গুলশান হামলায় ‘জাকির নায়েকের অনুপ্রেরণা’: অভিযোগটির মূল কোথায়?

12:07 PM গণমাধ্যম

বিডিফ্যাক্টচেক প্রতিবেদক:

বিতর্কিত ভারতীয় বক্তা ডা. জাকির নায়েককে মালয়েশিয়া থেকে তার দেশে প্রত্যাবাসন করা হচ্ছে- এমন একটি ভুয়া রিপোর্ট গতকাল বুধবার (৪ জুলাই ২০১৮) ভারতীয় কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে আসে। পরে ভারত ও মালয়েশিয়া উভয় সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয় এমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। খবরটি অসত্য। (এ বিষয়ে পড়ুন ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন)।

লক্ষ্য করা গেছে, ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে ডা. জাকির সংক্রান্ত সংবাদ পরিবেশনের সময় তাকে ২০১৬ সালের জুলাই মাসে ঢাকার গুলশানে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ‘অনুপ্রেরণাদাতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন, এনডিটিভির প্রতিবেদনের ইন্ট্রোতেই বলা হয়েছে- “Zakir Naik, the controversial preacher known for hate speeches that allegedly inspired an ISIS terrorist involved in the 2016 Dhaka attack, is heading back to India from Malaysia, sources told NDTV on Tuesday.”

এনডিটিভির একই রিপোর্টের শেষ প্যারাটি হচ্ছে, “A channel called "Peace TV", which features Zakir Naik's preachings, was banned by Bangladesh after reports claimed that terrorists at a Dhaka cafe that killed 22 people were inspired by him.”

লক্ষ্যণীয় হল, শুরুতে ইন্ট্রোতে ‘an ISIS terrorist’ বলা হলেও শেষ প্যারায় বলা হচ্ছে ‘terrorists’. অর্থাৎ, ঢাকায় একটি ক্যাফেতে হামলা করে ২২ ব্যক্তিকে হত্যায় জড়িত ‘সন্ত্রাসীরা’ তার (জাকির) দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছে এমন খবরে বাংলাদেশে জাকির নায়েকের বক্তব্য প্রচার করা পিস টিভি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

Times Now সহ অন্যান্য ইংরেজি সংবাদমাধ্যমের গতকালের রিপোর্টগুলোতে গুলশানের হামলাকারীর/কারীদের ‘জাকির অনুপ্রেরণা’র কথা উল্লেখ করা হয়েছে, এবং সেটি ডেইলি স্টারের রিপোর্টের রেফারেন্সেই করা হয়েছে। তবে বাংলাভাষী আনন্দবাজার পত্রিকা আরেক ধাপ এগিয়ে জাকিরকে ‘গুলশান হামলার নেপথ্য নায়ক’ বলে অভিহিত করেছে। পত্রিকাটির নিজস্ব বানানরীতিতে খবরের শিরোনাম ছিল, “গুলশন হামলার নেপথ্য নায়ক জাকির নাইকের দেশে ফেরা নিয়ে বিভ্রান্তি”

‘গুলশান হামলায় জাকির নায়েকের অনুপ্রেরণা’- এই বক্তব্যের বা অভিযোগের মূল কোথায়?

২০১৬ সালের ৫ জুলাই বাংলাদেশের ডেইলি স্টার পত্রিকা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। 2 ‘attackers’ followed radical preacher, ‘IS recruiters’ শিরোনামের প্রতিবেদনে গুলশান হলি আর্টিজান ক্যাফেতে হামলাকারী নিবরাস ইসলাম এবং রোহান ইমতিয়াজের বিষয়ে কিছু তথ্য রয়েছে। নিবরাস আইএস এর দুইজন রিক্রুটারকে টুইটারে ফলো করতো। আর রোহান ইমতিয়াজ তার ফেসবুকে জাকির নায়েকের একটা বক্তব্য পোস্ট করেছিল। সেই বক্ত্যটি হচ্ছে, ‘all Muslims to be terrorists’ বা ‘সব মুসলিমকে সন্ত্রাসী হওয়া উচিত’।

ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন থেকে বক্তব্যটি উদ্ধৃত করছি-- “Another suspected killer Rohan Imtiaz, son of an Awami League leader, urged all Muslims to be terrorists in Facebook last year quoting Peace TV's controversial preacher Zakir Naik.”

স্টারের অনলাইন ভার্সনে রিপোর্টটির লিংক থাকলেও টেক্সট সরানো হয়েছে।

ই-পেপার ভার্সনে রিপোর্টটি দেখুন

ডেইলি স্টারের রিপোর্টের কোথাও জাকির নায়েকের সাথে গুলশান হামলার ‘সংযোগ’ নিয়ে আর কোনো তথ্য নেই। বা রিপোর্টের কোথাও এটা বলা হয়নি, রোহান জাকির নায়েকের ওই বক্তব্য দ্বারা গুলশানে হামলা করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছে। তবে এটা বুঝা যায় যে, রোহান জাকির নায়েককে অনুসরণ করতেন, তার বক্তব্য শুনতেন।

রোহানের উল্লেখ করা জাকির নায়েকের উপরিউক্ত উদ্ধৃতিটির প্রেক্ষাপট কী তা একটু পরে তুলে ধরবো। এখন দেখবো ডেইলি স্টারের আলোচ্য রিপোর্টের পরবর্তী প্রতিক্রিয়া কী?

স্টারের রিপোর্টটি প্রকাশিত হওয়ার পর তখন ভারতীয় মিডিয়ার বড় অংশ দ্রুত সেটি নিয়ে অতিরঞ্জনে মেতে ওঠে। কিছু উদাহরণ দেয়া যাক--

এনডিটিভির রিপোর্ট- Dhaka Attackers Inspired By Controversial Indian Cleric Zakir Naik, Says Report

ফার্স্টপোস্টের রিপোর্ট- Inspiration for Dhaka attacker came from Mumbai-based preacher Zakir Naik

জিনিউজ এর রিপোর্ট- Dhaka terrorist attack accused was inspired by Zakir Naik, reveals report

টাইমস গ্রুপের টিভি চ্যানেল ‘টাইমস নাও’ তাদের রিপোর্টে এবং টকশোতে Responsible শব্দটি ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ ঢাকা হামলার জন্য জাকির নায়েক দায়ী।

টিভি চ্যানেলটির ইউটিউব চ্যানেলে একটি টকশোর আলোচনার শিরোনাম ছিল- Zakir Naik Responsible for Dhaka Attacks Should Be STOPPED: The Newshour Debate (6th July 2016)


ডেইলি স্টারের রিপোর্টকে ‘উপলক্ষ্য ধরে’ ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রাজ্যসভায় জানান, গুলশান ‘হামলায় জড়িত তিনজন জাকির নায়েকের দ্বারা অনুপ্রাণিত’। এখানে উল্লেখ করা ‘তিনজন’ এবং ‘অনুপ্রাণিত’ এসব বক্তব্য ও তথ্য ডেইলি স্টারের রিপোর্টে নেই।

এ বিষয়ে ভারতের ইকোনোমিক টাইমস পত্রিকার রিপোর্ট- ‘Three people involved in Dhaka attack admirers of Zakir Naik’

ডেইলি স্টারের রিপোর্ট নিয়ে ভারতীয় মিডিয়ায় এমন আলোচনা শুরু হলে জাকির নায়েক এ বিষয়ে মুখ খুলেন। তিনি ডেইলি স্টারের বিরুদ্ধে ‘অতিরঞ্জিন’ এর অভিযোগ করেন। এবং বলেন, ভারতীয় মিডিয়া কোনো যাচাইবাছাই ছাড়া তা প্রচার করছে। জাকিরের সেই ভিডিও

জাকির নায়েকের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষ ৯ জুলাই ২০১৬ নিজেদের বক্তব্য প্রকাশ করে। The Daily Star protests Dr Naik's claims শিরোনামের প্রতিবেদনে পত্রিকাটি জানায়, তারা গুলশানের কোনো হামলাকারীর ‘অনুপ্রেরণা ছিলেন ডা. জাকির নায়েক’ এমন কোনো বক্তব্য তাদের রিপোর্টে বলেনি।

স্টারের সেই প্রতিবেদন থেকে উদ্ধৃত করছি- “The Daily Star categorically denies this allegation and wants to say it did not report that any terrorist was inspired by Zakir Naik to kill innocent people. The report said that one of the terrorists had propagated on Facebook last year quoting Peace TV's preacher Zakir Naik urging all Muslims to be “terrorists”. In his video speech, Dr Naik himself said he has millions of followers in Bangladesh. Our report was an attempt to show how young minds were interpreting Dr Naik's views in ways that were perhaps not intended for.”

অর্থাৎ, গুলশান হামলায় জড়িত কেউ জাকিরের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল এমনটি বলেনি পত্রিকাটি। বরং তারা বলেছে, ‘আমাদের রিপোর্টে এটা দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছিল যে, জাকির নায়েকের মতামতকে তরুণরা যেভাবে ব্যাখ্যা করছে হয়তোবা ওই বক্তব্যটি সেই উদ্দেশ্যে দেয়া হয়নি।’

এছাড়া রিপোর্টে ভুলভাবে ‘জাকির নায়েক মালয়েশিয়ায় নিষিদ্ধ’ তথ্য দেয়ার বিষয়টির জন্য দুঃখপ্রকাশ করে ডেইলি স্টার।

স্টারের এই দুঃখপ্রকাশ নিয়ে প্রতিবেদন করে ভারতের অপেক্ষাকৃত উদারপন্থী কয়েকটি সংবাদমাধ্যম। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস শিরোনাম করে ‘Never said terrorists were inspired by Zakir Naik: Bangladesh newspaper Daily Star’



ডেকান ক্রনিকলের শিরোনাম ছিল, Bangla paper apologises to Zakir Naik, says never blamed him for attack

স্ক্রল এর শিরোনাম Zakir Naik fracas: Bangladesh paper denies report used by Indian media to demand ban on preacher

জনতা কা রিপোর্টার এর শিরোনাম Daily Star’s sensational clarification, denies blaming Dr Zakir Naik for inspiring Dhaka terrorist

যদিও এনডিটিভি, টাইমস নাও, ফার্স্টপোস্ট ইত্যাদি সংবাদমাধ্যম- যারা আগের রিপোর্টটি নিয়ে অতিরঞ্জিত সংবাদ পরিবেশন করেছে- ডেইলি স্টারের এই দুঃখপ্রকাশের খবরটি তারা প্রকাশ করেনি।


এইসব সংবাদমাধ্যমের এমন একচোখা আচরণের সমালোচনা করে ভারতীয় অন্য দুয়েকটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে নিবন্ধ প্রকাশ হয়েছিল তখন। গুলশান হামলায় জাকির নায়েকের ‘অনুপ্রেরণা’ সংক্রান্ত খবরগুলোকে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ আখ্যায়িত করা হয় এসব নিবন্ধে। ‘ডেইলি ও’তে এমন একটি নিবন্ধের শিরোনাম ছিল, ‘Don't go by what Arnab says, labelling Zakir Naik a 'terror mastermind' is ridiculous’



ইন্ডিয়া ডটকমের অন্য একটি নিবন্ধের শিরোনাম ছিল, ‘Zakir Naik: Inspiration for Dhaka terrorists or victim of media trial?



হামলাকারী রোহান ইমতিয়াজের শেয়ার করা জাকিরে সেই বক্তব্যের ভিডিও:

‌‘all Muslims to be terrorists’ ডেইলি স্টারের রিপোর্টে উল্লেখ করা রোহানের এই পোস্ট জাকির নায়েকের যে লেকচার থেকে নেয়া সেটির ওপর ২০১৬ সালের ৬ জুলােই প্রতিবেদন করে ওয়াশিংটন পোস্ট।

তাতে জাকিরের ওই বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয় এভাবে, ‍“One of his most controversial remarks on TV was about Osama Bin Laden. He said: “If he is fighting enemies of Islam, I am for him. I don’t know him personally. If he terrorizing America, the biggest terrorist, I am with him. Every Muslim should be a terrorist. The thing is that if he is terrorizing a terrorist, he is following Islam.”

পরের প্যারায় ওয়াশিংটন পোস্ট উল্লেখ করে, “But in another interview, he said according to Islam, “if you kill a single human being it is as though you have killed the whole of humanity,” and then adds a qualifier, “unless he has killed someone else…or created corruption in the land.”

লেকচারের ভিডিওটি দেখুন এখানে।


জাকির নায়েকের মতাদর্শ ও নানা বিতর্কিত বক্তব্য নিয়ে মুসলিমদের মধ্যেই পক্ষে-বিপক্ষে মত রয়েছে। তবে ডেইলি স্টারের রিপোর্টে যা বলা হয়নি, এবং পরে জাকিরের অভিযোগের প্রেক্ষিতে পত্রিকাটি যা অস্বীকার করেছে, তা নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের একাংশ যে ধরনের প্রচারণা চালাচ্ছে তা শুধু অতিরঞ্জনই নয়, মিথ্যাচারও।

Related Post