বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ: অধ্যাপক আকমল আসলে কী বলেছিলেন?

24 July, 2018 21:07 PM সংস্থা/প্রতিষ্ঠান

ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদক:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি আজ বুধবার মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করবে। গতকাল মঙ্গলবার এ সংক্রান্ত একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি গণমাধ্যমে পাঠিয়েছিল। সেটি অবলম্বনে বাংলাট্রিবিউনের প্রতিবেদন-- “বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তির নিন্দা জানিয়ে বুধবার ঢাবি শিক্ষক সমিতির মানববন্ধন”


বুঝার সুবিধার্থে বাংলাট্রিবিউনের পুরো সংবাদটি এখানে হুবহু তুলে ধরা হলো--

//
“নিপীড়নবিরোধী শিক্ষকদের সমাবেশে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে কটূক্তিমূলক বক্তব্যের নিন্দা জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (ডুটা) নিন্দা জানিয়েছে। এর প্রতিবাদে আগামীকাল বুধবার (২৫ জুলাই) সকাল ১১টায় অপরাজেয় বাংলায় মানববন্ধনের ডাক দিয়েছে সংগঠনটি।

মঙ্গলবার (২৪ জুলাই) শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল এবং সাধারণ সম্পাদক শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলামের স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, ‘১৯ জুলাই অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে মানববন্ধনের আয়োজন করা হবে (পড়ুন ‘হয়’)। আমরা মনে করি বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে করা কটূক্তি ইতিহাস বিকৃতির অপপ্রয়াস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পরিপন্থী, সংবিধান বিরোধী এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। এসব মিথ্যা ও দূরভিসন্ধিমূলক বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এই চক্র কোটা আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করার হীন ও গভীর চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছেন।’

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘তরুণ-বুদ্ধিদীপ্ত শিক্ষার্থীদের আবেগ ব্যবহার করে মহান মুক্তিযুদ্ধ, জাতির জনক এবং প্রধানমন্ত্রীকে হেয় করার এ অপরাজনৈতিক প্রয়াসের আমরা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। একইসঙ্গে তার এই বক্তব্য অনতিবিলম্বে প্রত্যাহারপূর্বক জাতির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানাচ্ছি। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি আমরা আহ্বান জানাই।’
//

এখান থেকে স্পষ্ট যে মানববন্ধনটি কেন করা হচ্ছে। এবার দেখা যাক ‘কটুক্তি’টি কী ছিল? এজন্য নিচে তুলে দেয়া শিক্ষক সমিতির সংবাদ বিজ্ঞপ্তির কপিটি খেয়াল করুন (লাল চিহ্নিত লাইনগুলো)।



১৯ জুলাই নিপীড়নবিরোধী শিক্ষকদের সমাবেশে অধ্যাপক আকমল হোসেন বলেছেন, “আমাদের প্রধানমন্ত্রী, তিনি কি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন? তাঁর পিতা...তিনি কি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন?”

উপরের বাক্য দুটি কেউ যদি এভাবে বিচ্ছিন্নভাবে বলে থাকে এবং এর মাধ্যমে আলোচ্য ব্যক্তিদ্বয়ের মুক্তিযুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা উদ্দেশ্য হয় তাহলে সেটিকে ‘কটুক্তি’ হিসেবে গণ্য করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে (যদিও কটূক্তি ধারণাটি আপেক্ষিক এবং এটি শাস্তিযোগ্য কিনা তাও প্রশ্নসাপেক্ষ)।

এখন প্রশ্ন হল, অধ্যাপক আকমল তার বক্তব্যে বাক্য দুটি কোন প্রসঙ্গে বলেছেন? এর পূর্বাপর বক্তব্য কী ছিল? আগে-পরের অন্যান্য বাক্যগুলো মিলিয়ে এই ধারণা জন্মায় কিনা- তিনি বঙ্গবন্ধু ও তার কন্যা শেখ হাসিনার মুক্তিযুদ্ধে সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন? নাকি তার উপরের বাক্য দুটিকে প্রেক্ষাপট বহির্ভূতভাবে (আউট অব কনটেক্সট) ব্যবহার করেছেন শিক্ষক সমিতির নেতারা?

অধ্যাপক আকমলের সেদিনের (১৯ জুলাই) সমাবেশে দেয়া বক্তব্যের ভিডিও দেখে (ও শোনে) মনে হয়েছে, পূর্বাপর বক্তব্য উল্লেখ না করে শুধু পছন্দ অনুযায়ী দুটি বাক্য নির্বাচন করে সেগুলোকে আউট অব কনটেক্সট ব্যবহার করার কারণে অনেকের কাছে তা ‘কটূক্তি’ হিসেবে টেকছে।

নিপীড়নবিরোধী শিক্ষকদের অন্যতম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই অধ্যাপক ফাহমিদুল হক ২৩ জুলাই তার ফেসবুক টাইনলাইনে ২ মিনিট ২৫ সেকেন্ডর একটি ভিডিও পোস্ট করেন। ভিডিওর বক্তব্য ট্রান্সক্রাইব করে তুলে ধরে তিনি যে পোস্টটি লিখেছেন সেটি এখানে হুবহু পেশ করা হল (বোল্ড করা দ্বিতীয় প্যারাটি অধ্যাপক আকমলের বক্তব্য)--

//
“খণ্ডিত বক্তব্য না শুনে পুরোটা শুনুন। কী বলেছিলেন অধ্যাপক আকমল হোসেন বৃহস্পতিবারের (১৯ জুলাই ২০১৮) নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক সংহতি সমাবেশে?

“আমার বন্ধু সহকর্মীবৃন্দ, শিক্ষার্থীবৃন্দ, সংবাদপত্রের প্রতিনিধিবৃন্দ ও সুধীবৃন্দ… এখানে আমার কাছে যেটা মনে হয়, এই আন্দোলনের সাথে সংহতি জানানোর কথা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। কেননা ইতিমধ্যেই শিক্ষকরা বিভিন্ন ধরনের সমাবেশ করেছেন, এবং আমরা সেখানে উপস্থিত থেকেছি। এখন… সেদিন আমার সহকর্মী তানজীমকে বলা হয়েছে যে সে মুক্তিযুদ্ধ করেছিল কিনা। এখন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করাটা যদি আপনার এধরনের আন্দোলনের… এধরনের আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়ার কোনো যোগ্যতা হয়, তাহলে আমার মনে হয়, আমাদের অনেকেই সেই যোগ্যতায় উত্তীর্ণ হবেন না। এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। তানজীম বা ফাহমিদের বয়স মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়ে যাবার বয়সের সমান। আর মুক্তিযুদ্ধের মতো একটা মহান একটি ঘটনা আমাদের জাতির জীবনে, সেটা নিয়ে যেভাবে আপনার অবস্থান নেয়া হয়, বা বক্তব্য রাখা হয়, তাতে আমার মনে হয়, যে মুক্তিযুদ্ধকে অবমাননা করা হয়। আমার প্রশ্ন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী তিনি কি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন? তার পিতা… তার পিতা, যিনি এই আন্দোলনের যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, যার মাধ্যমে তৈরী হয়েছিল, তিনি কি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন? তাহলে মুক্তিযুদ্ধের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই যে বিচার করা, কে প্রতিবাদ করতে পারবে, কে অন্যায় (অন্যায়ের প্রতিবাদ) করতে পারবে, সেটা আমার মনে হয় অত্যন্ত নেতিবাচক চিন্তা।”…

এরপর তিনি অন্য প্রসঙ্গে চলে যান।

‘কটূক্তি’ হিসেবে বর্ণনা না করে, তার বক্তব্য কি এভাবে পাঠ করা যায়না?

তিনি বলে নিচ্ছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বেই মুক্তিযুদ্ধের আন্দোলন হয়েছিল। কিন্তু ঘটনাচক্রে তাঁরই ‍মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা সম্ভব হয় নি, কারণ তিনি কারাগারে ছিলেন। তাই বলে কি এই মহান নেতার অবদান খাটো হয়ে গেল? মানে তিনি ‍মুক্তিযুদ্ধ বা অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে তিনি বলতে পারবেন না?

তিনি তানজীমের ঘটনার প্রেক্ষাপটে এই আলাপ বা প্রশ্ন তোলেন।”
//

আশা করা যায়, bdfactcheck.com পাঠকদের কাছে পুরো বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।


.................................

(ছবি কৃতজ্ঞতা: বিডিনিউজ)

Related Post