিষয় হল এই ভূয়া সংবাদটি গণহারে সামাজিক মাধ্যম ও ইউটিউবে ছড়াচ্ছেন ব্যবহারকারীরা। আবার ভূয়া খবর প্রচার করে ‘হিট’ বাড়ানো কিছু পোর্টালও তাতে যোগ দিয়েছে। নিচে কয়েকটি স্ক্রিনশট দেয়া হল-

 

 

 

Related Post