ফ্যাক্ট চেকিং সাইটের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি এবং গণমাধ্যমের ব্যর্থতা

09:04 AM গণমাধ্যম

মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা:

‘ফেইক নিউজ’ শব্দটি সাম্প্রতিক সময়ের আবিষ্কার হলেও বাস্তবে সংবাদপত্রে মিথ্যা তথ্য পরিবেশন নতুন কিছু না। যুগ যুগ ধরেই গণমাধ্যমে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশিত হয়ে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে এবং সর্বোপরি সর্বস্তরে ইন্টারনেট ব্যবহার সহজলভ্য হওয়ায় ফেইক নিউজ যেন মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তো ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচিত হওয়ার পেছনে প্রথমে রাশিয়ান ফেইক নিউজের প্রভাব এবং এরপর কেমব্রিজ অ্যানালিটিকার ভূমিকা নিয়ে রীতিমতো তোলপাড় হয়ে গেছে! তবে সব রোগেরই যেমন ওষুধ আছে, তেমনি ফেইক নিউজের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য দিনে দিনে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ফ্যাক্ট চেকিংয়ের বিভিন্ন সাইট।

ফেইক নিউজ বৃদ্ধির অনেকগুলো কারণ আছে। বিশ্বের অনেক রাষ্ট্র, যারা পূর্বে গণতান্ত্রিক ছিল, তারাও বর্তমানে শুধু নামেই গণতান্ত্রিক, কার্যত আংশিক বা সম্পূর্ণ স্বৈরতান্ত্রিক। এক হিসেব অনুযায়ী, ২০০৮ সাল থেকে প্রতি বছরই বিশ্বে গণতান্ত্রিক নির্দেশকের মান হ্রাস পেয়ে আসছে। বর্তমানে বিশ্বের মাত্র ৪.৫% মানুষ সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক শাসণের অধীনে বসবাস করেন।

গণতন্ত্রের সাথে সংবাদপত্রের এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার সরাসরি সম্পর্ক আছে। কাজেই স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাও দিনে দিনে হ্রাস পাচ্ছে। ২০০০ সালের পর থেকে এই মুহূর্তে সমগ্র বিশ্বে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সর্বনিম্ন।স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সরকারের চাপে গণমাধ্যমগুলো অনেক সময়ই তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারে না। তাদেরকে সরকারের পক্ষে এবং বিরোধীদলগুলোর বিপক্ষে অসত্য বা অর্ধসত্য সংবাদ প্রকাশ করতে হয়।

কিন্তু মিথ্যা নিউজ ছড়ানোর এটাই একমাত্র কারণ না। অনেক সময়ই পত্রিকাগুলো নিজেরাও কোনো চাপ ছাড়াই রাজনৈতিক বা ধর্মীয় কারণে পছন্দের দল/গোষ্ঠির পক্ষে বা অপছন্দের দল/গোষ্ঠির বিপক্ষে অসত্য তথ্য পরিবেশন করে। এছাড়াও অর্থনৈতিক কারণ তো থাকেই। যেসব পত্রিকার জনপ্রিয়তা কম, তারা সহজে নির্দিষ্ট শ্রেণীর পাঠককে আকৃষ্ট করার জন্য মিথ্যা এবং গুজব নির্ভর সংবাদ পেশ করে থাকে।

তবে এই কারণগুলোর বাইরেও আরেকটি বড় কারণ আছে। তা হলো, গণমাধ্যমকর্মীদের তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করা। যেকোনো সংবাদ প্রকাশের পূর্বে তার সত্যাসত্য যাচাই করে দেখাটা সাংবাদিকদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো রাজনৈতিক নেতা তার বক্তব্যে কোনো একটি তথ্য দিলে সেটি হুবহু প্রচার করার দায়িত্ব ঐ রাজনৈতিক দলের ক্রোড়পত্রের। কিন্তু একটি ভালো সংবাদপত্রের দায়িত্ব হচ্ছে ঐ সংবাদটি প্রকাশের পাশাপাশি তার সত্যতাও যাচাই করে দেখা। সে বিষয়ে অন্যরা কী বলছে, সেটাও উল্লেখ করা।

মূলত সাংবাদিকরা এখন তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন না বলেই ফেইক নিউজের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফলে চাহিদা এবং জনপ্রিয়তা বাড়ছে ফ্যাক্ট চেকিং সাইটগুলোর। বিশেষ করে অনলাইন পত্রিকাগুলো চালু হওয়ায় এ সংকট আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।পূর্বের মতো সংবাদ প্রকাশ করার জন্য এখন আর ছাপাখানার প্রয়োজন হচ্ছে না, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করে নিজস্ব সংবাদদাতা রাখার দরকার হচ্ছে না। বিনিয়োগ কম হওয়ার কারণে ঝুঁকিও কম, ফলে অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ অনলাইন পত্রিকাই সংবাদের সত্যাসত্য যাচাইয়ের পেছনে না ছুটে দায়সারাভাবে সংবাদ প্রকাশ করছে।

অনেক তথাকথিত অনলাইন পত্রিকাই এখন যে কাজ করছে, তা হলো সামান্য কিছু অর্থের বিনিময়ে একটি ওয়েবসাইট চালু করে এবং হাতেগোনা কয়েকজন সহ-সম্পাদক এবং ডেস্ক রিপোর্টার রেখে পত্রিকা চালাচ্ছে। নিজস্ব সংবাদদাতা না থাকায় তারা কোনো সংবাদই সঠিকভাবে বিস্তারিত জানতে পারছে না। এ পত্রিকা, ও পত্রিকা থেকে কপি-পেস্ট করে এবং ফেসবুকের মতো অনির্ভরযোগ্য মাধ্যম থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সেটাকেই নিউজ হিসেবে চালিয়ে দিচ্ছে। ফলে স্বভাবতই মানুষ তাদের উপর আস্থা হারাচ্ছে এবং ফ্যাক্ট চেকিং সাইটের গুরুত্ব তাদের কাছে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী এখন ফ্যাক্ট চেকিং সাইটের জনপ্রিয়তা ক্রমবর্ধমান। তবে বাংলাদেশে ফ্যাক্টচেকিং এখনও ততটা সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে পারেনি। হাতে গোনা দুই-তিনটি সাইট তাদের সীমিত সামর্থ্য অনুযায়ী বিভিন্ন পত্রিকা, অনলাইন পত্রিকা বা সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হওয়া নিউজগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রকাশ করার চেষ্টা করছে। কিন্তু যে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশী প্রতিদিন ফেসবুক ব্রাউজ করেন এবং বিভিন্ন ভিত্তিহীন সংবাদের মাধ্যমে প্রতারণার শিকার হয়, সে তুলনায় এ প্রচেষ্টা এখনও অপ্রতুল।

এ ধরনের সাইটের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাওয়া প্রয়োজন, যেন প্রতিটি সাইটের পক্ষে সব ধরনের সংবাদ যাচাই করা সম্ভব না হলেও যেন তারা নিজেদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিতে পারে। কেউ হয়তো দেশীয় রাজনীতি বিষয়ক সংবাদের সত্যতা যাচাই করল, কেউ করল আন্তর্জাতিক রাজনীতির, বিনোদন জগতের অথবা ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া গুজবগুলোর।

তবে একটি বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে, ফ্যাক্টচেকিং কখনোই মূল গণমাধ্যমের বিকল্প নয়। গণমাধ্যম যখন যথাযথভাবে সত্য তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়, তখন ফ্যাক্ট চেকিং সাইটগুলো সেই সত্য খুঁজে বের করে সবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গণমাধ্যমকেই এ থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ ফ্যাক্টে চেকিং সাইটের দায়িত্ব সত্য খুঁজে বের করা। কিন্তু সংবাদপত্রের দায়িত্ব শুধু এতেই সীমাবদ্ধ না। তাদের দায়িত্ব সত্য তথ্যকে আকর্ষণীয়ভাবে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করে, সমাজের জন্য কল্যাণকর জনমত গঠন করা।

Related Post