LookEast নামক ভারতীয় ‘নিউজ পোর্টাল’টির সন্ধানে

22:08 PM গণমাধ্যম

ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদক:

বুধবার দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় “সিঙ্গাপুরে বিএনপি-আইএসআই সরকার হটানোর ষড়যন্ত্রে!” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। শিরোনামের নিচে হ্যাঙ্গার হিসেবে ছিল একটি লাইন- “আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের হত্যার পরিকল্পনা”।

স্বাভাবিকভাবেই ‘চাঞ্চল্যকর’ সংবাদটি সামাজিক মাধ্যমে দিনভর ব্যাপকভাবে শেয়ার হয়েছে। আওয়ামী লীগের দলীয় ফেসবুক পেইজেও সংবাদটি শেয়ার করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটির প্রথম কয়েকটি প্যারা এখানে হুবহু তুলে ধরা হলো--

“আগামী মধ্য সেপ্টেম্বরে বড় ধরনের জনসমাবেশ ঘটিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারকে হটানোর পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। বিএনপির সঙ্গে এই ষড়যন্ত্রে যুক্ত আছে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। বিক্ষোভের সময় সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাও সরকারবিরোধী বক্তব্য দেবেন বলে গোয়েন্দারা জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘লুকইস্ট’ গত ২২ আগস্ট গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিএনপি এবার তার কৌশলে পরিবর্তন আনছে। গত নির্বাচনের আগে বিএনপি এবং তাদের মৌলবাদী মিত্র মিলে গণপরিবহনকে টার্গেট করে মানুষের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি করে। গণপরিবহনে বোমা হামলা চালিয়ে অনেক নীরিহ মানুষকে হত্যা করে। তাদের লক্ষ্য ছিল এর মাধ্যমে সামরিক বাহিনীকে হস্তক্ষেপ করাতে বাধ্য করা। কিন্তু সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি। এখন বিএনপি মনে করছে, সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকারকে হটানো সম্ভব নয়।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, গত সপ্তাহে সিঙ্গাপুরে বিএনপির সিনিয়র নেতারা বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (আইএসআই) এর দুইজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। বিরোধীদের আগামী বৈঠক হবে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে। চলতি মাসের শেষ দিকে বৈঠকটি হওয়ার কথা রয়েছে।”

(পুরো প্রতিবেদনটি এই লিংকে গিয়ে পড়তে পারেন)

দৈনিক ইত্তেফাক ‘লুকইস্ট’ (www.lookeast.in) নামক একটি ‘আন্তর্জাতিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল’ এর বরাতে খবরটি পরিবেশন করেছে। কিন্তু সংবাদমাধ্যম হিসেবে নামটি অপরিচিত মনে হওয়ায় bdfactcheck.com এর পক্ষ থেকে সেটি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করা হয়। পোর্টালটি সম্পর্কে প্রাপ্ত কিছু তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো--

#প্রথমত ইত্তেফাকের রিপোর্টার আবুল খায়েরের প্রস্তুতকৃত রিপোর্টে ‘আন্তর্জাতিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল’ হিসেবে উল্লেখ করা lookeast ভারতীয় একটি ওয়েবসাইট। ডোমেইনের শেষেও .in রয়েছে।

#ডোমেইন ট্র্যাকার ওয়েবসাইট www.netim.com এর তথ্য মতে, lookeast পশ্চিমবঙ্গ থেকে হোস্ট করা হয় ২০১৫ সালে। ডোমেইনের মালিক প্রতিষ্ঠানটির নামও Look East; এ সংক্রান্ত বিস্তারিত জানতে পারেন এই লিংকে


#Look East এর ওয়েবসাইটে বাংলাদেশ থেকে প্রবেশ করা যায়নি। এমনকি গুগল ক্যাশে ব্যবহার করেও ওয়েবসাইটটি লোড হয়নি।

#তবে ভিপিএনের সহায়তায় ইংরেজি ভাষার পোর্টালটির লোড করার পর দেখা গেছে ২২ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনটির শিরোনাম BNP Plans Massive Agitation With Selective Terror.

ভিপিএন লিংকে প্রতিবেদনটি পড়ুন।

স্ক্রিনশট--

#খুবই স্পর্শকাতর ‘তথ্য’ প্রকাশ করা হলেও প্রতিবেদনটিতে ‘নামহীন গোয়েন্দা’ সূত্র ছাড়া আর কোনো সূত্রের উল্লেখ নেই। উপস্থাপিত তথ্যের পক্ষে কোনো প্রমাণ হাজির করা হয়নি।

#Look East এর ওয়েবসাইটের About সেকশনে Editorial Director হিসেবে সুবীর ভৌমিক ও Managing Director হিসেবে রয়েছে শুভ্র কান্তি গুপ্তের নাম।

স্ক্রিনশট--

#সুবীর ভৌমিক সম্পাদিত পোর্টালটির বিরুদ্ধে এর আগেও ভুয়া সংবাদ প্রচারের অভিযোগ আছে। ২০১৭ সালের ২২ সেপ্টেম্বর BNP-ISI nexus targets Hasina, but fails শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় LookEast-এ, যাতে দাবি করা হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তা প্রদানকারী সংস্থা এসএসএফের (বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিশেষ ইউনিট) কিছু সদস্য তাকে হত্যার চেষ্টা করেছিল ওই বছরেরই আগস্ট মাসে। যদিও পরে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে খবরটিকে মিথ্যা বলে নাকচ করা হয়। মূলত এরপর থেকেই এই ওয়েবসাইট বাংলাদেশে অচল করা হয়৷

#ওয়েবসাইটটিতে চীন ও পাকিস্তান বিদ্বেষী বিভিন্ন মন্তব্যমূলক প্রতিবেদনের পাশাপাশি বাংলাদেশ সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন দেখা গেছে। তবে দৈনিক ভিত্তিতে সাইটটি আপডেট করা হয় না। সর্বশেষ ২৯ আগস্ট প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদন থাকলেও (এর মধ্যে একটির শিরোনাম Chequebook Colonialism China Style) এর আগের পোস্টটি করা হয়েছিল ২২ আগস্ট।

#এছাড়া ভারত সরকারের বিভিন্ন বক্তব্য ও সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরা হয় ওয়েবসাইটটিতে। যেমন, ভারত সরকারের ভাষ্যের সাথে মিল রেখে আসাম রাজ্যের এনআরসি তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদেরকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে এক প্রতিবেদনের শিরোনামে।

#বাংলাদেশ সংক্রান্ত অন্য কয়েকটি প্রতিবেদনের শিরোনাম হচ্ছে-- “Sinha Took Money From Jamaat Leader” (১৪ আগস্ট), “The Kamal Hossain Conspiracy” (১৩ আগস্ট), “Bangla Terrorist Jahidul A Prize Catch” (১০ আগস্ট) “DGFI backs ARSA but police hunt for them” (৬ অক্টোবর ২০১৭) ইত্যাদি। পোর্টালটির বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন (বিশেষ করে বাংলাদেশ সংক্রান্ত) পড়ে দেখা গেছে সেগুলো নামহীন সূত্রের বরাতে প্রকাশিত এবং ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’-নির্ভর।

#বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে ভুয়া ও নেতিবাচক সংবাদ পরিবেশনের প্রবণতা ওয়েবসাইটটিতে লক্ষ্যণীয়। যেমন সেনাবাহিনীর বিশেষ ইউনিট এসএসএফ, সেনা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই’কে নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন, যেগুলোর সবক’টিই নামহীন ও যাচাই অযোগ্য সূত্রের বরাতে প্রকাশিত।

Related Post