তুরস্কের ‘আর্মি অব ইসলাম’ গঠনের খবরটি বিভ্রান্তিকর

25 March, 2018 16:03 PM গণমাধ্যম

কদরুদ্দীন শিশির

দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের শিরোনাম, “৫৭ মুসলিম দেশ নিয়ে তুরস্কের 'আর্মি অব ইসলাম'”

যুগান্তরের অনলাইনে শিরোনাম, “৫৭ মুসলিম দেশ নিয়ে ‘আর্মি অব ইসলাম’ গড়বে তুরস্ক”

কালের কণ্ঠের শিরোনাম, “'আর্মি অব ইসলাম' গঠন করবে তুরস্ক!”

ইত্তেফাকের অনলাইনে শিরোনাম, “ইসরায়েল দখলে ‘আর্মি অব ইসলাম’ গঠন করতে চায় তুরস্ক”

এভাবে আরও বহু অনলাইন পত্রিকায় খবরটি গতকাল শনিবার থেকে ছড়াচ্ছে।

যুগান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “বিশ্বের ৫৭টি মুসলিম দেশের সেনাবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে ‘আর্মি অব ইসলাম’ নামে বিশাল সামরিক বাহিনী গঠন করতে যাচ্ছে তুরস্ক। দেশটির এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে ইসরায়েল দখল এমনকি দেশটিতে হামলা চালাতেও সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে এই ‘আর্মি অব ইসলাম’ নামক সামরিক বাহিনী। তুরস্কের স্থানীয় ভাষার দৈনিক ইয়েনি সাফাক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।”


‘দ্য সিয়াসাত ডেইলি’ নামের ভারতীয় একটি পত্রিকার বরাতে কালের কণ্ঠ তাদের রিপোর্টে লিখেছে, “'আর্মি অব ইসলাম নামে' বিশাল সামরিক বাহিনী গঠন করতে যাচ্ছে তুরস্ক। বিশ্বের ৫৭টি মুসলিম দেশের সেনাবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে এ বাহিনী গড়ে তুলবে তুরস্ক। তুরস্কের স্থানীয় ভাষার দৈনিক ইয়েনি সাফাক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।”


বাংলাদেশ প্রতিদিন ‘দ্য সিয়াসাত ডেইলি’ এর রিপোর্টের স্ক্রিনশটসহ প্রকাশিত প্রতিবেদনে লিখেছে, “এবার 'আর্মি অব ইসলাম' নামে বিশাল সামরিক বাহিনী গঠন করতে যাচ্ছে তুরস্ক। বিশ্বের ৫৭টি মুসলিম দেশের সেনাবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে গঠিত হবে তুরস্কের এই 'আর্মি অব ইসলাম'। তুরস্কের এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে ইসরায়েল দখল বা দেশটিতে হামলা চালাতে সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে ‘আর্মি অব ইসলাম’ নামক সামরিক বাহিনী। দেশটির স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে এ কথা জানানো হয়েছে।”

সবগুলো বাংলা পত্রিকায়ই বলা হয়েছে, “আর্মি অব ইসলাম’... গঠন করতে যাচ্ছে তুরস্ক”। আর সবার ‘তথ্যের সূত্র’ মূলত তুরস্ক ভিত্তিক পত্রিকা ‘ইয়েনি সাফাক’ (যদিও কেউ কেউ দ্বিতীয় সূত্র হিসেবে ‘দ্য সিয়াসাত ডেইলি’ এর কথাও উল্লেখ করেছে)।


আমরা সংবাদটির মূল সূত্রে যাচ্ছি। দেখা যাক ‘ইয়েনি সাফাক’ তাদের প্রতিবেদনে কী লিখেছে?

ইয়েনি সাফাক মূল পত্রিকাটি তুর্কি ভাষার। গত বছরের ১২ ডিসেম্বর İsrail'e karşı 'İslam Ordusu' kurulsa...

(অর্থাৎ, “যদি ইসরাইলের বিরুদ্ধে ‘ইসলামী আর্মি’ প্রতিষ্ঠিত হয়...) শিরোনামে পত্রিকাটির ওয়েবসাইটের তুর্কি ভার্সনে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

আবার ইংরেজি ভার্সনে একই রিপোর্ট প্রকাশিত হয় এই শিরোনামে “What if a Muslim army was established against Israel?”

 

শিরোনামের নিচে রিপোর্টের সারাংশ (insert) হিসেবে আরেকটি লাইন দেয়া আছে। সেটি হলো- “If the member states of the OIC unite militarily, they will form the world’s largest and most comprehensive army”। ‘যদি ওআইসির সদস্যরা সামরিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হয় তাহলে তারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় সেনাবাহিনীতে পরিণত হবে।’


পুরো রিপোর্টটি পড়ে দেখা গেছে সেটি একটি প্রস্তাবনা ধরনের নিবন্ধ। শিরোনাম, সারাংশ এবং রিপোর্টের ভেতরে বারবার উল্লেখ করা ‘if’ শব্দটি থেকে সহজেই এটা বুঝা যায়। ইয়েনি সাফাকের নিবন্ধের কোথাও কোনো সূত্র উল্লেখ করে এমনটি বলা হয়নি যে, তুরস্ক (বা ওআইসি) এমন কোনো সেনাবাহিনী গঠন করছে বা গঠনের চিন্তা করছে। আদতে এটি কোনো সংবাদ প্রতিবেদনই নয়, বরং ‘কাউকে উদ্বুদ্ধ করতে লেখা একটি নিবন্ধ’। (বিস্তারিত জানতে মূল লিংকে যান)

নানা তথ্যের মাধ্যমে ইউটোপিয়ান চিত্র এঁকে লেখাটির মাধ্যমে মূলত পর দিন (১৩ ডিসেম্বর) শুরু হতে যাওয়া ওআইসি সম্মেলনে অংশ নেয়া নেতাদেরকে এমন কোনো বিষয় বিবেচনায় নিতে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। ‘যদি ওআইসির সদস্যরা সামরিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হয় তাহলে তারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় সেনাবাহিনীতে পরিণত হবে।’

ইয়েনি সাফাক সরকারপন্থি পত্রিকা হওয়ায় বড়জোর এটা বলা যায় যে, নিবন্ধটি প্রকাশের ক্ষেত্রে তুরস্কের ক্ষমতাসীনদের সম্মতি/ইশারা ছিল। ওয়াশিংটন ভিত্তিক কট্টর ইসরাইলপন্থি গবেষণা প্রতিষ্ঠান Middle East Media Research Institute (MEMRI) এর নিম্নোক্ত নিবন্ধে গত ৭ মার্চ এই কথাটিই বলতে চেয়েছে।

MEMRI এর নিবন্ধের শিরোনাম হচ্ছে, “Turkish Newspaper Close To President Erdogan Calls To Form Joint Islamic Army To Fight Israel”

অর্থাৎ, “ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়তে যৌথ ইসলামি সেনাবাহিনী গড়ার আহ্বান প্রেসিডেন্ট এরদোগানের ঘনিষ্ঠ তুর্কি পত্রিকার”। কট্টর ইসরাইলপন্থি একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানটিও এটা দাবি করছে না যে, তুরস্ক বা ওআইসি এমন কোনো সেনাবাহিনী ‘গঠন করছে’ (যেমনটি ভারতীয় পত্রিকার রিপোর্ট অনুসরণ করে বাংলাদেশি পত্রিকাগুলো দাবি করেছে)।

(MEMRI জানাচ্ছে, ইয়েনি সাফাকের প্রিন্ট ভার্সনে আলোচ্য নিবন্ধের (১২ ডিসেম্বর) শিরোনাম ছিল ‘A Call for Urgent Action’। এ বিষয়ে বিস্তারিত দেখতে MEMRI এর ওয়েবসাইটে রিপোর্টটি যেতে পারেন )



আরেক কট্টর ইসরাইলপন্থি পত্রিকা www.algemeiner.com ২২ মার্চ ‘Army Of Islam’: Erdogan’s Plot Against Israel প্রকাশিত এক লেখায় ইয়েনি সাফাকের ওই নিবন্ধকে ‘উস্কানিমূলক’ এবং একইসাথে এরদোগান ও তার সরকারের ‘ইসরাইলনীতি’র বহিঃপ্রকাশ বলে অভিহিত করেছে। কিন্তু এটা বলেনি যে, তুরস্ক ‘আর্মি অব ইসলাম’ নামে কিছু গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বা কোনো সূত্র থেকে এমনটি দাবি করা হয়েছে।


কোনো পত্রিকার নিবন্ধে সরকার বা কোনো কর্তৃপক্ষের প্রতি কোনো আহ্বান বা উদ্বুদ্ধকরণ মূলক প্রস্তাব জানানোকে ‘সরকারের বা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত’ আকারে প্রচার করা অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর।

Related Post