ভিডিওতে সাকিবের বিতর্কিত অঙ্গভঙ্গি: বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত সেই ব্যক্তি কী বলছেন?

08:08 AM পাবলিক ফিগার

কদরুদ্দীন শিশির

এক ব্যক্তির প্রতি বিতর্কিত ইঙ্গিত করছেন সাকিব আল হাসান- এমন একটি ভিডিও সম্প্রতি ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার লডারহিলে শেষ ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে বৃষ্টি আইনে ১৯ রানে হারিয়ে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জিতে নেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। ওই রাতে হোটেলের লবিতে ঘটে এ ঘটনা।

এ নিয়ে অনেক আলোচনা সমালোচনা চলছে। কেউ দাবি করছেন, বাংলাদেশের নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন নিয়ে সাকিবের সাথে কথা বলতে যাওয়ায় মেজাজ হারান বিশ্বসেরা এই অলরাউন্ডার। আবার কেউ দাবি করছেন, ওই ব্যক্তিটি সাকিবের সাথে ছবি তোলার পরও তার সাথে ভিডিও তোলার জন্য বারবার বিরক্ত করছিলেন- এতে সাকিব এমন আচরণ করেন।

তবে কারো দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ তুলে ধরা হচ্ছে না।

এদিকে আজ বুধবার সাকিব আল হাসান তার ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে ঘটনার বিষয়ে তার বক্তব্য জানিয়েছেন। পুরো পোস্টটি এখানে হুবহু তুলে ধরা হলো---

“আমার প্রিয় ভক্ত এবং অনুসারীদের উদ্দেশ্য করে কিছু কথা বলতে চাই। সম্প্রতি আমাকে নিয়ে একটি ভিডিও আপলোড করা হয়েছে যেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের পর লবিতে আমাকে এবং আমার একজন তথাকথিত ‘ফ্যান’ এর সাথে তর্ক-বিতর্ক করতে দেখা যায়। এই ক্লিপটি সম্পূর্ণ ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যা প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ করে না।

পর পর ম্যাচ থাকায় আমি এবং আমার সহকর্মী বেশ ক্লান্ত ছিলাম এবং আমরা আমাদের রুমে ফিরে যাচ্ছিলাম। আমরা আমাদের নিজস্ব সরঞ্জাম ও ব্যাগ বহন করেছিলাম তাই আমাদের হাত পূর্ণ ছিল যা কোন ভাবেই অটোগ্রাফ দেয়ার অবস্থায় ছিল না। আমরা সর্বদাই আমাদের ভক্তদের সাথে সময় কাটাতে পছন্দ করি এবং তাদের সাথে ছবি তুলে, অটোগ্রাফ দিয়ে মুহূর্তগুলি ভাগ করে নেয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু ভক্তদেরও বুঝতে হবে যে আমরাও মানুষ। আমরা মাঠে একটা বিজয় অর্জনের জন্য প্রাণপণে লড়াই করি। আমাদের কি ব্যস্ত কিংবা ক্লান্ত অনুভব করার অনুমতি নেই? আমরা আপনাদের সমর্থন বুঝি এবং প্রশংসা করি সব সময় এবং চেষ্টা করি আপনাদের সমর্থনের প্রতিদান যেন আমরা মাঠে ভাল খেলার মাধ্যমে দিতে পারি। কিন্তু মাঝে মাঝে আমাদের এই কঠিন পরিশ্রম এবং কঠোর চেষ্টার সাথে সব সময় নিজেকে গুছিয়ে রাখা কষ্টকর হয়ে পড়ে।

আমার আপনাদের কাছে বিনীত অনুরোধ থাকবে যে আমাদের মধ্যে কেউ যদি আপনাদের অনুরোধ না রাখতে পারি তবে তা ব্যক্তিগতভাবে নিবেন না কারণ আমরা যে পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছি তা হয়তো আপনি যা দেখছেন তা থেকে ভিন্ন হতে পারে। হুটহাট আমাদের পরিস্থিতি বিবেচনা না করে কিংবা আমরা কেমন মুডে আছি তা বোঝার চেষ্টা ছাড়াই কোন সিদ্ধান্ত বা মতামত দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন না। আমি আমার ভক্তদের অসম্ভব ভালোবাসি এবং আমি মাঠে তাদের জন্যই খেলি সেটা জাতীয় দলে হোক কিংবা কোন লিগের জন্য হোক। একই সাথে আমি আমার ভক্তদের কাছ থেকে সম্মান, ভালোবাসা এবং তারা আমাকে বুঝবে এমনটাই আশা করি। আমি জানি কিছু যারা হয়তো আমাকে ফলো করে অথবা করে না, কিন্তু সর্বদা ছোট ছোট বিষয়ে আমাকে নিচু করতে পছন্দ করে। তাদের উদ্ধেশ্যে বলতে চাই আমাদের থেকে ভালো কিছু প্রত্যাশা করতে হলে এই নিচু মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রত্যেকটা ম্যাচে আমরা এমনিতেই অনেক বেশি চাপে থাকি। নতুন কোন চাপ প্রয়োগ না করার জন্যে বিশেষ অনুরোধ করা হলো। আর এই মানসিকতার বাইরে যারা আছে আমি সর্বদা তাদের পাশে আছি।

সবার জন্যে আমার তরফ থেকে ভালোবাসা রইলো – সাকিব।”

সাকিব তার স্ট্যাটাসে “এই ক্লিপটি সম্পূর্ণ ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যা প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ করে না” বললেও প্রকৃত ঘটনার কোনো বিবরণ দেননি। তবে পুরো পোস্ট পড়ে এমনটাই ধারণা পাওয়া যে, খেলা শেষে ক্লান্ত অবস্থায় হোটেলে ফেরার পর হাত ব্যাগ সরঞ্জামে পূর্ণ ছিল। সে কারণে অটোগ্রাফ দেয়ার মতো অবস্থা ছিল না। তখন ‌ওই তথাকথিত ‘ফ্যান’ (সাকিবের ভাষায়) বা অন্য ভক্তরা খেলোয়াড়দের অবস্থা না বুঝে অটোগ্রাফ চাইলে ভিডিওতে দেখা যাওয়া বিতর্কিত ইঙ্গিতটি করেন সাকিব।

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে শুধু ভিডিওটি দেখে এবং সাকিব আল হাসানের ফেসবুক পোস্টের ওপর নির্ভর করে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। কেউ ঘটনার অপরপক্ষের বক্তব্য প্রকাশ করেনি। bdfactcheck.com এর পক্ষ থেকে তাই যোগাযোগ করা হয় আমেরিকা প্রবাসী ওই ব্যক্তির সাথে, যার নাম তানভীর চৌধুরী। অবশ্য ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তৃতীয় কারো বক্তব্য নেয়ার চেষ্টা করেও সফল হওয়া যায়নি।

তানভীর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেট লিগের একজন পেশাদার ক্রিকেট খেলোয়াড়। বর্তমানে ডেলাওয়ার স্টেটের ব্ল হেন্স ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে খেলছেন। সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে bdfactcheck.com এর সাথে আলাপে তানভীর যা বলেছেন তা তুলে ধরা হলো।

তিনি বলেন, আমি আমার ওয়াইফসহ বাংলাদেশ দলের খেলা দেখার জন্য তিন দিনের ছুটি নিয়ে শনিবার ডেলাওয়ার থেকে ফ্লোরিডায় যাই। প্রায় তিন ঘণ্টার বিমানের পথ। সাকিব ভাইরা উঠেছিলেন ম্যারিয়ট (নর্থ) হোটেলে। আমার আর নাইমা (স্ত্রী) ওই হোটেলেই উঠেছিলাম। বাংলাদেশ টিমের সদস্যরা থেকেছেন ৪র্থ, ৫ম ও ৯ম ফ্লোরে। আর আমরা দুইজন ইঠি ১১ তলার ১১১৪ রুমে।

‘বাংলাদেশের শেষ ম্যাচটি ছিল সোমবার। খেলা দেখতে বিভিন্ন স্টেট থেকে অনেক বাংলাদেশি এসেছেন। তাদের মধ্যে আবার অনেকে খেলোয়াড়দের দেখতে ম্যারিয়টে আসেন। তাই ওইদিন স্টেডিয়ামের উদ্দেশে হোটেল ছাড়ার আগে বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে সাকিব ভাই, তামিম ভাইরাসহ অন্য ক্রিকেটাররা হোটেল লবিতে ভক্তদের সাথে কথা বলেছেন, ছবি উঠিয়েছেন, আমি এবং আমার ওয়াইফও সাকিব ভাইয়ের সাথে ছবি উঠিয়েছি এবং পরে সেগুলো ফেসবুকেও পোস্ট করেছি। এরপর ৪টার দিকে উনারা বের হয়ে যান। আমরাও খেলা দেখার জন্য স্টেডিয়ামে যাই। রাত ৮টায় ম্যাচ শুরু হয়। খুব এনজয় করেছি খেলাটা। আমরা সব বাংলাদেশিরাই খুব এক্সাইটেড ছিলাম। আমেরিকাতে এসে আমাদের দেশ জিতে ফিরছে।’

‘রাত ১২টার দিকে ম্যাচ শেষ হয়। আমরা তখনই হোটেলে ফিরি। ফিরতে ফিরতে রাত দেড়টা বেজে যায়। ভোর ছয়টায় আমাদের ফ্লাইট। তাই ভাবলাম এই কয় ঘণ্টা আর ঘুমানোর দরকার নেই। হোটেল লবিতে আড্ডা দিয়ে কাটিয়ে দেই। তখন সেখানে ৭০ থেকে ৮০ জন দর্শক জড়ো হয়েছেন। সবাই অপেক্ষা করছিলেন আমাদের ক্রিকেটাররা কখন ফিরবেন। বিজয়ী হওয়ায় সবাই তাদেরকে কংগ্রাচুলেট করতে চাচ্ছিল।’

তানভীর বলেন, ‘আমরা হোটেলে পৌঁছার আরও প্রায় ৪০ মিনিট পর টিমের গাড়ি আসে। ওরা গাড়ি থেকে নামার সময় বাংলাদেশি ভক্তরা আমরা যারা ছিলাম তারা ‘কংগ্রাচুলেশন্স’ বলে বলে রিসিভ করছিলাম। তখন অনেক মহিলা এবং কয়েকটি বাচ্চাও ছিল। আমাকেও তারা ক্রিকেট খেলোয়াড় হিসেবে চিনে। এর মধ্যে দুটি বাচ্চা আগে থেকেই খুবই উৎসাহী হয়ে অপেক্ষা করছিল সাকিব ও রুবেলের ফেরার জন্য। ওরা এই দুইজনের খুবই ভক্ত। তাদের অটোগ্রাফ চায়। এর মধ্যে ১০ বছরের মতো বয়স হবে একজনের। সে বাংলাদেশ দলের জার্সি পরে এসেছিল।’

‘খেলোয়াড়রা গাড়ি থেকে নামার পর স্বাভাবিকভাবেই অনেকে ঘিরে ধরে ছবি তোলা ও অটোগ্রাফের জন্য। আমরা যারা দিনের বেলা ছবি তুলে নিয়েছি তারা আর নতুন করে আগ্রহী হইনি। উনাদের (খেলোয়াড়) ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। কিন্তু যারা দিনে ছিল না, এবং বিশেষ করে বিজয়ী হওয়ার পর তাদের এক্সাইটমেন্ট আরও বেড়ে যায়। ভিড়ের মধ্যে ওই বাচ্চা দুটি খেলোয়াড়দের কাছে ভিড়তে পারছিল না। রুবেল, মাহমুদু উল্লাহ, সাব্বিররা অটোগ্রাফ দিচ্ছিলেন। কিন্তু সাকিব তখন কাউকেই দিচ্ছিলেন না। উপরে উঠে যাচ্ছিলেন। তখন আমাদের ওই দুটো বাচ্চার একজনের অভিভাবক সাকিবের উদ্দেশ্যে বলে উঠেন, ‘ছেলেটার মনে হয় খুব ভাব’। আমিও উনার কথায় সায় দিয়ে বলি, ‘তা-ইতো মনে হচ্ছে। অনেক ভাব!’ আমার কথাটা বেশ লাউড ছিল। সেটা সাকিবের কানে যায়। এরপরই তিনি খুবই রেগে আমার দিকে তেড়ে আসেন। এবং যাচ্ছেতাই ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন। ঘটনা আকষ্মিকতায় আমি পুরো হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম।’

কী গালি দিয়েছিলেন- এমন প্রশ্নে জবাবে তানভীর বলেন, ‘হাত দিয়ে ইঙ্গিত করার সময় একটা বাক্য বলেছেন যা উচ্চারণ করার মতো নয়। তবে প্রথমে এসেই জিজ্ঞেস করেন- ‘এই তুই কী বলেছিস? তোর মতো .গীর পোলাদেরকে আমি অনেক খাইছি। ..কির পোলা। বা....।”

‘এভাবে একবার গালি দিয়ে উনি উপরে উঠে যাচ্ছিলেন। সিড়িতে পা দিয়ে আবারও ফিরে এসে একই রকম গালিগালাজ করেন। পরে অন্য দুয়েকজন তাকে সরিয়ে নিয়ে যায়’, দাবি করেন তানভীর চৌধুরী।

তিনি আরও বলেন, ‘৩ ঘণ্টা ফ্লাই করে এসে নিজেদের দেশের ক্যাপ্টেনের কাছ থেকে এমন আচরণ পাওয়া খুবই কষ্টের। আমরা তো দেশকে ভালোবেসে আসি। আমার ওয়াইফ সাকিবের খুবই ভক্ত। কিন্তু সেদিনের আচরণটা সে ভুলতে পারছে না। আমিও ওকে নিয়ে এসে লজ্জায় পড়লাম। চাইলে আমরা ওই সময়ই পুলিশে অভিযোগ করতে পারতাম। কিন্তু এসব করলে নিজের মাতৃভূমির জন্য লজ্জার হবে, তাই আমি একদম শান্ত থেকেছি।’

‘প্রথমে ভেবেছিলাম যা ঘটেছে শেষ। কিন্তু এখন দেখছি বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমে কিছু জিনিস ভুলভাবে আসছে। তাই সেদিন কী ঘটেছিল তা বললাম। ওখানে আরও যারা ছিলেন তারাও দেখেছেন বিষয়টা। আর নিরাপদ সড়ক আন্দোলন নিয়ে যা বলা হচ্ছে তা ঠিক নয়। সাকিব ভাইর সাথে বা অন্য কোনো খেলোয়াড়ের সাথেই এ নিয়ে আমার কোনো কথা হয়নি। যা কথা হয়েছে খেলার আগে বিকাল বেলা ছবি তোলার সময় হয়েছে। সেই ছবি আমার ফেসবুকেও আপলোড দেয়া আছে।’ বলেন মার্কিন লীগের এই ক্রিকেটার।

তানভীর চৌধুরীর ভিডিও বক্তব্য দেখুন এই লিংকে

নোট: প্রিয় পাঠক, মূলধারার সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ঘটনার একপক্ষীয় ভাষ্য আসার প্রেক্ষিতে bdfactcheck এর পক্ষ থেকে ঘটনাটি সম্পর্কে খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করা হয়। তাতে শুধু ঘটনার অপরপক্ষ তানভীর চৌধুরী ও তার স্ত্রীর কাছে পোঁছাতে পেরেছে bdfactcheck। সাকিব আল হাসান এবং তানভীর চৌধুরীর বাইরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত তৃতীয় কোনো ব্যক্তি বা পক্ষের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও আমরা সফল হতে পারিনি। ফলে এই প্রতিবেদনটির উদ্দেশ্য হচ্ছে ঘটনার উভয় পক্ষের বক্তব্যকে তুলে ধরা। এখানে সাকিব আল হাসান বা তানভীর চৌধুরীর কারো বক্তব্যকেই চূড়ান্ত সত্য বলে রায় দেয়া আমাদের উদ্দেশ্য নয়। যদি আমরা নিরপেক্ষ কারো কাছে পৌঁছাতে পারি তাহলে সেটিও তুলে ধরবো।

Related Post