রাস্তায় আন্দোলন: '১৩ সালের অবস্থান থেকে উল্টে গেলেন জাফর ইকবাল

04:04 AM পাবলিক ফিগার

কদরুদ্দীন শিশির

‘চাকরিতে কোনো কোটাই থাকবে না’- গত বুধবার (১১ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার এ ঘোষণার পর কোটা সংস্কার আন্দোলন স্থগিত রয়েছে। আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন তারা এখন প্রজ্ঞাপনের জন্য অপেক্ষা করছেন।

আন্দোলন চলাকালে গত ৯ এপ্রিল এক অনুষ্ঠানে জাফর ইকবালকে সাংবাদিকরা এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি কোটা সংস্কারের পক্ষে মত দেন। এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন দেখুন: মুক্তিযোদ্ধা কোটা ‘যৌক্তিক পর্যায়ে’ রাখার পক্ষে জাফর ইকবাল (বিডিনিউজ), কোটা সংস্কার প্রয়োজন: জাফর ইকবাল (বাংলাট্রিবিউন)।


১১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেয়ার সময় তাকে ‘ক্ষুব্ধ’ মনে হয়েছে। বিডিনিউজ এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছিল, “ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী বললেন, কোটারই দরকার নেই”।

এরপর বৃহস্পতিবার (১২ এপ্রিল) জাফর ইকবাল “দাবি, আন্দোলন ও আন্দোলনের প্রক্রিয়া” শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছেন।


এতে জনপ্রিয় এই লেখক কোটা সংস্কার ইস্যুতে দেয়া তার আগের বক্তব্য বদলে নিয়েছেন। এবং একইসাথে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলেছেন (এসব অভিযোগ ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকেও তোলা হয়েছে); এর মধ্যে প্রধানতমটি হচ্ছে- ঢাকা শহরে রাস্তা বন্ধ করে আন্দোলন করা। অধ্যাপক ইকবালের মতে, এটি চরম অন্যায় কাজ হয়েছে। এবং এমনটি করা হবে জানলে কোটা সংস্কারের পক্ষে মন্তব্য করা থেকে তিনি একশ হাত দূরে থাকতেন।

লক্ষ্য করার বিষয় হলো, এইসব অভিযোগ তুলতে গিয়ে অধ্যাপক জাফর ইকবাল তার আগের আরেকটি অবস্থান শতভাগ উল্টে গেছেন। ২০১৩ সালে শাহবাগে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে আয়োজিত এক সমাবেশে জাফর ইকবাল ছাত্র সমাজকে ‘যখন দরকার’ রাস্তায় নেমে আন্দোলনের আহ্বান জানিয়েছিলেন।

 

আমরা এখানে জাফর ইকবালের নিবন্ধ (কোটা আন্দোলনকারীদেরকে অভিযুক্ত করে লেখা) থেকে কিছু অংশ তুলে ধরছি--

//
পরদিন খবর পেলাম পুরো ঢাকা শহরকে ছেলেমেয়েরা অচল করে দিয়েছে। একেকটা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নিজেদের এলাকার রাস্তা-ঘাট বন্ধ করে ফেলেছে। ঢাকা শহরের অবস্থা আমরা জানি, শহরের এক কোণায় কিছুক্ষণ ট্রাফিক বন্ধ থাকলেই কিছুক্ষণের মাঝে পুরো শহরে তার প্রভাব পড়ে। কাজেই শহরের বড় বড় ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েরা সবাই যদি নিজেদের এলাকাকে অচল করে রাখে, তার ফল কী ভয়াবহ হবে, সেটা চিন্তা করা যায় না। এই পদ্ধতিটি নতুন নয়, এর আগেও একবার প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা একই পদ্ধতিতে তাদের দাবি আদায় করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের সাত খুন মাপ, তারা যখন খুশি পুরো শহর, প্রয়োজন হলে পুরো দেশের মানুষকে জিম্মি করে ফেলতে পারে, তাদের কারও কাছে জবাবদিহি করতে হবে না। তাদের এই কর্মকাণ্ডে যে শিশুটি স্কুলে যেতে পারেনি, যে রোগীটি হাসপাতালে যেতে পারেনি, গার্মেন্টেসের যে মেয়েটি কাজে যেতে পারেনি, যে রিকশাওয়ালা তার পরিবারের খাবার উপার্জন করতে পারেনি, তাদের কারও জন্য দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের এই ছাত্রছাত্রীদের কোনও মায়া নেই। তাদের দাবিটি মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার বা সৈরশাসকের পতনের মতো জাতীয় কোনও দাবি নয়, নিজেদের একটা চাকরি পাওয়ার সুযোগটা বাড়িয়ে দেওয়ার দাবি।

গ্রাম থেকে একটা মেয়ে যদি শহরে এসে গার্মেন্টসে একটা চাকরির চেষ্টা করতো, কিংবা কোনও একজন তার জমি বিক্রি করে মালয়েশিয়ায় চাকরি পাবার চেষ্টা করতো, তাহলে তাদের পাশে দেশের সব বড় বড় অধ্যাপক এসে দাঁড়াতেন না, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের পাশে তারা এসে দাঁড়িয়েছেন। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা কিন্তু তাদের পাশে যারা দাড়িয়েছে তাদের সম্মানটুকু রক্ষা করেনি। তারা দেশের মানুষকে জিম্মি করে, যারা তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল তাদেরও অপরাধী করে দিয়েছে। যদি আমি জানতাম, তারা এরকমটি করবে তাহলে তাদের দাবির বিষয়ে মন্তব্য করা থেকে একশ হাত দূরে থাকতাম।

বিসিএস পরীক্ষায় কী প্রশ্ন করা হয় কিংবা ভাইভায় কী জিজ্ঞেস করা হয়, আমি জানি না। আমি যদি সেই পরীক্ষা নেওয়ার দায়িত্বে থাকতাম, তাহলে তাদের নিচের প্রশ্নটি করতাম:

তোমার দাবি আদায় করার জন্যে তুমি কী সবাইকে নিয়ে রাস্তাঘাট বন্ধ করে পুরো শহরকে জিম্মি করে ফেলার বিষয়টি সমর্থন করো?

যারা এই দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি নেওয়ার স্বপ্ন দেখছে তারা কী উত্তর দিতো?

আমার খুব এটি জানার ইচ্ছা ।
//

 

এবার দেখুন এই ভিডিওতে ২০১৩ সালে শাহবাগ-কাটাবন-পরিবাগ-মৎস ভবন মোড় অবরোধ করে আয়োজিত বিশাল সমাবেশে কী বলেছিলে অধ্যাপক জাফর ইকবাল।

//
‍“আমি পত্রিকায় লিখেছি যে, এই নতুন জেনারেশন খালি ফেসবুকে লাইক দেয়, এরা আর কিছু করে না। আমি লিখেছি এরা খালি ব্লগ করে, এর আর কিছু করে না। এরা রাস্তায় নামে না।

তোমরা আমাকে ভুল প্রমাণিত করেছো। এই দেখো, এখানে ব্লগাররা আছে, এই ব্লগাররা সারাদিন পৃথিবীতে যেটা হয় নাই এটা এখানে ঘটিয়ে দিয়েছে। তোমাদের কাছে ক্ষমা চাই, আমাকে ক্ষমা করে দিও সবাই।

আজকের মতো আনন্দের দিন আমি আমার জীবনে কোনো দিন পাই নাই। ২০১৩ সাল ১৯৭১ হয়ে গিয়েছে। তোমরা যারা ১৯৭১ দেখো নাই, সুযোগ পেয়েছো ২০১৩ সালকে আবার ১৯৭১ হিসেবে দেখার জন্য।

.... তোমাদেরকে আমি অনুরোধ করি, যখন লেখাপড়ার কথা তখন লেখাপড়া করবে। যখন গান গাওয়ার কথা তখন গান গাইবে। যখন কবিতা লিখার কথা, কবিতা লিখবে। ছবি আঁকার কথা, ছবি আঁকবে। ভাস্বকর্য বসানোর কথা, ভাস্বকর্য বসাবে। প্রেম করার কথা, প্রেম করবে। বাংলাদেশকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ট দেশে তৈরি করবে। নোবেল প্রাইজ আনবে। যখন রাস্তায় নামার দরকার পড়বে, রাস্তায় নামবে।

তোমাদের কাছে সারা বাংলাদেশ কৃতজ্ঞ। যত শহীদ সবাই কৃতজ্ঞ। আমরা সবাই কৃতজ্ঞ। ধন্যবাদ সবাইকে। ব্লগারদেরকে আলাদাভাবে ধন্যবাদ। তারা যেটা করেছে তার কোনো তুলনা নাই। সবাইকে ধন্যবাদ।”

//

শাহবাগের সমাবেশে বক্তব্য দেয়ার স্মৃতিচারণ করে ২০১৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বিডিনিউজে “আমার দেখা গণজাগরণ মঞ্চ” শিরোনামে একটি কলাম লিখেছিলেন জাফর ইকবাল। সেখানে রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা বন্ধ করে সমাবেশ করার স্মৃতি আওড়িয়ে অধ্যাপক ইকবাল লিখেছেন--

“আমরা পথে বসে বসে সেই শ্লোগান শুনছি। মাঝে মাঝে বক্তৃতা হচ্ছে, সেই বক্তৃতাও শুনছি। চারপাশে যেদিকে তাকাই সেদিকেই মানুষ। শেষবার একসঙ্গে এত মানুষ কখন দেখেছি আমি মনে করতে পারি না। হঠাৎ করে শুনলাম মাইকে আমার নাম ঘোষণা করে আমাকে মঞ্চে ডাকছে। আমি একটু ভ্যাব্যাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। মাথার মাঝে একটু দুশ্চিন্তা খেলা করে গেল, যদি আমাকে বক্তৃতা দিতে বলে তখন কী করব!”

যান চলাচলের ক্ষেত্রে ঢাকা শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোর একটি শাহবাগ। সেখানে আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে সমাবেশে নিজে বক্তব্য দিয়েছেন জাফর ইকবাল। আবার সেই বক্তব্যে ছাত্র সমাজকে আহ্বান জানিয়েছেন এই বলে, “যখন রাস্তায় নামার দরকার পড়বে, রাস্তায় নামবে।”

কোটা সংস্কার আন্দোলন করেছে ছাত্র সমাজ। তারা তাদের শিক্ষকতুল্য প্রিয় জাফর ইকবালের আগের নির্দেশ মতোই যখন দরকার মনে করেছেন রাস্তায় নেমেছে। এর জন্য তাদেরকে অভিযুক্ত করার সুযোগ অন্তত জাফর ইকবালের থাকার কথা নয়।

অধ্যাপক জাফর ইকবাল তার লেখায় বলেছেন, “তাদের দাবিটি মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার বা সৈরশাসকের পতনের মতো জাতীয় কোনও দাবি নয়, নিজেদের একটা চাকরি পাওয়ার সুযোগটা বাড়িয়ে দেওয়ার দাবি।”

এই বক্তব্যটিও প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ কোটা সংস্কার আন্দোলনে সারা দেশের শিক্ষার্থীরা অংশ নিয়েছে, দলমত নির্বিশেষে। চারদিন ধরে প্রায় প্রতিটি জেলায় বিক্ষোভ অবরোধ হয়েছে। তারা লাখ লাখ ছাত্রছাত্রীর অধিকার নিয়ে কথা বলেছে। এই লাখ লাখ ছাত্রছাত্রী কোনো না কোনোভাবে ১৬ কোটি মানুষের বেশিরভাগের সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্ট। ফলে এটি ‘জাতীয় দাবি’ নয় তা বলাটাও প্রশ্নবিদ্ধ।

 

কিলোমিটারজুড়ে রাস্তা বন্ধ করে শাহবাগের এই সমাবেশে যুব সমাজকে দরকার মনে হলে রাস্তায় নেমে আসার আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন জাফর ইকবাল-

Related Post