এক কিশোর ও বিচারবহির্ভূত হত্যা নিয়ে মিডিয়ার উদাসীনতার দৃষ্টান্ত

17:04 PM গণমাধ্যম

কদরুদ্দীন শিশির

বৃহস্পতিবার দিবাগত ভোর রাতে রাজধানীর ওয়ারী এলাকায় পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে রাকিব নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। এই ঘটনার সংবাদ শুক্রবার সারাদিন বিভিন্ন অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও পত্রিকাগুলোর ওয়েবসাইটে এবং শনিবার জাতীয় দৈনিকগুলোর প্রিন্ট ভার্সনে কিভাবে এসেছে তা আমরা এখানে সংক্ষেপে দেখবো।

প্রথম আলো, সমকাল, যুগান্তর, বাংলাদেশ প্রতিদিন, কালের কণ্ঠ, ডেইলি স্টার, জনকণ্ঠ, নিউ এইজ, মানবজমিন, বিডিনিউজ, বাংলাট্রিবিউন, ভোরের কাগজ, ইন্ডিপেন্ডেন্ট, বণিকবার্তা ও পরিবর্তন ডটকম- এই ১৫টি সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট ও প্রিন্ট ভার্সনে (যাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য) প্রকাশিত এ সংক্রান্ত সংবাদগুলো আমরা যাচাই করেছি।

 

প্রথমত:

কিছু সংবাদমাধ্যম শুধুমাত্র পুলিশের ভাষ্য দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছে। রিপোর্টের কোথাও ভিকটিমের পক্ষের কারো কোনো বক্তব্য নেয়া হয়নি। কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম তাৎক্ষণিক পাওয়া পুলিশের বক্তব্য অবলম্বন করে একবার প্রতিবেদন করেছে। আবার পরে যখন পুলিশ ঘটনার ফলোআপ তথ্য জানিয়েছে তখনও শুধুই পুলিশের বক্তব্য-নির্ভর রিপোর্ট করেছে। ফলোআপ রিপোর্টটি করার আগ পর্যন্ত যথেষ্ট সময় মিললেও ভিকটিমের পরিবারের সাথে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। অন্তত রিপোর্টে তার উল্লেখ নেই।

এই ধরনের সংবাদমাধ্যম হচ্ছে নিচের তিনটি-


#বিডিনিউজ

শুক্রবার সকালে প্রথমে বিডিনিউজ এই শিরোনামে রিপোর্ট প্রকাশ করে- “ওয়ারীতে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত ১”। ইন্ট্রোতে লেখা হয়েছে, “রাজধানীর ওয়ারী থানার জয়কালী মন্দির এলাকায় পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে সন্দেহভাজন এক ডাকাত নিহত হয়েছে।” তাৎক্ষণিক রিপোর্ট, এবং পুরোটাই পুলিশের বক্তব্য। এই রিপোর্ট প্রকাশের সময় ওয়েবসাইটে দেখাচ্ছে সকাল ১১টা ২২মিনিট।


এরপর পত্রিকাটি প্রকাশ করে ফলোআপ রিপোর্ট। পুলিশ সকালে ‘সন্দেহভাজন ডাকাত’ বলেছিলো। দুপুরে জানায় আপডেটেড তথ্য। এর ভিত্তিতি বিকাল ৩টা মিনিটে বিডিনিউজের ফলোআপ রিপোর্টের শিরোনাম “বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত যুবক তালহা হত্যার সন্দেহভাজন”। প্রথম রিপোর্টের চেয়ে এটি কিছুটা বিস্তারিত। তবে ৩১৮ শব্দের এই রিপোর্টে একটি শব্দও পুলিশের বাইরে কোনো পক্ষ থেকে নেয়া হয়নি। প্রথম রিপোর্ট প্রকাশের পর বিডিনিউজ সাড়ে তিন ঘণ্টার বেশি সময় পেলেও এ ঘটনায় ভিকটিমের স্বজনের ভাষ্যটা কী তা জানার প্রয়োজনবোধ করেনি।


#পরিবর্তন ডটকম

এই অনলাইন পোর্টালটি প্রথমে “রাজধানীতে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ যুবক নিহত” শিরোনামে রিপোর্ট প্রকাশ করে। 

পরে বিকালে “বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত যুবক তালহা হত্যার আসামি” শিরোনামে আরেকটি প্রকাশ করে। বিডিনিউজের মতো উভয় রিপোর্টই শতভাগ পুলিশ যা বলেছে তা দিয়ে পূর্ণ।

বিডিনিউজ ও পরিবর্তনের রিপোর্টে লক্ষ্যণীয় একটি বিষয় হচ্ছে ছবির ব্যবহার। ফলোআপ রিপোর্টের সাথে উভয় সংবাদমাধ্যম তালহা হত্যার বিচার দাবিতে আয়োজিত একটি মানবন্ধনের ছবি ব্যবহার করেছে। এটি খুবই সুক্ষ্মভাবে ‘বন্দুকযুদ্ধে এই মামলার আসামি‘কে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার পক্ষে সম্মতি উৎপাদনে কাজ করবে। কারণ, এই ছবি আগে খুন হওয়া তালহার প্রতি পাঠকের সহানুভূতি বাড়াবে, একই সাথে ‘তালহার খুনি’ (পুলিশের দাবি মতে) বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পক্ষে কিছুটা হলেও যৌক্তিকতা তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।


#মানবজমিন

ট্যাবলয়েড পত্রিকা মানবজমিনের অনলাইনে একটি রিপোর্টই পাওয়া গেছে। সেটির শিরোনাম “তালহা হত্যার প্রধান সন্দেহভাজন বন্দুকযুদ্ধে নিহত রাকিব”। শতভাগ পুলিশের বক্তব্য দিয়ে তৈরি করা রিপোর্ট। সম্ভবত প্রথমে পাওয়া তথ্যে ভিত্তিতে করা রিপোর্টই আবার আপডেট শিরোনামে দেয়া হয়েছে। এটি প্রকাশে সময় সকাল ১১টা ১৯ আর সর্বশেষ আপডেট সময় বিকাল ৩টা ৪০।

 

দ্বিতীয়ত:

কিছু পত্রিকা বৃহস্পতিবার দিবাগত ভোর রাতের এই ঘটনার খবরটি শনিবার তাদের প্রিন্ট ভার্সনে প্রকাশ করেছে ভিকটিমের পরিবারের কোনো বক্তব্য ছাড়াই। প্রতিবেদন প্রকাশের আগে পুরো একটি দিন পেলেও যাদের গুলিতে নিহত হয়েছে সেই পুলিশের ভাষ্য ছাড়া কারো কোনো কথা জানার প্রয়োজনবোধ করেনি এসব পত্রিকা। ভিকটিমের পরিবারের কারো বক্তব্য না, ঘটনাস্থলের আশপাশের কারো বক্তব্য না, চিকিৎসকের বক্তব্যও না, কোনো মানবাধিকার কর্মী বা সংস্থার বক্তব্য তো দূরের বিষয়।

উপরের ১৫টি সংবাদমাধ্যমের মধ্যে এরকম পত্রিকা পাওয়া গেছে ৪টি।

 

#বাংলাদেশ প্রতিদিন:

শনিবার শেষের পাতায় শিরোনাম- তালহা হত্যা মামলায় প্রধান আসামি বন্দুকযুদ্ধে নিহত।



#জনকণ্ঠ

শিরোনাম- জয়কালী মন্দির এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে যুবক নিহত


ইন্ট্রোতে বলা হয়েছে, “পুরান ঢাকার ওয়ারীতে জয়কালী মন্দির এলাকায় পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে রাকিব (২২) নামে এক যুবক নিহত হয়েছে। পুলিশ জানায়, নিহত রাকিব ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র খন্দকার আবু তালহা হত্যার প্রধান সন্দেহভাজন আসামি। তার বিরুদ্ধে পুরান ঢাকার বিভিন্ন থানায় একাধিক ছিনতাই মামলা রয়েছে।”

 

#বণিকবার্তা

শনিবার (৭ এপ্রিল) বণিকবার্তার প্রিন্ট সংস্করণের রিপোর্টের শিরোনাম- “তালহা হত্যার প্রধান সন্দেহভাজন ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত”


#ইন্ডিপেন্ডেন্ট

শনিবারের প্রিন্ট ভার্সনে শিরোনাম “Murder suspect killed in gunfight”


তৃতীয়ত:

#প্রথম আলো

উল্লিখিত ১৫টি সংবাদমাধ্যমের মধ্যে শুধুমাত্র প্রথম আলো শুক্রবার তাদের অনলাইনে পুলিশের তাৎক্ষণিক দেয়া বক্তব্য-নির্ভর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। শিরোনাম “ঢাকায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ যুবক নিহত”


কিন্তু পরবর্তীতে পুলিশের আপডেটেড তথ্য নিয়ে কোনো ফলোআপ করেনি। ভিকটিমের পরিবারের সাথে কথা বলেও কোনো ফলোআপ প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। এমনকি শনিবারের প্রিন্ট ভার্সনেও কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। পত্রিকাটির ই-পেপার এখন বন্ধ রয়েছে। ওয়েবসাইটে প্রতিদিন প্রিন্ট পত্রিকার রিপোর্টগুলো আলাদাভাবে আর্কাইভ করা হয়।  আর্কাইভের লিংক। 

এখানে শনিবার প্রকাশিত সব প্রতিবেদন যাচাই করে দেখা গেছে তাতে নিহত ওই ব্যক্তিকে (রাকিব) নিয়ে কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।


চতুর্থত:

#নিউ এইজ

এই ১৫টি পত্রিকার মধ্যে একমাত্র নিউ এইজ পুলিশ, ভিকটিমের পরিবারের একাধিক সদস্যের বক্তব্য, এবং দুই পক্ষের বক্তব্যের গরমিল বিস্তারিত তুলে ধরার পাশাপাশি মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হকের বক্তব্য প্রকাশ করেছে। একই সাথে চলতি বছর বিচারবহির্ভূত হত্যার একটি পরিসংখ্যানও দিয়েছে পত্রিকাটি। আরও লক্ষ্যণীয় একটি বিষয় হচ্ছে, একমাত্র নিউজ এইজের রিপোর্টে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ (extrajudicial killing) শব্দটির ব্যবহার পাওয়া গেছে। অন্য কোনো পত্রিকায় এই শব্দটি ব্যবহার করেনি।

বাংলাদেশে আইনশৃংখলা বাহিনীর কথিত বন্দুকযুদ্ধ যে আদৌ বন্দুকযুদ্ধ নয়, এটি ‘একপক্ষীয় আক্রমণে হত্যা’ (মানবাধিকার সংস্থাগুলো সবসময় এটিই বলে আসছে) সেই প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়টিকে তুলে ধরার প্রয়াস কেউ কেউ উদ্ধরণ কমার (‘-’) মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছে। এই প্রক্রিয়া যে প্রশ্নবিদ্ধ তা শব্দ/বাক্য ব্যয় করে বলার চেষ্টা করেনি। আর কেউ তো উদ্ধরণ কমাও ব্যবহার করেনি।

নিউ এইজের শিরোনাম, 15-year boy killed in city ‘gunfight’

এখানে উল্লেখ করা ভাল, নিউ এইজ, ডেইলি স্টার ও সমকাল পত্রিকা তাদের শিরোনাম ও রিপোর্টে নিহত রাকিবকে ‘boy’ ও ‘কিশোর’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। অন্যরা ‘যুবক’ ‘একজন’ ‘নিহত ১’- ইত্যাদি লিখেছে। ডেইলি স্টার নিহতের জন্মসনদ সংগ্রহ করে জানিয়েছে তার বয়স ১৫ বছর (জন্ম ১ ফেব্রুয়ারি ২০০৩)। অন্যরা মৌখিকভাবে বলা পুলিশের ‘২০/২২ বছর’ এর কথা (ক্ষেত্রবিশেষে পরিবারের মৌখিক দাবির কথা) উল্লেখ করেছে। আর ডেইলি স্টার এবং বাংলাট্রিবিউন তাদের ফলোআপ রিপোর্টে পরিবারের দাবি অনুযায়ী ‘আটকের পর হত্যা’র ('Picked-up') বিষয়টি শিরোনামে নিয়ে এসেছে। বাকি প্রায় সবাই পুলিশের বক্তব্যের আলোকে শিরোনাম করেছে। ভিকটিমের পরিবারের বক্তব্যকে প্রায় সব সংবাদমাধ্যমই রিপোর্টের শেষ দিকে নিয়ে গেছে, প্রথমে পুলিশের বক্তব্য উপস্থাপনের পর।


পঞ্চমত:

কিছু সংবাদমাধ্যম তাৎক্ষণিক পুলিশের বক্তব্য-নির্ভর রিপোর্ট করলেও পরে ফলোআপ প্রতিবেদনে বা প্রিন্ট ভার্সনে ভিকটিমের পরিবারের বক্তব্য প্রকাশ করেছে।

 

#সমকাল

শুক্রবার সকালে সমকাল প্রথমে অনলাইনে পুলিশের বক্তব্য-নির্ভর রিপোর্ট প্রকাশ করে: “ওয়ারীতে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ডাকাত নিহত”

তবে পরদিন প্রিন্ট ভার্সনের রিপোর্টের শিরোনাম ছিলো “ওয়ারীতে 'বন্দুকযুদ্ধে' কিশোর নিহত”। সাথে হ্যাংগার ছিল ‘পুলিশের দাবি তালহা হত্যার সন্দেহভাজন’।

এই রিপোর্টটির উল্লেখযোগ্য কিছু অংশ তুলে ধরছি--

“রাজধানীর ওয়ারী এলাকায় পুলিশের সঙ্গে 'বন্দুকযুদ্ধে' রাকিব হাওলাদার নামে এক কিশোর নিহত হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশের দাবি, ১৯ বছর বয়সী রাকিব পেশাদার ছিনতাইকারী। সে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্র খন্দকার আবু তালহা হত্যার প্রধান সন্দেহভাজন। এ ছাড়া একাধিক ছিনতাইয়ের ঘটনায় সে অভিযুক্ত ছিল। এদিকে নিহতের স্বজনরা বলছেন, রাকিবের বয়স মাত্র ১২ বছর। বুধবার তাকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। সে কিছুটা দুষ্টু হলেও কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। শিশুশিল্পী হিসেবে সে চলচ্চিত্রে অভিনয়ও করেছে। রাকিবকে 'হত্যা'র অভিযোগে আজ শনিবার আদালতে পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করার কথা জানিয়েছে তার পরিবার।

ওয়ারী থানার ওসি রফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, রাকিবকে বাসা থেকে ধরে আনার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। বয়সের দাবিও ঠিক নয় বলে জানান তিনি।”

নিহতের বাবা-মায়ের বক্তব্য তুলে ধরে সমকাল--

“মহসীন জানান, প্রথম সিনেমাটি ব্যবসায়িকভাবে সফল না হওয়ায় তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। তখন তিনি তিনটি চায়ের দোকান দেন। ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের কারণে পরে তিনি দোকানগুলো ভাড়া দিয়ে 'মদীনা ডিজিটাল সাইন' নামে নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু করেন। এসব দোকান থেকে প্রতিদিন ৩০ ও সপ্তাহে ২৫০ টাকা চাঁদা আদায় করে পুলিশ। মঙ্গলবার তিনি টাকা না দেওয়ায় বুধবার পুলিশ তার ছেলেকে গ্রেফতার করে।

পুলিশের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাকিব নামে অন্য কেউ হয়ত হত্যা-ছিনতাইয়ে জড়িত। কিন্তু পুলিশ তার ছেলেকে ধরে নিয়ে হত্যা করেছে।

রাকিবের মা রিতা বেগম অভিযোগ করেন, বুধবার রাতে ওয়ারী থানার এসআই জ্যোতিষ চন্দ্র তার ছেলেকে ধরে নিয়ে যায়। বৃহস্পতিবার তিনি খাবার নিয়ে থানায় গেলে তাকে ছেলের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি।”

 

#ডেইলি স্টার

ডেইলি স্টার শুক্রবার প্রথমে রিপোর্ট করেছিলো 'Talha murder suspect' killed in Dhaka 'gunfight'

পরদিন প্রিন্ট ভার্সনে দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করে 'Picked-up' boy killed in 'shootout'

পুলিশ ও ভিকটিমের পক্ষের বক্তব্য উপস্থাপন ও দুই পক্ষে বক্তব্যের গরমিলকে ভারসাম্যপূর্ণভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি স্বউদ্যোগে কিছু বক্তব্য যাচাইয়ের চেষ্টা করেছে পত্রিকাটি। যেমন পুলিশ বিভিন্ন পত্রিকাকে নিহত রাকিবের বয়স ১৮ থেকে ২২ বছর পর্যন্ত বলে দাবি করেছে। আবার ভিকটিমের স্বজন সাংবাদিকদের কাছে ১১ থেকে ১৪ নানা দাবি করেছেন। তবে ডেইলি স্টার ছাড়া কেউই নিহতের জন্মসনদ দেখে প্রকৃত বয়স নিশ্চিত করার পরিশ্রমটুকু করেনি। মায়ের বক্তব্যও সবচেয়ে বিস্তারিত এসেছে পত্রিকাটিতে।

#কালের কণ্ঠ:

পত্রিকাটি শুক্রবার সকালে প্রকাশ করে পুলিশের বক্তব্য-নির্ভর ‍“ওয়ারীতে 'বন্দুকযুদ্ধে' অজ্ঞাত যুবক নিহত”

পরদিন শনিবার প্রিন্ট সংস্করণে উভয়পক্ষের বক্তব্য প্রকাশ করে শিরোনাম দেয় “ওয়ারীতে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ একজন নিহত”। শিরোনামের নিচে হ্যাংগার ছিলো, “পুলিশ বলছে—ছিনতাইকারী, স্বজনদের দাবি—শিশুশিল্পী”


#যুগান্তর

এই পত্রিকাটির অনলাইনে শিরোনাম ছিল, “ওয়ারীতে ‘বন্দুকযুদ্ধে’তরুণ নিহত”

প্রিন্ট ভার্সনে শিরোনাম দেয়া হয় “‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত সন্দেহভাজন প্রধান আসামি রাকিব”। হ্যাংগার হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে “নাম-ঠিকানা জেনেও সুরতহাল প্রতিবেদনে ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ ও বয়স ২২, স্বজনের দাবি ১৫”।

যুগান্তরের প্রতিবেদন থেকে উদ্ধৃতি, “নিহত রাকিবের বাবা মহসিন হাওলাদার যুগান্তরকে বলেন, রাকিবের জন্ম ২০১৩ সালের ১ ফেব্র“য়ারি হলেও সুরতহাল প্রতিবেদনে বয়স লেখা হয়েছে ২২ বছর। আগে থেকেই পুলিশ আমার ছেলের নাম-ঠিকানা জানত। তারপরও সুরতহাল প্রতিবেদনে ‘অজ্ঞাত’ লেখা হয়। তিনি বলেন, বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে আমার ছেলে বাসায় রাতের খাবার খাচ্ছিল। এ সময় পুলিশ ১১ নম্বর ওয়ারীতে অবস্থিত (সুপার হোটেলের পেছনে) আমার বাসায় হানা দেয়। পরিবারের সদস্যদের সামনে থেকে রাকিবকে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। বৃহস্পতিবার আমার স্ত্রী রিতা থানায় গিয়েছিল। থানা পুলিশ তার কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করে। রিতা তার ছেলের সঙ্গে দেখা করতে চাইলেও থানা পুলিশ সে সুযোগ দেয়নি। রাকিবের নানা কাপ্তানবাজার আওয়ামী লীগ সভাপতি আবদুল লতিফ জানান, রাকিবের বাবা সিনেমা প্রযোজনার সঙ্গে জড়িত।” (এখানে ভুলবশত ২০০৩ এর স্থলে ২০১৩ লেখা হয়েছে)।


#বাংলাট্রিবিউন:

অনলাইন এই সংবাদমাধ্যমটি এ ঘটনায় তিনটি রিপোর্ট প্রকাশ করে।

ওয়ারীতে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ যুবক নিহত

ওয়ারীতে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত তরুণ তালহা হত্যা মামলার আসামি

‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত কিশোরকে একদিন আগে আটকের অভিযোগ পরিবারের

প্রথম দু’টি শতভাগ পুলিশি বক্তব্য। তৃতীয়টিতে পুলিশের পাশাপাশি নিহতের স্বজনের বক্তব্যও প্রকাশ করা হয়। তবে সবার চেয়ে ব্যতিক্রম হিসেবে তৃতীয় রিপোর্টটিতে মর্গে থাকা নিহতের লাশের ছবি ও হাসপাতাল প্রাঙ্গনে লুটিয়ে পড়ে মায়ে আহাজারির ছবি প্রকাশ করেছে বাংলাট্রিবিউন। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনায় নিহতের স্বজনের আহাজারির ছবি প্রকাশ খুবই বিরল ঘটনা হয়ে ওঠেছে। নিহত বা তার স্বজনকে নিয়ে ‘মানবিক আবেদন সম্পন্ন’ ‘সাইড স্টোরি’ বাংলাদেশে এখন আরও বিরল বস্তু।



#ভোরের কাগজ:

“তালহা হত্যা : মূল সন্দেহভাজন বন্দুকযুদ্ধে নিহত” শিরোনামটি এমন পুলিশবান্ধব করলেও রিপোর্টের একাংশে নিহতের স্বজনের বক্ত্য কয়েকলাইন প্রকাশ করেছে পত্রিকাটি।

রাকিবের বিচারবহির্ভূত হত্যা নিয়ে ১৫টি পত্রিকার মধ্যে ৮টির রিপোর্টিংয়ে যাদের হাতে নিহত হয়েছে সেই পুলিশের বক্তব্য প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস স্পষ্ট। এটিকে খুবই হালকাভাবে বললেও ’উদাসীনতা’ হিসেবে অবশ্যেই চিহ্নিত করা যায়। তবে কেউ মিডিয়ার এই আচরণকে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনে সহায়কের ভূমিকা’ হিসেবে দেখতে চাইলেও আপত্তি তোলার সুযোগ খুব কমই আছে!

বাকি ৭টি পত্রিকার মধ্যে ৬টি উভয়পক্ষে ভাষ্য তুলে ধরার চেষ্টা করলেও সার্বিক বিবেচনায় নিউ এইজের রিপোর্ট ছাড়া অন্যগুলোকে ’পূর্ণাঙ্গ’ বলার যাবে না। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যা এমনিতেই মানবাধিকারের চরমতম লঙ্ঘনগুলোর একটি। তার ওপর একটি কিশোরকে (যার অপরাধী হওয়ার বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ) এভাবে হত্যা করার ঘটনায় মিডিয়ার দায়িত্ব ছিল অনেক বেশি স্পর্শকাতরতার সঙ্গে পুরো বিষয়টিকে উপস্থাপন করা। পুলিশের বক্তব্য অবশ্যই এসব ক্ষেত্রে প্রধান সূত্র, কিন্তু তার সাথে ভিকটিমের পক্ষে ভাষ্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আর যদি উভয়পক্ষে বক্তব্যে গরমিল দেখা দেয়, তাহলে অবশ্যই দুর্বল ও ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ হিসেবে ভিকটিমকে এক্ষেত্রে ‘বেনিফিট অব ডাউট’ দিতে হয়। কিন্তু আলোচ্য ঘটনায় উপরিউক্ত বেশিরভাগ রিপোর্টের ভাষাও উপস্থাপনায় ভিকটিমের প্রতি স্পর্শকাতরতা প্রদর্শনের বিপরীতে উদাসীনতাই দেখানো হয়েছে বেশি।

Related Post