বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ফ্যাক্ট চেকিংয়ের প্রভাব: কিভাবে কাজ করেন পশ্চিমা ফ্যাক্ট চেকাররা?

09:04 AM সংস্থা/প্রতিষ্ঠান

রবি হোসাইন:

আমেরিকাতে সম্প্রতি রাজনৈতিক ফ্যাক্ট চেকিং শব্দটি বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছে। স্বাধীন পলিটিক্যাল ফ্যাক্ট চেকিংকে বলা হচ্ছে একটি নতুন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। বিশ্বব্যাপী ফেইক নিউজের ছড়াছড়ির কারণেই সাংবাদিকদের দায়িত্ব হয়ে উঠেছে সংবাদ প্রচারের বাইরে রাজনৈতিকদের ভূয়া বক্তব্য ও দাবি জনগণের সামনে তুলে ধারণা। এটা একটা সময় ভাবা কঠিন ছিল।


বিশ্বব্যাপী ফেইক নিউজের বিপরীতে অনেকগুলো ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থা গড়ে উঠেছে যারা ফেইক নিউজকে চ্যালেঞ্জ করছে। পশ্চিমা অনেক মূলধারার পত্রিকা এ কাজ করতে শুরু করেছে। ফ্যাক্টচেকিং সাংবাদিকতা রাজনৈতিক বিজ্ঞান, অর্থনীতি, আইন, সরকারী নীতি নিয়ে কাজ করে থাকে।


বিংশ শতাব্দীতে রিপোর্টাররা কোন অফিসিয়াল দাবিকে চ্যালেঞ্জ করতে অভ্যস্ত ছিলেন না। যেটার সুযোগ নেন রাজনীতিবিদেরা। তখন শত শত মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হয়েছে এবং এর বিপরীতে গণমাধ্যমগুলোর নীরবতায় জনগণ ভুল সেসব তথ্য বিশ্বাসও করেছে।


সাম্প্রতিক দশকগুলোতে গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় অগ্রগতি হচ্ছে সাংবাদিকরা 'শ্রুতিলিখন পদ্ধতি'র সাংবাদিকতা থেকে বেরিয়ে এসেছে। বিশেষ করে আমেরিকাতে ২০০৪ সালের নির্বাচনের সময় অনেক রাজনীতিবিদের বক্তব্যের অসারতাকে তুলে ধরেছেন সাংবাদিকরা। এর ধারাবাহিকতায় এখন পশ্চিমের বিভিন্ন দেশে স্বাধীন ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থার উদ্ভব ঘটেছে।


আমেরিকার ক'টি উল্লেখযোগ্য ফ্যাক্টচেকিং সংস্থা হলো পেনসেলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালিত factcheck.org। যেটি চালু হয় ২০০৩ সালে। এটি পরিচালনা করে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যানেনবার্গ পাবলিক পলিসি সেন্টার। দা ওয়াশিংটন পোস্ট ফ্যাক্টচেকার এবং দা টামপ বে টাইম পলিটিফ্যাক্ট শুরু হয় ২০০৭ সালে। ২০১০ থেকে ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থা বিশ্বব্যাপী খুব দ্রুত বাড়তে থাকে।


২০১৪ সালে আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, চিলি, মিশর, ভারত, ইতালি , সার্বিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইউক্রেন সহ বিশটির বেশি দেশ থেকে এবং ছয়টি দেশ থেকে ফ্যাক্ট চেকাররা প্রথমবারের মত লন্ডনে আইডিয়া শেয়ার এবং সত্যতা যাচাই সম্পর্কে কথা বলার জন্যে একত্রিত হয় প্রথমবারের মত। তাদের সহযোগীতা করে ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের রিপোর্টারস ল্যাব। তারা জানায়, বর্তমানে বিশ্বে ৪৮টি সক্রিয় ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থা আছে।


২০১৬ সালে রয়টার্স ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব জার্নালিজম (আরআইএসজে) প্রকাশিত একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইউরোপে ৩৪টি পলিটিক্যাল ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থা আছে। প্রায় প্রতেকটি মহাদেশেই অর্থাৎ চিলি থেকে কানাডা এবং সুইডেন থেকে আফ্রিকাতে প্রায় ৫০টি দেশে একশর বেশি ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থা গড়ে উঠছে বলে দাবি করা হয়েছে।


এই ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থাগুলোর ৯০ ভাগই গড়ে উঠেছে ২০১০ সাল থকে। প্রায় ৫০ টি দেশে শুরু হয়েছে গত দুই বছরে। রাজনৈতিক ফ্যাক্ট চেকিং এর প্রথম যাত্রা শুরু হয় একটি ব্লগের মাধ্যমে। ব্রিটেনের চ্যানেলফোর নিউজ ২০০৫ সালের নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্যে এটি শুরু করে। পরে ফ্রান্সে ও নেদারল্যান্ডেও নির্বাচনকালীন সময়ে এই উদ্যেগ দেখা যায়।


বর্তমানে রাজনৈতিক ফ্যাক্ট চেকিং এর ৩৪ টি স্থায়ী সংস্থা আয়ারল্যান্ড থেকে তুরস্ক পর্যন্ত ২০টি বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশে সক্রিয়। নোর্ডিক দেশগুলি, ভূমধ্যসাগরীয়, মধ্য ইউরোপ, বালকানস এবং সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলি সহ মহাদেশটির প্রতিটি অংশ অবধি এই ফ্যাক্ট চেকিং বিস্তৃত। অনেক সংবাদ সংস্থা অ্যাড-হক ভিত্তিতে নির্বাচনের সময় কাজ করে থাকে।

পশ্চিম ও উত্তর ইউরোপে, ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থাগুলি প্রধানত প্রতিষ্ঠিত কোনো না কোনো মিডিয়ার অংশ আর পূর্ব ইউরোপের ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থাগুলো এনজিও দ্বারা পরিচালিত হয়।

ইউরোপের ফ্যাক্ট-চেকিং সাইটগুলির উত্থান সংক্রান্ত এই রিপোর্টটি ৪০ জন ফ্যাক্ট চেকারের সাথে কথা বলে তৈরি করা হয়েছে। এটি করতে ইউরোপের আটটি দেশের সাইট ভিজিট করা হয় এবং ২০১৬ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ৩০টি সংস্থার কার্যক্রমের ওপর অনলাইন জরিপ করা হয়।

গবেষণাটি করেছেন লুকাস গ্রেভস ও ম্যাডিসন উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগের সহকারী অধ্যাপক।তারা ফ্যাক্ট চেকিং এর ধরন, তার বিস্তার ও পাঠকের মধ্যে তার প্রভাব নিয়ে কাজ করেছেন। প্রায় ৭৫ শতাংশ জরিপের উত্তরদাতা নিজেদেরকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন এবং ৪০ শতাংশের উত্তর ছিল একেকজন একটিভিস্ট।

মোট ৪৩ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো জনসাধারণের বক্তব্যের মান উন্নত করা এবং রাজনীতিবিদদের তাদের বক্তব্যের ক্ষেত্রে দায়বদ্ধ করতে বাধ্য করা।

পূর্ব ইউরোপ জুড়ে, ফ্যাক্ট-চেকিং সাইটগুলি স্বাধীন। তারা এনজিও থেকে আর্থিক সাহায্য পায়, অথবা যে কোন একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত। এরকম কয়েকটি সংস্থা হচ্ছে ব্রিটেনের ফুল ফ্যাক্ট ও ইতালির পাগেলা পলিটিকা।

বলকান অঞ্চল এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বেশিরভাগ ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থার কাজের প্রথম মাধ্যম হলো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গঠন। তারাও এনজিও থেকে সাহায্য পেয়ে থাকে। তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই, নাগরিক সদিচ্ছার প্রচার এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা নিয়ে কাজ করে থাকে। 'ফ্যাক্ট চেক ইউক্রেন' হলো এর একটি আদর্শ উদাহরণ যারা কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা ও জনগণবিরোধী প্রতিযোগিতা নিয়ে কাজ করে থাকে।

বর্তমানে সাংবাদিকরা ভুয়া তথ্যের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্যে নতুন নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করছেন। যাতে করে ভূয়া তথ্যের বিরুদ্ধে সঠিক সংবাদের একটা ভারসাম্যের অবস্থা তৈরি হয়। বলা যায়, ভূয়া তথ্যের বিরুদ্ধে একটা অনলাইন যুদ্ধের যুগ চলছে এখন। এই ধারণাটি খুব দ্রুত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে।

ফ্যাক্ট চেকিং নিয়ে ক্লাসরুমেও পড়ালেখা হচ্ছে এবং ছাত্রছাত্রীরা এই নতুন বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছে এমনই মন্তব্য লুকাস গ্রেভের যিনি উইকিনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগের এসিট্যান্ট প্রফেসর।

একটা সময় রাজনীতিবিদদের কোন বক্তব্য যাচাই করার সুযোগ না থাকার কারণে তারা যা বলতেন সেগুলোই গণমাধ্যমে প্রচার করা হতো। সরকারি কোন দলিল হাতে পাওয়া কিংবা কোন বই খুঁজে পাওয়া এতটা সহজ ও ছিল না। কিন্তু বর্তমানে অনলাইনে সবকিছু এতটা সহজলভ্য কোন তথ্য যদি সত্য না হয় তাহলে তা ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থা গুলোর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। ফলে সেই বক্তব্যগুলোও জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

রিডার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মাইকেল এমাজিন বলেছেন, প্রাথমিক গবেষণা থেকে দেখা গেছে ২০০৮ থেকে ২০১২ সালে নির্বাচনগুলোতে দা ফ্যাক্টচেকার, পলিটিফ্যাক্ট এবং ফ্যাক্টচেক.ওআরজি একি অনুসিদ্ধান্তে পৌঁছেছে একি রকম বক্তৃতার ক্ষেত্রে পায় ৯৫ বার।

চলমান ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থাগুলোর কাজের বিষয় ও লক্ষ্য এক ও অভিন্ন। তারা সবসময় রাজনৈতিক নেতাদের যেনতেন বক্তব্যের বিপক্ষে গিয়ে জবাবদিহিতা তৈরির জন্যে কাজ করে থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে চিলির এল পলিগ্রাফো ১১ মাসে সেই দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে একটি ঝাঁকুনি দিয়ে গেছে বেশ কয়েকটি মিথ্যা উন্মোচনের মাধ্যমে।

ব্রিটেনের ফুল ফ্যাক্ট মিডিয়া ও রাজনীতিবিদদের ফ্যাক্ট চেক করে। পত্রিকাগুলোর ভুলত্রুটি উল্লেখ করে। ইতিমধ্যে, ইউক্রেনের স্টপফেক মিথ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাশিয়ার প্রোপাগান্ডার বিরুদ্ধে কাজ করেছে। মার্গো গোন্টার হলেন স্টপ ফেকের কো ফাউন্ডার তিনি স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন কোন ছবিকে ম্যানিপুলেট করার মাধ্যমে প্রোপাগান্ডার মুখোশ উন্মোচন করা কত সহজ।

স্টপফেক মূলত সংবাদপত্রের চেয়ে সামাজিক গণমাধ্যমের ভূয়া খবরের প্রতি বেশি গুরুত্বারোপ করে। গোন্টার জানিয়েছেন স্টপফেকের দৈনিক ভিজিটর ৫০ হাজার।


আফ্রিকাচেক হলো একটি দক্ষিণ আফ্রিকা ভিত্তিক ওয়েবসাইট যেটি ফেইক সংবাদ ও অনলাইনের প্রোপাগান্ডার জবাব দেয়। আফ্রিকাচেক এবং ফেক্টচেকইউ হলো বেলজিয়াম ভিত্তিক একটি ওয়েবসাইট যেটি ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এর বিভিন্ন বক্তব্য নিয়ে কাজ করে। পাঠকদের থেকেও লেখার আহ্বান করে তারা।


আর্জেন্টাইন চেকুয়েডো (ফ্যাক্টচেকড) আর্জেন্টিনার অন্যতম ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থা। কিছু ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থা ব্রডকাস্টিং এও যুক্ত আছে। যেমন অস্ট্রেরিয়ার এবিসি ফ্যাক্ট চেক নিয়মিতভাবেই অস্ট্রেলিয়ান পিবিএস ভার্সনে উপস্থিত হয়।

ইতালির লা পেজেলা পলিটিকা সংস্থাটি শুক্রবার বিকেলে ভাইরাস নামে একটি অনুষ্ঠানে আয়োজন করে যেটি চ্যানেল রাই২ তে প্রচারিত হয়। এই অনুষ্ঠানের প্রায় লক্ষাধিক দর্শক আছে। এই অনুষ্ঠানে গ্রাফিক্সের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়। যাদের নিয়ে ফ্যাক্ট চেকিং হচ্ছে তার ভক্ত ও সমর্থকদের থেকে প্রশ্ন নেয় হয়।

মিশরের মরসিমিটার নামে একটি সংস্থা কাজ করেছিল তাদের প্রেসিডেন্ট ১০০ দিনে কী কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সেগুলো নিয়ে। মরসিমিটার পরে দেখায় যে ৬৪টির মধ্যে প্রেসিডেন্ট সিসি ১০টি ছাড়া বাকী কাজ গুলো করেননি। এই একই কৌশলের কারণে রুহানিমিটার তৈরি করা হয় যেটি ইরানী প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিকে বক্তব্য প্রধানে সংযত হতে সাহায্য করেছে।

তবে এই ফ্যাক্ট চেকিংয়ের কাজে ঝুঁকির মাত্রাও ভয়াবহ। বেশিরভাগ রাজনৈতিক ফ্যাক্টচেকিংগুলো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তখন তারা রাজনীতিবিদদের সমালোচনার শিকার হন আবার কখনো আক্রমণের শিকার হন। সাধারণের মধ্যে আলোচিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থাগুলো কাজ করলেও রাজনৈতিক ফ্যাক্ট চেকিং খুবই ঝুঁকিপূর্ণ এবং অনেক সময় সমালোচকদ্বারা ফ্যাক্ট চেকাররা আক্রমণের শিকার হন।

লেখক: সাংবাদিক

Related Post